হারিয়ে যাওয়া রূপকথা -২

ধুসর জলছবি এর ছবি
লিখেছেন ধুসর জলছবি [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ১৫/০১/২০১৩ - ১:১৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

স্কুল ও বন্ধুরা

আমার প্রথম স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি বেশ মজার, সবারই নিশ্চয়ই। আমি এমনিতেই ছোটবেলায় একটু ছেলে ছেলে টাইপ ছিলাম। চাচাদের এবং ভাইদের প্রভাবের কারণেই হয়ত আমি যে মেয়ে এই বোধটাই আমার অনেক বড় হয়ে হয়েছে। একেবারে কখনও না হলেই সবচেয়ে ভাল হত, কিন্তু ইদানীং প্রায়ই মনে পড়ে যায় যে আমি আসলে একটা মেয়ে, নিজ থেকে মনে না করলেও সমাজ মনে করিয়ে দিতে ভুলে না। যে যেভাবে পারে মেয়েদেরকে ভুলতে দেয় না সে যতই মানুষ হোক , তার শিক্ষার দৌড় যতদূরই থাকুক , মেধা, মনন , রুচিবোধ, আভিজাত্য,মানসিক সৌন্দর্যে সে যত ঊর্ধ্বেই থাকুক, শেষ পর্যন্ত সে একটা মেয়ে। মিষ্টির দলা, যাকে মাছিদের ভয়ে নিজেকে ঢেকে রাখতে হয়, যে কেউ যেভাবে ইচ্ছে ভেঙ্গেচুরে দিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলতে পারে তাকে। তাকে তার শরীরের বাঁক দিয়ে বিচার করা যায়, মনুষ্যত্ব দিয়ে কখনই না। কেউ হয়ত রাস্তায় দাড়িয়ে কটূক্তি করে, আবার কেউ বাসে চলার পথে সুযোগ পেলেই গায়ে হাত দিয়ে মনে করিয়ে দেবে তুমি মেয়ে, নিজের গাড়ি নিয়ে বের হলেও রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে মার্সিডিজ চালক পর্যন্ত মেয়ে ড্রাইভার দেখলেই বাজে আচরণ করবে, অহেতুক বেশভূষা নিয়ে মন্তব্য করবে, ধর্ষকরা ধর্ষণ করে বুঝিয়ে দিবে “তুমি মেয়ে যে কোন মুহূর্তে তুমিও ধর্ষিত হতে পার মনে রেখ” , কর্মক্ষেত্রে কলিগরা কিছু হলেই “মেয়ে হয়ে এখানে এসেছ এখন বুঝ” এরকম ভাবভঙ্গী দেখিয়ে, বন্ধুদেরও কেউ কেউ মাঝে মাঝে “মেয়েমানুষ বেশী পড়া বেশী বোঝা আসলে ভাল না, সংসারে অশান্তি হয়” কারণে অকারণে এরকম টীকাটিপ্পনী কেটে, আত্মীয় স্বজনরা মেয়েমানুষ দেরী হয়ে যাচ্ছে বিয়ে কর,বিয়ে করল পরে আবার এবার বাচ্চা নাও, সংসারী হও এইসব বলে বলে, শ্বশুর বাড়ির লোকদের কথা আর নাহয় নাই বললাম, ওখানে তো আমি মেয়ে এটাও একটা সমস্যা, আবার আমি মেয়েদের মত আচরণ করি না এটাও আমার একটা সমস্যা। যাই হোক বেঁচে থাকাটাই একটা বড় সমস্যা , তাই এ নিয়ে আর ত্যানা না পেঁচিয়ে সেই সময়ের গল্প বলি যখন আমি একটা মূর্তিমান সমস্যা ছিলাম না, ছিলাম সম্ভাবনা।

