গুরু, তোমায় সালাম

অমিত আহমেদ এর ছবি
লিখেছেন অমিত আহমেদ (তারিখ: সোম, ০৬/০৬/২০১১ - ৪:৩৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

নটরডেমে যারা পড়েছেন, বিশেষ করে যারা নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দিয়েছেন, তাদের অনেকেরই হয়তো গুরুর সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছে। আমার সাথে একাধিকবার হয়েছে।

একদম প্রথমদিনের কথা বলি, আমি এ. সি. দাস স্যারের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রফিক মামুর টংয়ে বসে আছি। বাতেনী আলাপ হচ্ছে। দেখি গুরু একটা বোয়াম থেকে চকলেট বের করে নিচ্ছেন। পরনে রঙচটা ট্র্যাকস্যুট, টিশার্ট। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। মুখে "হারিয়ে গেছি" টাইপ হাসি। আমি অত্যধিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। সে বয়সে কিছু মানুষের জন্য তীব্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বহন করে ফিরতাম। তিনি শ্রদ্ধার সেই মানুষগুলোর তালিকায় ছিলেন একদম শুরুর দিকে।

আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, "গুরু, আমার নাম সাব্বির!" এতো কিছু বাদ দিয়ে নিজের নাম জানান দেবার আগ্রহ কেনো প্রবল হয়ে উঠলো তা জানি না, তাও সেই নাম যে নামে শিক্ষকরা ছাড়া আমাকে খুব বেশি কেউ ডাকেন না। উনি হাসি হাসি মুখে বললেন, "আচ্ছা!" আমি থড়বড় করে বললাম, "গুরু কি এ'দিকেই থাকেন?" উনি আঙুল তুলে সামনের রাস্তা দেখিয়ে জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, ওইতো, সামনেই থাকি। কমলাপুর।" তখন দু'একটা মিশ্র অ্যালবাম বাদে তাঁর গান পাওয়া যেতো না। সেই নিয়ে অভিযোগ জানালাম। উনি খুব অকপট ভাবেই কেনো গানের অ্যালবাম করতে পারেন না সেটা বলে দিলেন। অচেনা মানুষের সাথে কথা হচ্ছে, সেই নিয়ে কোনো দ্বিধা তাঁর মধ্যে দেখিনি। যা বলার তা সরাসরি এবং আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলেছেন। এমন সারল্য আমি অন্য কোনো তারকার মাঝে দেখিনি।

তাঁর কাছের মানুষদের কাছ থেকে পরে শুনেছি, এই সারল্যই তাঁকে ব্যক্তিগত জীববে হিসেবি হতে দেয়নি। যে কোনো কাজে, পেশায়, এমনকি শখেও মানুষকে ধূর্ত হতে হয়। নিজের যা প্রাপ্য তা আদায় করে নিতে হয়। কেউ কাউকে নিজ থেকে যা চাই তা বুঝিয়ে দেয় না। এই বিষয়টি গুরু বুঝতেন না। কিংবা বুঝলেও মানতেন না। যে সারল্য তিনি নিজে ধারণ করতেন, তা দেখতে চাইতেন অন্যদের মাঝেও।

নটরডেমে পুরো দিন ফাঁকি দিতাম কম। সাধারণত একটা দু’টো ক্লাস নানান কৌশল করে ফাঁকি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে মনে হতো বিশ্ব জয় করে ফেলেছি। সেই জয় জানান দিতে ইতিউতি ঘুরে বেড়াতাম। উনি সকালে হাঁটতে বেরুতেন। হনহন করে হাঁটতেন। আমি পরিচিতর হাসি দিতাম। উনি সেই হাসি ফিরিয়ে দিতেন, কিন্তু হাঁটার গতি কমাতেন না। ভর দুপুরে টং দোকানে তাঁকে প্রায়শই দেখা যেতো। কথা হতো। আমার নাম মনে থাকতো না কখনোই, প্রতিবারই জিজ্ঞেস করতেন, "তোর নাম যেনো কী?" যেদিন অটোগ্রাফের জন্য খাতা বাড়িয়ে ধরলাম, সেদিনও।

