মানব বিবর্তনে পনির, গম এবং মদের প্রভাব, অথবা খাদ্যাভ্যাস যেভাবে মানব বিবর্তনকে প্রভাবিত করেছে

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শুক্র, ২৫/১০/২০১৯ - ১০:২১অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

হাজার বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবজাতি আজকের অবস্থায় পৌছেছে। এই সুদীর্ঘ চলমান বিবর্তন প্রক্রিয়ায় জিনগত পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবেশগত বিভিন্ন প্রভাবক মানুষের বিবর্তনে নতুন নতুন মাত্রা দিয়েছে যেমন দুপায়ে ভর করে চলা বা মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ইত্যাদি। ঠিক তেমনি খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও মানব বিবর্তনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল যেটা এখনো চলমান। আজকের লেখাটি মূলত মানব বিবর্তনে খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব নিয়েই। মূল লেখাটি লিখেছেন ব্রায়ান হ্যান্ডরেক যেটা এখান থেকে পড়তে পারেন।

আমরা যা খাই, আমরা ঠিক তা নই। তবুও বহুপ্রজন্ম ধরে আমরা যা খাই সেটা আমাদের বিবর্তনকে প্রভাবিত করে। সময়ের সাথে সাথে খাদ্যাভ্যাস আমাদের শারীরিক গঠন, প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং চামড়ার রঙে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ জন হক বলেন, “খাদ্যাভ্যাস আমাদের বিবর্তনের ইতিহাসে একটি মৌলিক গল্প হয়ে দাড়িয়েছে। আমরা মনে করি, বিগত মিলিয়ন বছর ধরে মানুষের শারীরবৃত্ত, দাঁত এবং মাথার খুলিতে যে পরিবর্তন এসেছে তা সম্ভবত আমাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত”। বিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া, তাই বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসাবে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আলঝেইমার রোগ থেকে শুরু করে আমাদের চামড়ার রঙ এমনকি ঋতুস্রাবের সময় পর্যন্ত সবকিছুই প্রাকৃতিক নির্বাচনের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এসম্পর্কিত জিনতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে মানুষ এখনো বিবর্তিত হচ্ছে। এবং আমরা আজ যা খাচ্ছি সেটা প্রভাবিত করছে বিবর্তনের ধারায় ভবিষ্যতে আমরা কোন দিকে ধাবিত হবো।

উদাহরণ হিসাবে প্রথমে আমরা দুধের কথা উল্লেখ করতে পারি। যেমন, বাচ্চাকালে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা মায়ের দুধের উপর নির্ভর করে তাই তাদের শরীরে ল্যাকটেজ নামক একধরণের এনজাইম (উৎসেচক) তৈরি হয় যা কিনা মাতৃদুগ্ধে উপস্থিত ল্যাকটোজ নামক চিনিকে হজম করতে সাহায্য করে। কিন্তু পরবর্তিতে বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রানীরা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাদের অন্য খাবারের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায় ফলে খাদ্যতালিকা থেকে দুধ বাদ পড়ে যায়। যেকারণে, ওই এনজাইমের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তাই প্রাপ্তবয়স্ক স্তন্যপায়ী প্রাণীরা সাধারণত ল্যাকটোজ এনজাইম তৈরি বন্ধ করে দেয়। সেকারণে দেখা যায়, আজকের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু বা শৈশবকালের পরে তাদের ল্যাকটোজ হজম করার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। যেহেতু পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ভিন্নতা রয়েছে, তাই ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী মানুষের ল্যাকটোজ সহনশীলতায়ও ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন, কিছু পূর্বএশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এই অসহিষ্ণুতা প্রায় ৯০ শতাংশ; উপরন্তু পশ্চিম আফ্রিকা, আরব, গ্রীক, ইহুদি এবং ইতালীয় বংশোদ্ভূত মানুষরাও বিশেষভাবে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

তবুও কিছু মানুষ এই সমস্যাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারেন, সেজন্য সাম্প্রতিক বিবর্তনকে ধন্যবাদ। যেমন, ধারণা করা যাচ্ছে উত্তর ইউরোপীয়রা ল্যাকটোজ পছন্দ করে যেকারণে তাদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ ল্যাকটোজ সহনশীল। অর্থাৎ তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পরেও ল্যাকটেজ তৈরি করতে পারে এবং সম্প্রতি এধরণের মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। হকস বলেন, “কমপক্ষে পাঁচটি ভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই সকল মানুষের ল্যাক্টোজ হজম করার জন্য দায়ী জিনের পরিবর্তন ঘটেছে যাতে করে এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সক্রিয় থাকে”। এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার লোকদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। প্রাচীন ডিএনএ গবেষণা করে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের এই ল্যাকটোজ সহনশীলতা মানব বিবর্তনে অতি সাম্প্রতিক ঘটনা। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বর্তমানে ল্যাক্টোজ সহনশীল হলেও, ২০,০০০ বছর আগেও আমাদের ডিএনএ’তে এধরণের কোন পরিবর্তনের অস্তিত্ব ছিলনা।