তো যা বলছিলাম, আমার স্কুলের প্রথম দিনের কথা। আমি যেহেতু খুবই আগ্রহী ছিলাম স্কুলের ব্যাপারে তাই কান্নাকাটি, ভয় এসবের কোন বালাই ছিল না। প্রথম দিন ক্লাস করতে গিয়েছিলাম একটা সুট পরে এবং যথারীতি ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়েরা আমাকে ছেলে বলে ধরে নিয়েছিল । গিয়ে বসতেই পাশে বসা এক অতি পাকনা মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল "তোমার নাম কি?" আমি নাম বলার পর সে নাক মুখ কুঁচকে বলল "এটাত মেয়েদের নাম।" আমি তার নাক কুঁচকানো দেখে ক্ষেপে গিয়ে পাশের বেঞ্চে এসে বসলাম। এরপর এক নাদুস নুদুস টাইপ লক্ষ্মী ছেলে আমার পাশে এসে বসল এবং ক্লাস শুরু হওয়ার পরপরই যথারীতি বেদম কান্না জুড়ে দিল। ক্লাসটিচার যতই বুঝায় , বাবা সোনা বলে আদর করে সে ততই আরও জোরে কান্না শুরু করে। তার কান্না দেখে আসতে আসতে ক্লাসের আরও কিছু ছেলেমেয়ে কান্না শুরু করল। চারপাশে এত কান্নাকাটি দেখে শেষমেশ আমারও কান্না পেয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কান্নাকাটি তো করে বোকারা, আমি কি বোকা নাকি? তাই আমার মনে হল আমার এখনই কিছু একটা করা দরকার। নিজেকে কান্নার হাত থেকে বাঁচাতে হলে আমার প্রথমে এই ছেলের কান্না থামাতে হবে। তাই তাকে থামানোর জন্য প্রথমে তার দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিলাম এরপর আমার একটা চকলেট দিলাম। কিসের কি, গাধাটা চকোলেট,বন্ধুত্ব,হাসি এসব কিছুই বুঝে না। এদিকে আমিও তখন কেঁদে দেই দেই অবস্থা। শেষে উপায় অন্তর না দেখে আমি তাকে একটা রাম ধমক দিয়ে বসলাম( যে ধমকটা প্রায়ই আম্মুকে দিতে শুনতাম) ব্যাস, সব ঠাণ্ডা। আমাকে ধমক দিতে দেখে পোলাপান এতই তব্দা খেয়েছিল যে কান্না কাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। পরে অবশ্য আবার শুরু হয়েছিল। কিন্তু লাভের মধ্যে লাভ হয়েছিল , আমি প্রথম দিন স্কুলে গিয়েই ক্লাস ক্যাপ্টেন বনে গেলাম। বেশ কিছুদিন পর্যন্ত আমার ধারনা ছিল ক্যাপ্টেন মানেই রামধমক দিতে পারা। আর আমাদের বাসার ক্যাপ্টেন হল আমার মা।

স্কুলের প্রতিদিনকার খুঁটিনাটি কেন যেন আমার মনে নেই। তার বদলে আজাইরা জিনিস মনে আছে। যেমন আইভি ম্যাডাম কিভাবে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকাত, কেউ কাঁদলে ফরহাদ স্যার কিভাবে তাকে কোলে বসিয়ে গল্প বলত, টিফিনের সময়গুলোতে কিভাবে সবাই হুল্লোড় করতাম,হিরা নামে আমাদের এক ব্যাচমেট কিভাবে হা করে সারা ক্লাস ঘুমত আর স্যাররা প্রশ্ন করলে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকত( এখন সেই ছেলে এক পত্রিকার সাংবাদিক, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না বলেই হয়ত এমন পেশা বেছে নিয়েছে যেখানে নিজে সবাইকে আবোল তাবোল প্রশ্ন করবে, আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যা মনে আসে লিখে ফেলবে) কিভাবে আমরা বেঞ্চের উপর কলম খেলতাম, আমার এক ঝগড়াটে ডানপিটে বান্ধবীকে কিভাবে ছেলেরা হিটলার বলে খেপাত আর সে প্রত্যেকদিন বিচার দিয়ে কাউকে না কাউকে বকা খাওয়াত।