কলোনী কিংবা কমলাপুর মাঠে যখন খেলা জমতো, তখন পথ চলতে চলতে অবধারিত ভাবেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়তেন। স্কুল বাচ্চাদের খেলা হোক, যুবাদের, কিংবা কলেজ ছাত্রদের, কোনো বাছবিচার নেই। সতর্ক চোখে ফুটবলের প্রতিটি পাস, ক্রিকেটের প্রতিটি বলে নজরে রাখতেন। খেলার প্রতি ভালোবাসা তাঁর চোখ থেকে ঠিকরে ঠিকরে বেরুতো। এক সময় সহ্য করতে না পেরে নিজেই মাঠে নেমে পড়তেন। বয়স্ক একজন মানুষ কিশোরদের ভিড়ে বাঁইবাঁই করে ছুটছেন বল পায়ে নেবার জন্য। অনন্য এক দৃশ্য! গুরুকে যে সবাই "চিরতরুণ" বলেন, সেটা শুধু বলার জন্য বলা নয়।

আমার শ্রদ্ধার মানুষদের তালিকা দিনদিন ক্ষীণকায় হয়েছে। অনেক মানুষ যাদের শ্রদ্ধা করতাম, ভালোবাসতাম, তাদের লোভ ও দ্বিমুখিতা ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। নাম কাটা পড়েছে। কিন্তু গুরু, যিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন পাক হানাদের বিরুদ্ধে, শুদ্ধবাদের মুখে ছাই দিয়ে গিটারের তারে বেঁধেছেন এমন সব গান যেগুলো বদলে দিয়েছে বাংলার সঙ্গীতাঙ্গনকে, যিনি যাপন করে গেছেন নির্লোভ, কষ্টকর এক জীবন, প্রচন্ড বেদনাতেও যিনি মুখের হাসি মুছতে পারতেন না, সেই চিরতরুণ, প্রিয় আজম খানকে তালিকা থেকে বাদ দেবার সাধ্য শুধু আমার নয়, কারুরই নেই। তাই তিনি, পপসম্রাট আজম খান, শুধু ব্যান্ডশিল্পীদের গুরু নন, তিনি আমারও গুরু। আমাদের সবার গুরু। তাই গুরু, তোমাকে সালাম! আমার সৌভাগ্য যে তোমার সাথে দেখা, দু’টো কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। যতদিন আমার এই দেহে প্রান থাকবে, চিন্তাশক্তি থাকবে, এই মস্তিষ্কের এক প্রান্তে তোমার জন্য ভালোবাসটুকু বেঁচে থাকবে।

© অমিত আহমেদ

গুরুর ছবি, সৌজন্যে ডেইলি-সান


মন্তব্য

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

গুরুর জন্য শ্রদ্ধা আর দোয়া।

তারাপ কোয়াস এর ছবি

শ্রদ্ধা


love the life you live. live the life you love.

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

ভালো লাগলো লেখাটি। গুরুর জন্য শ্রদ্ধা আর দুঃখবোধ।

আয়নামতি1 এর ছবি

শ্রদ্ধা

অনিকেত এর ছবি

গুরু কে সেলাম----
আমাদের এই 'হিসেবি' জীবনযাপনের খেরোখাতায় যারা বেহিসেবি আঁচড় কাটেন---তাঁদের জন্যে আমার শ্রদ্ধা সব সময়ে একটু বেশি। আজম খান এমনই একজন। ইচ্ছে করলেই বা আরেকটু 'হিসেবি' হলেই তিনি হয়ত অনেক স্বাচ্ছন্দ্যের একটা জীবন পেতে পারতেন---কিন্তু তিনি আজকের এই গুরু হয়ত হতেন না। গুরু, তুমি কেবল তোমার গানের জন্যে নয়---একজন মানুষ হিসেবেও নিজেকে নিয়ে গেছ গুরু পর্যায়ে।
তোমাকে হাজার সেলাম--
চমৎকার লেখাটার জন্যে অমিত ভাই কে অনেক ধন্যবাদ!