সাম্প্রতিক এই বিবর্তনীয় পরিবর্তন নির্দেশ করে যেসব জনগোষ্টি গাঁজন প্রক্রিয়ায় দুধ থেকে দই বা পনীর তৈরি করতো তাদের তুলনায় সরাসরি দুধ গ্রহণ করতো এমন মানুষগুলো টিকে থাকার জন্য নিশ্চয়ই বাড়তি সুবিধা পেয়েছিল। কারণ গাঁজন প্রক্রিয়ায়, ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটোজসহ দুধের অন্যান্য শর্করা ভেঙে অ্যাসিডে পরিণত করে তাই ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুদের হজমে সমস্যা হতো না ঠিকই কিন্তু সরাসরি দুধ গ্রহণ করলে দুধে থাকা শর্করা অনেক বেশী শক্তি জোগাতো যেটা টিকে থাকার জন্য অধিক জরুরী ছিল। অতীতে দুধ খেয়ে হজম করতে পারাটা একধরণের আশির্বাদ ছিল, হকস এর কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “ধরুন আপনি এমন কোন পরিবেশে বসবাস করেন যেখানে অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য সীমিত কিন্তু আপনার কাছে গবাদি পশু, ভেড়া, ছাগল বা উট আছে যারা এমন একটা পুষ্টিকর খাবার দেয় যা বাচ্চারা হজম করতে পারলেও বয়স্করা পারেনা”। “ফলে আপনার বা যাদের ল্যাকটোজ হজমের সমস্যা নেই তারা প্রায় ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত শক্তির জোগান পাবে”।

সাম্প্রতিক একটি জিন গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতে রোমান ব্রিটেনে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ল্যাকটোজ সহনশীলতা এখনকার তুলনায় কম ছিল। অর্থাৎ পুরো ইউরোপ জুড়ে এই বিবর্তন এখনো অব্যাহত রয়েছে। যদিও আজকাল মানুষের কাছে দুধের বিকল্প প্রচুর খাবারের পাশাপাশি ল্যাকটোজমুক্ত দুধ বা নিয়মিত দুধ হজমে সহায়তা করে এমন ল্যাকটোজ পিল আছে। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক নির্বাচনের কিছু প্রভাব এখন আমরা এড়াতে পারি। সেজন্য, অতীতে দুধ হজম করতে পারাটা আমাদের টিকে থাকা এবং প্রজননে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারলেও এখন আর পূর্বের মত প্রভাব নেই, অন্ততপক্ষে পৃথিবীর কিছু অংশে। উদাহরণস্বরূপ, হকস বলেন, “যতদূর জানি, সুইডেনে আপনার বেচে থাকা এবং প্রজননের ক্ষেত্রে আপনি দুধ খেয়ে হজম করতে পারেন কিনা তার কোন প্রভাব নেই কারণ আপনি খাবারের জন্য সুপারমার্কেটের উপর নির্ভর করেন যেখানে সব ধরণের বিকল্প খাবার পাওয়া যায়। যদিও পূর্ব আফ্রিকায় এখনো এটা বেশ পার্থক্য তৈরি করতে পারে”।

আবার ধরুন, আজকাল কোন মুদি দোকানে গ্লুটেন (গম, যব ও রাই জাতীয় শস্যে থাকা আঠালো একধরণের প্রোটিন) বিহীন পাউরুটি ও বিস্কুটে ভরা পুরো একটা করিডোর খুজে পাওয়া অসম্ভব না। অনেকেই গ্লুটেন হজম করতে পারেনা যা সিলিয়াক রোগের (অন্ত্রের প্রদাহ) জন্য দায়ী। মানব বিবর্তনের অংশ হিসাবে গ্লুটেন হজমের এই সমস্যার উদ্ভব অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক। কারণ প্রায় ২০,০০০ বছর আগে অবধি মানুষ নিয়মিত হারে খাদ্যশস্য খাওয়া ও সংরক্ষন করা শুরু করেনি এবং ১০,০০০ বছর আগ পর্যন্ত গম চাষ শুরুই হয়নি। গম ও রাই মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রাধান্য পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের সিলিয়াক রোগের প্রাদুর্ভাবও তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। হকস বলেন, “আপনারা দেখুন এবং বলুন এটি কিভাবে হলো?”। “প্রাকৃতিক নির্বাচনের কারণে এমনটা হওয়ার কথা নয়”। কারণ প্রকৃতি সাধারণত কোন একটি জনগোষ্টিতে বেচে থাকতে বাড়তি সুবিধা দেয় এমন বৈশিষ্ট্য বা প্রভাবককে পরবর্তি প্রজন্মের ভিত্তি হিসাবে নির্বাচিত করে। তাই গম বা রাই জাতীয় খাদ্যশস্যে অভ্যস্ত হওয়ার সাথে সাথে এজাতীয় খাবারে যাদের সমস্যা বা এই সংশ্লিষ্ট জিনের বিলুপ্তি ঘটার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন সেটা হয়নি!