প্রথম স্কুলটা যেহেতু ছিল কিন্ডারগার্টেন ( ফাইভে উঠে আমি মতিঝিল গভমেন্ট গার্লসে এসে ভর্তি হই) তাই পড়াশুনার পরিমাণ মানে বইয়ের সংখ্যা বেশ বেশী ছিল, আর ছিল হরেক রমকের ঢং , অমুক ডে , তমুক প্রোগ্রাম । টিচাররা অবশ্য ছিল খুবই ভাল। দুএকজন বদরাগী টিচার ছাড়া বাকিরা সবাই ছিল মাটির মানুষ, বাচ্চাদের কথায় কথায় মারার অভ্যাস ছিল না এখানে। বড় হয়ে অনেক বন্ধুদের কাছে স্যারদের হাতে মার খাওয়ার গল্প শুনেছি এবং শিউরে উঠেছি। আমাদের একটা ম্যাডাম ছিল যে না মারলেও ছোট খাট কারনেই নানা রকম অদ্ভুত অদ্ভুত শাস্তি দিত, খুব বাজে ভাবে ধমকা ধমকি করা, আঙ্গুলের ফাকে কলম ঢুকান থেকে শুরু করে ব্লাকবোর্ডের সামনে কানে ধরে দাড়িয়ে থেকে ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়ের দেঁতো হাসি দেখা এবং কিছুক্ষণ পর পর বলা যে আর করব না ইত্যাদি ইত্যাদি। তার একটা শাস্তি ছিল যেটাতে প্রায়ই আমার জড়িয়ে পড়তে হত। কেউ কোন অন্যায় করল তো ক্লাস ক্যাপ্টেন গিয়ে ১০ বা ততোধিক বার তার কান মলে দিবে, বাকিরা হাততালি দিবে। না জানি কত মানুষের চোখে আমি তখন চক্ষুশূল ছিলাম ! বড় হয়ে খুব খারাপ লেগেছে। যাদের যাদের সামনে পেয়েছি দুঃখিত বলেছি। যাদের পাইনি তাদের কে মনে মনে বলেছি। এভাবেই মনে হয় আমাদের স্কুল গুলোতে ভালবাসার বদলে বিদ্বেষ শেখান হয়।

একদম প্রথমে স্কুলে আমার কোন বন্ধুই হয়নি। যাদের সাথে আমার রেজাল্ট মিলত, যাদের সাথে বসতে হত তাদের সাথে আমার নিজের মিলত না। আর যাদের সাথে মনের মিল হত, আমি যে বই পড়তাম যারা তা পড়ত, আমি যা করতে চাইতাম যারা তাই করত তারা আমাকে ওদের দলের বলে মনে করত না। হাইস্কুলে উঠার পরই বুঝে গিয়েছিলাম বেশী মার্কস আর ক্যাপ্টেন হওয়াই আমার আনন্দময় দিন কাটানোর পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা। তাই ক্যাপ্টেন্সি ছেড়ে দিলাম, রেজাল্ট খারাপ করা শুরু করলাম, ভুলেও আর কোনদিন ফার্স্ট বেঞ্চে বসিনি। ব্যাস আমার ঝটপট একগাদা বন্ধু হয়ে গেল। আমার বাবা মা আমাকে নিয়ে হতাশ হল, ক্লাসের টিচাররা হতাশ হয়ে গেল, আমি কিন্তু হলাম মহা সুখী।

বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে ছিল পড়ুয়ার বন্ধুত্ব, এদের সাথে একসাথে বই কিনি , বই ধার করি, ক্লাসের মধ্যেই লুকিয়ে পড়ি, মাঝে মাঝে ধরাও খাই, আবারও পড়ি, আবার ধরা খাই, বই নিয়ে গল্প করে সময় পার করি । কারও সাথে আবার সম্পর্ক কার্টুন আর টিভির বিভিন্ন সিরিয়ালের, উডিউডপেকার বেশী ভাল ছিল না ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট, সুপারম্যান বেশী হ্যান্ডসাম নাকি সিন্দবাদ, এসব নিয়ে তর্ক করে দিন কাটাই। এক বান্ধবী আবার ছিল ক্রিকেট পাগল, ওর সাথে আড্ডা হত শুধু ক্রিকেট নিয়ে,বলাই বাহুল্য আড্ডার সবচেয়ে বহুল আলোচিত বিষয়বস্তু কোন ক্রিকেটার কত বেশী কিউট। আর এক বান্ধবী ছিল মহা সুন্দরী আর তার কাজই ছিল প্রেম করা। দুদিন পর পর নতুন একটা প্রেম করতো আর আমাকে সেসবের গল্প শোনাত। তার আজব আজব যায়গায় গিয়ে প্রেম হয়ে যেত। বারান্দা দিয়ে, স্কুলের গেটে এমনকি শপিংমলে হাটতে হাটতেও । তার গল্প ছিল কোন ছেলে তার দিকে কিভাবে তাকাল, কোন ছেলে বাসায় ফোন করে জ্বালাচ্ছে, কে কিভাবে প্রেম নিবেদন করে ইত্যাদি ইত্যাদি। আস্তে আস্তে আমিও বলা শুরু করলাম আমার কাকে কেমন লাগে। প্রেমের ক্ষেত্রে আমার ঝামেলা ছিল একটাই । তা হল আমার স্বপ্নের নায়কেরা সবাই থাকত ধরাছোঁয়ার বাইরে , অধিকাংশই বইয়ের পাতায়, আর ধরাছোঁয়ার ভিতরে যারা ছিল তাদেরকে আমার মনে হত ধ্যাত, এই হবে আমার বয়ফ্রেন্ড,কক্ষনও না। আমার এই আজব সমস্যা নিয়ে আমার সেই বান্ধবী খুব চিন্তিত ছিল। আমি অবশ্য ছিলাম না, কারণ আমি তখন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি না, স্বপ্নরাই সব আমাকে বাঁচিয়ে রাখত।

ক্লাস নাইনে উঠার পর আমার একটা বান্ধবী হয়, যে আমাকে বোহেমিয়ানগিরির হাতে খড়ি দিয়েছে। ওর সাথে স্যারের বাসা থেকে বের হয়ে আমরা রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতাম, এখানে ওখানে খাবার খেতাম, টঙের দোকানে চা খেতাম, বৃষ্টি হলেই হুট খুলে দিয়ে রিকশায় বৃষ্টিতে ভিজতাম । ওর সাথে রাস্তায় হাটতে গিয়েই আমি প্রথম আবিষ্কার করেছি এদেশের শিশুদের একটা বড় অংশ রাস্তায় জন্মায়, রাস্তাতেই জীবন কাটিয়ে দেয়। এভাবে টুকটাক ঘুরাঘুরি নিশ্চয়ই তেমন কিছুই না, কিন্তু তবুও স্বাধীনতার একটা নতুন রূপ শিখেছিলাম তখন। এই পাগলাটে মেয়েটাকে এইচ এস সি এর পরে ওর বাবা মা জোর করে ধরে বিয়ে দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়, অথচ আমরা দুজন ঠিক করেছিলাম আমরা কখনও বিয়ে করব না,দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াব, ভবিষ্যতের মহিলা তারেক অণু হব আর কি। জানিনা ও এখন কেমন আছে। নিশ্চয়ই চারপাশের পৃথিবীর চাপে সেও শিখে গেছে কিভাবে নিজের মানুষ রূপটা ঢেকে রেখে শুধু মেয়ে হয়ে বেঁচে থাকতে হয় ।

আমার চিঠি লেখার অভ্যাস একেবারে ছোট থেকেই। কিন্তু চিঠি পাঠানোর মত কোন মানুষ নেই, কারণ আত্মীয় স্বজনরা সবাই ঢাকাতেই আসে পাশে থাকে। তাই আর এক বান্ধবীর সাথে চুক্তি করলাম আমরা একজন আর একজনকে চিঠি লিখব । ওর সাথে এভাবে চিঠি চালাচালি করেছি বেশ কয়েক বছর। এখন সেইসব চিঠি গুলো খুলে পড়লে খুব ভাল লাগে। কত ধরনের প্লান করতাম আমরা, কত অদ্ভুত, ছোটখাটো হাস্যকর ব্যাপারগুলো নিয়ে আমরা চিন্তিত হতাম,কত হাবিজাবি বিষয়কে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবতাম। চিঠিগুলো খুললে মনে হয় আমি না, এই জন্মেও না, অনেক আগের কোন জন্মে অন্য কেউ হয়ত এগুলো লিখেছিল।