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ধন্যবাদ অমিত এমন একটা লেখার জন্য। আমরাও গুরুকে ভালোবাসি, কিন্তু আমাদের মধ্যে কতোজন গুরুর চরিত্রের প্রায় সবগুলো দিক এমনভাবে তুলে ধরতে পারবে?

নিজের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত গুরু অর্থাভাবে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রাখায় তাঁকে অকালে চলে যেতে হল। গুরুকে যারা ঠকিয়েছে, তারা হয়তো নিজেদের অনেক বড় মনে করছে। ঐসব মূর্খের দল যা জানে না তা হচ্ছে তারা মরে গেলে তাদের নিজ পরিবারের মানুষ ছাড়া কেউ শোক করবেনা। আর গুরু চলে যাওয়ায় কোটি ভক্ত প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অশ্রু মোচন করেছে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

কীর্তিনাশা এর ছবি

শ্রদ্ধা

-------------------------------
আকালের স্রোতে ভেসে চলি নিশাচর।

পাগল মন এর ছবি

আপনি অনেক সৌভাগ্যবান যে গুরুর দেখা পেয়েছেন সামনাসামনি।

গুরুর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি (এ ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে মন খারাপ ) ।

------------------------------------------
হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস
তবুও তো ভাই কারোরই নাই, একটুখানি হুঁশ।

নৈষাদ এর ছবি

ভাল লাগল গুরুকে নিয়ে আপনার এই স্মৃতিচারণ।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

শ্রদ্ধা

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

yiafee এর ছবি

উনার মতো বড় তারকা হয়ার পর ও এত সরল আর কোন বাংগালি মনে হয় নাই। আমরা তো মাম , চাচা সটার হইলেও এর চেয়ে বেশী ভাব নেই।

অজ্ঞাত  এর ছবি

নটর ডেমিয়ান হিসেবে অনেক কিছুরই দেখা পেয়েছি কলেজ জীবনে কিন্তু আফসোস গুরুর দেখা পেলাম না......বড্ড দেরি হয়ে গেল আমার মন খারাপ

দময়ন্তী এর ছবি

শ্রদ্ধা

-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'

তাসনীম এর ছবি

শ্রদ্ধা

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

অমিত এর ছবি

শ্রদ্ধা

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

চমৎকার লেখা।

গুরু, তোমায় সালাম।

ধুসর গোধূলি এর ছবি

এজিবি কলোনির চিপা দিয়ে, আইডিয়াল কলেজকে ক্বেবলা ধরে কিংবা কমলাপুরের এদিকে বৈকালিক হাঁটাহাঁটি করার সময়ে গুরুর দেখা পেয়েছি কলেজের সেই বাঁশ খাওয়া দিনগুলোতে। কখনো পলো টিশার্ট আর ট্রাউজার, কখনো ট্র্যাকস‌্যুটে খোঁচাখোঁচা দাঁড়ির গুরুর দিকে তাকিয়ে একটা সশ্রদ্ধ হাসি দিতাম, ফেরতও পেতাম। কিন্তু কখনোই দাঁড়িয়ে দু-দণ্ড কথা বলা হয়নি। হয়তো মনের কোণে ভয় বা সঙ্কোচ ছিলো, 'কতো বড় মানুষ তিনি। আমি তো কোন এক মলা মাছ!'

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

..................

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

যাযাবর ব্যাকপ্যাকার এর ছবি

পোস্টটা ভালো লাগলো... সামনাসামনি দেখার, কথা বলার সুযোগ পেয়েছ, সেই একান্ত নিজস্ব অনুভূতিগুলো পড়তে ভালো লাগলো...

শ্রদ্ধা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে, একজন স্পষ্টবাদী মানুষকে, একজন কিংবদন্তীতুল্য গায়ককে ...

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

কল্যাণ এর ছবি

মন খারাপ

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।