যখন ক্লাস টু তে পড়ি আমাদের ক্লাসে একটা ছেলে ছিল সুমন চন্দ্র নামে, ছেলেটার ডান হাতটা বাঁকা ছিল, যে কোন ভাবে এক্সিডেন্টে, আমার মনে নেই সেটা, বা হয়ত আসলে কখনও প্রশ্নই করিনি কেউ ওকে। ছেলেটা একে পড়াশুনা করত না, তার মধ্যে হাত বাঁকা থাকার কারণেই হয়ত লিখতেও পারত না তাড়াতাড়ি। রেজাল্ট ছিল চূড়ান্ত খারাপ। তাই ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব তো না ই কথাও হত না তেমন কখনও। তো একবার পরীক্ষার হলে আমার পাশে কিভাবে কিভাবে যেন ওর সিট পড়ল। মায়া লাগার কারণে হোক বা এমনিতেই ক্লাসফ্রেন্ড মনে করেই হোক আমি ওকে আমার পুরো খাতা দেখিয়েছিলাম। এটা গল্প না ,গল্পটা হল এই পাগলা ছেলে এরপর বলা শুরু করল যে সে বড় হয়ে আমাকে বিয়ে করবে। এবং সে এটা এতই জোর দিয়ে বলত সবাইকে যে বিয়ে জিনিসটা কি ঠিকমতো না বুঝলেও আমি ওর কথা শুনে রীতিমত ভড়কে গিয়েছিলাম তখন। এরপর ওর সাথে আমি আর কথাই বলতাম না কখনও । টু এর শেষের দিকে এসে ছেলেটা ক্লাসে আসা বন্ধ করে দেয়। পরে শুনেছি সে মারা গিয়েছে। এখনও মনে পড়লে খুব কষ্ট হয় কেন বেচারার সাথে আমি কথা বলতাম না তখন। ছোটবেলার মন খারাপ করা স্মৃতিগুলোও খুব প্রিয় থাকে সবার, দুঃখগুলোকেও একটা সময় এসে খুব জরুরী মনে হয়, যার সাথে সামান্য হাসিমুখে অল্পস্বল্প কথা হত তাকেও এখন মনে হয় খুব আপন। এই স্মৃতিটা বড়বেলার হলে হয়ত ভুলেই যেতাম, কিন্তু রূপকথার দিনগুলোতে ঘটেছিল বলেই মনে হয়, না জানি আমাদের মধ্যে কত প্রেম ছিল।

আমরা এমন একটা সময়ে বেড়ে উঠেছি যখন ইন্টারনেট এত সহজলভ্য ছিল না, ফেবু আবিষ্কার হয়নি, মোবাইল তো দূরের কথা একদম পিচ্চিকালে আমাদের বাসায় এমনকি ল্যান্ডফোন ও ছিল না, তাই ভার্চুয়াল যোগাযোগ বলতে কোন শব্দও ছিল না তখন, যা কিছু সম্পর্ক, আর সম্পর্কের যত টানাপোড়ন সবই হত সামনাসামনি। এখনকার মত হয়ত এত সহজে বন্ধু পাওয়া যেত না কিন্তু অল্প বন্ধুদের নিয়েই জগতটা থাকত কানায় কানায় পূর্ণ। ইদানীং বন্ধু বানানো যায় হাজারে হাজারে কিন্তু তারপরও কেন যেন ফাঁকা রয়ে যায় মনের অসংখ্য অলিগলি। ইচ্ছে করলেই ডাকার মাধ্যম আছে অনেক, কিন্তু ডাকার মানুষ আর তাদের সময়ের বড় বেশী অভাব।

( চলবে )

ফুট নোট- আমার স্মৃতিচারণ খুব এলোমেলো, লিখতে বসে যা মনে হয় লিখে ফেলি,মনে করে করে গুছিয়ে লেখাটা রপ্ত হয়নি এখনও, হয়ত কোনদিনও হবে না।


মন্তব্য

সাফিনাজ আরজু এর ছবি

আমরা দুজন ঠিক করেছিলাম আমরা কখনও বিয়ে করব না,দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াব, ভবিষ্যতের মহিলা তারেক অণু হব আর কি। জানিনা ও এখন কেমন আছে। নিশ্চয়ই চারপাশের পৃথিবীর চাপে সেও শিখে গেছে কিভাবে নিজের মানুষ রূপটা ঢেকে রেখে শুধু মেয়ে হয়ে বেঁচে থাকতে হয় ।

আমারও এমন একটা বন্ধু আছে, আমি খুব ভাগ্যবান যে ওর সাথে আমার যোগাযোগ কক্ষনও বিচ্ছিন্ন হয়নি। কিন্তু তবুও আমাদের কখনও মহিলা তারেক অনু হয়ে উঠা হয়নি। মেয়েদের জীবনটাই আসলে জানি কেমন, সমাজ আর কখনও মানুষের জীবন হতে দেয়না,মেয়ের জীবন বানিয়ে রেখে দেয় । ছোটবেলার বন্ধুরা এত বেশী কাছের হয়, এত বেশী আপন হয়-- আমার সেই বন্ধুটার সাথেই আমার বাউন্ডুলে জীবনের হাতেখড়ি।
আপনার এই লেখাটি বারবার আমার ছোটবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।

ইদানীং বন্ধু বানানো যায় হাজারে হাজারে কিন্তু তারপরও কেন যেন ফাঁকা রয়ে যায় মনের অসংখ্য অলিগলি। ইচ্ছে করলেই ডাকার মাধ্যম আছে অনেক, কিন্তু ডাকার মানুষ আর তাদের সময়ের বড় বেশী অভাব।

চলুক চলুক

লেখাটি বড্ডও মন কেমন করে দিল সব মিলিয়ে। লেখায় পাঁচ তারা দিলুম। হাসি

__________________________________
----আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে---

ধুসর জলছবি এর ছবি

অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের মত কিছু মানুষের উৎসাহ পাই বলেই আলসেমি ঝেড়ে ফেলে মাঝে মাঝে লিখে ফেলি। হাসি

আমারও এমন একটা বন্ধু আছে, আমি খুব ভাগ্যবান যে ওর সাথে আমার যোগাযোগ কক্ষনও বিচ্ছিন্ন হয়নি।

আসলেই ভাগ্যবান। আমি অবশ্য এসব ব্যাপারে খুব দুর্ভাগা, হারিয়ে ফেলি খুব সহজে, কিন্তু খুঁজে পাওয়া হয় না আর।

অতিথি লেখক এর ছবি

যাক! রূপকথা নিয়ে ফিরে আসলেন তাহলে! অসাধারণ লাগলো, এলোমেলো লেখাগুলোই কেন জানি বেশী ছুঁয়ে যায়।

ফারাসাত

ধুসর জলছবি এর ছবি

হুম, একটু দেরী হয়ে গেল, আলসেমি ঝেড়ে উঠতে পারি না আসলে। অনেক ধন্যবাদ ভাললাগা জানানোর জন্য। হাসি

স্যাম এর ছবি

সহমত - দারুন জলছবি হাসি

ধুসর জলছবি এর ছবি

ধন্যবাদ স্যাম। হাসি

ফাহিম হাসান এর ছবি

স্মৃতিকথন এলোমেলো হওয়া জায়েজ আছে। আপনার লেখার প্রথম প্যারাটুকু পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল - এটা খুবই সত্যি কথা যে মেয়ে হয়ে জন্মালে ব্যক্তি/পরিবার/সমাজ বারবার মনে করিয়ে দিবে সীমাবদ্ধতার কথা।

লেখা চলুক

ধুসর জলছবি এর ছবি

সবাই যেদিন আপনার মত সহানুভূতিশীল হবে সেই দিন হয়ত সমস্যাটা কমবে। তবে সবার আগে মেয়েদের নিজেদের চিন্তা ভাবনায় সচ্ছ উন্নত হতে হবে, কিন্তু সমস্যা হল মেয়েদের একটা বড় অংশই মেয়েদের কে নানা ভাবে অত্যাচার করে। সমাজ মেয়েদের অত্যাচার করার জন্য মেয়েদেরকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করে আসছে।আমি মাঝে মাঝে ভাবি এ সমস্যা প্রতিকার কি,কি করলে ঠিক হবে? কিন্তু সমস্যাটা এত বেশী গভীরে প্রথিত যে উপড়াতে হয়ত কয়েক সহস্র বছর লেগে যাবে। নিজের আশেপাশের মেয়েগুলোকে সচেতন করার চেষ্টা করি, কিন্তু তাতে আর কতটুকুই কি হবে।
অনেক ধন্যবাদ, ভাল থাকুন।

সাফিনাজ আরজু  এর ছবি

মেয়েদের একটা বড় অংশই মেয়েদের কে নানা ভাবে অত্যাচার করে। সমাজ মেয়েদের অত্যাচার করার জন্য মেয়েদেরকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করে আসছে।আমি মাঝে মাঝে ভাবি এ সমস্যা প্রতিকার কি,কি করলে ঠিক হবে? কিন্তু সমস্যাটা এত বেশী গভীরে প্রথিত যে উপড়াতে হয়ত কয়েক সহস্র বছর লেগে যাবে।

সহমত। মাঝে মাঝে সব মিলিয়ে অসহ্য লাগে।

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

হ্যাঁ, লেখা চলুক। চলুক

ধুসর জলছবি এর ছবি

ধন্যবাদ। আপনাকে সবসময় পাশে পাই সেই প্রথম থেকেই। অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা।

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

প্রথম অনুচ্ছেদটি একদম আমার মনের কথা, অনুভূতি। মানুষ হতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু মেয়েমানুষ হয়ে রয়ে যাচ্ছি বাসে, রিকশায়, ফুটপাথে, অফিসে এমনকি বাসায়ও।

লেখায় "আনন্দ আনন্দ" দিলাম আপনাকে।

ধুসর জলছবি এর ছবি

অনেক অনেক ধন্যবাদ। অনেকদিন পর আপনার মন্তব্য পেলাম। হাসি আপনাকেও অনেক "আনন্দ আনন্দ।" হাসি

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

কিছু মানুষ খুব ভালো স্মৃতিকথা লিখতে পারে। এই সচলায়তনেই নিবিড় ভাই আর তাসনীম ভাইয়ের এই জাতীয় লেখার আমি ফ্যান। আপনার লেখাটা কাজের ফাঁকে দুপুরেই পড়েছিলাম। এখন মন্তব্য করে ভালো লাগা জানিয়ে গেলাম। হাসি

ধুসর জলছবি এর ছবি

নিবির আর তাসনীম ভাইয়ের স্মৃতিকথার আমিও বিশাল ফ্যান। প্রিয় গল্পকারের কাছ থেকে ভাললাগা পেয়ে খুব ভাল লাগছে। হাসি

কৌস্তুভ এর ছবি

আগে আপনাকে ডাক্তার মানুষ জেনে ভয় পেতাম। এখন দেখচি ধমকদার মানুষ হিসেবেও ভয় পেতে হবে। ইয়ে, মানে...

ধুসর জলছবি এর ছবি

দেঁতো হাসি মানুষ জনকে ভয় দেখাতে আমার খুবই ভালো লাগে। আর দরকার পরলেই ধমক দেয়ার বদ অভ্যাস টা আমার এখনও আছে। দেঁতো হাসি

তিথীডোর এর ছবি

মনুষ্যজন্ম বড় যাতনার--- ক্রমাগত এইসব দুঃখবাদী ঘ্যানঘ্যানানির ব্যাপারে আমার ঈষৎ দুর্নাম আছে। ইয়ে, মানে...
তবে সত্যিকারের যাতনার বিষয় হলো মেয়ে হয়ে জন্মানোটা। দুৎ দুৎ। ম্যাঁও

লেখায় পাঁচতারা। চলুক চলুক

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

চলুক
সহমত

ধুসর জলছবি এর ছবি

সহমত।
অনেক ধন্যবাদ তিথীডোর হাসি

শাব্দিক এর ছবি

প্রথম প্যারাটা ততটা প্রাসঙ্গিক নয়, কিন্তু আমরা প্রতিটা মেয়ে, বিশেষ করে বাঙ্গালী মেয়েরা এসব প্রতি মুহূর্ত, প্রতি দিন অনুভব করি। আসলেই

মিষ্টির দলা

শব্দটা পারফেক্ট।

বাকি লেখা দারুন!!!
আপনার দেখছি অনেক কিছু মনে আছে, প্রথম স্কুলদিনের কথা। আমি তো কিছুই মনে করতে পারলাম না তেমন।

---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।

ধুসর জলছবি এর ছবি

আসলে বেশ কিছুদিন যাবৎ যা হচ্ছে চারদিকে এসব নিয়ে খুব ডিস্টার্ব ছিলাম, লিখতে গিয়েই সেটাই হয়ত বের হয়ে গেছে। আমি অতটা গুছিয়ে লিখতে পারিনা।
অনেক ধন্যবাদ।
অনেক কিছু মনে নেই,অনেক জিনিসই বেমালুম ভুলে গেছি। তবে প্রথম দিনের ঘটনাটা বহুল আলোচিত , তাই মনে আছে।

রুবাইয়াত  এর ছবি

দারুণ লেখা। হাসি হাততালি

ধুসর জলছবি এর ছবি

ধন্যবাদ।

মৃত্যুময় ঈষৎ এর ছবি

সিরিয়াস কথাগুলো বিমর্ষ করে ফেললো আপু! মন খারাপ

স্মৃতিচারণ ভালো লেগেছে। চলুক চলুক


_____________________
Give Her Freedom!

ধুসর জলছবি এর ছবি

ব্যাপারগুলো নিয়ে আমি নিজেই একটু বিমর্ষ ছিলাম রে ভাইয়া। এজন্যই লিখতে গিয়ে চলে এসেছে।
ভাল লেগেছে জেনে অনেক খুশি লাগছে আমার। হাসি

ইয়াসির আরাফাত এর ছবি

রূপকথা গুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে চলুক

ধুসর জলছবি এর ছবি

রূপকথা গুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে

সেটাই। অনেক ধন্যবাদ।

রংতুলি এর ছবি

ভালো লাগলো! চলুক

ধুসর জলছবি এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ

তুলিরেখা এর ছবি

লেখা ভালো লাগলো।

বেশ কিছুদিন পর্যন্ত আমার ধারনা ছিল ক্যাপ্টেন মানেই রামধমক দিতে পারা। আর আমাদের বাসার ক্যাপ্টেন হল আমার মা।

হাসি

কেউ কোন অন্যায় করল তো ক্লাস ক্যাপ্টেন গিয়ে ১০ বা ততোধিক বার তার কান মলে দিবে, বাকিরা হাততালি দিবে। না জানি কত মানুষের চোখে আমি তখন চক্ষুশূল ছিলাম ! বড় হয়ে খুব খারাপ লেগেছে। যাদের যাদের সামনে পেয়েছি দুঃখিত বলেছি। যাদের পাইনি তাদের কে মনে মনে বলেছি। এভাবেই মনে হয় আমাদের স্কুল গুলোতে ভালবাসার বদলে বিদ্বেষ শেখান হয়


মন খারাপ ঠিক। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, টীম তৈরী করে কাজ করা---এসব প্রায় অনুপস্থিত। বদলে আছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর ইঁদুর দৌড়। মন খারাপ

আপনার সেই বান্ধবীর কথা খুব ভালো লাগলো, যে সারাজীবন দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবার প্ল্যান করতো। হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ধুসর জলছবি এর ছবি

আমরা দুজনেই করতাম। কিন্তু কেউই পারিনি। অনেক ধন্যবাদ আপু। আপনার স্মৃতিচারণের আমি খুব ভক্ত। মন্তব্য পেয়ে খুব ভাল লাগছে। হাসি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।