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্নিহিত। হিউম্যান লিউকসাইট এন্টিজেন (HLA) নামক একধরনের জিন আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসাবে রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেয় এবং প্রায়শই পরিবর্তিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন পরিবর্তন আনতে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত, গ্লুটেন প্রোটিনের একটা অংশ সিলিয়াক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হিউম্যান লিউকোসাইট এন্টিজেনের সাথে যুক্ত হয় ফলে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্ত্রের কোষকে আক্রমণ করে প্রদাহের সৃষ্টি করে। মানব সমাজ গম জাতীয় খাদ্যসশ্যে অভ্যস্ত হওয়ার শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত এই রোগের প্রাদুর্ভাব একই আছে, এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট জিনেরও কোন পরিবর্তন ঘটেনি। যেহেতু এই রোগের পেছনে একটি নির্দিষ্ট জিন দায়ী যা কিনা আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে তাই সময়ের সাথে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এই জিনের বিলুপ্তি হওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টোটা। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ১ শতাংশ মানুষ সিলিয়াক রোগে আক্রান্ত, কিছু জনগোষ্টিতে এটা বেড়ে প্রায় ৫ শতাংশে পৌছেছে।

ধারণা করা হয়, সিলিয়াক রোগের জন্য দায়ী জিন সম্ভবত আমাদের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য ছিল, অন্যদিকে সিলিয়াক রোগ সৃষ্টির জন্য শুধুমাত্র এই জিনের উপস্থিতি যথেষ্ট ছিলনা বরং উপযুক্ত প্রভাবকের প্রয়োজন (যেমন গম নির্ভর খাদ্যাভ্যাস)। তাই আমাদের বিবর্তনে এই জিনের ক্ষতিকর প্রভাবের চেয়ে উপযোগীতা সম্ভবত বেশী ছিল। যেমন গ্লিয়াডিন (গ্লুটেনের ক্ষতিকর অংশ) ইন্টারফেরন-গামা নিঃসরণকে প্রভাবিত করে ভাইরাস প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। আবার সিলিয়াক রোগের জন্য দায়ী HLA জিন দাতের ক্ষয় রোধ করে এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট জিন যেমন SH2B3 ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। সুতরাং, হকস বলেন, “এটা খাদ্যের জন্য নয় বরং খাদ্যাভ্যাসের সাথে অভিযোজন”। উদ্দেশ্যহীন দুটি পরষ্পরবিরোধী বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব বিবর্তনে সাধারণ ঘটনা। যেমন, লোহিত রক্ত কণিকার জিনগত পরিবর্তন ম্যালেরিয়া থেকে বাচতে মানুষকে সাহায্য করে এবং সেটাই আবার মরণঘাতি সিকেল সেল এনেমিয়া সৃষ্টি করে।

পুরোপুরি নিশ্চিত নাহলেও খাদ্যাভাসের মাধ্যমে উদ্ভূত মানব বিবর্তনের অন্য উদাহরণগুলোও বেশ চমৎকার। যেমন, এমাইলেজ নামক এক ধরণের এনজাইম স্টার্চ বা শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য হজমে আমাদের সহায়তা করে। ঐতিহাসিকভাবে, পশ্চিম ইউরেশিয়া এবং মেসোআমেরিকার কৃষকদের মধ্যে এসম্পর্কিত জিনের একাধিক কপি রয়েছে। তার মানে কি তারা স্টার্চ হজম করতে বেশী পারদর্শী? হকস বলেন, “এটা যৌক্তিক এবং সম্ভবত তাই ঘটেছে। তবে জীববিজ্ঞান বেশ প্যাচানো এবং বিবর্তনে চালিকা শক্তি হিসাবে এটি কিভাবে বা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সেটা এখনো আমরা জানিনা”।

আবার জাপানি, চীনা এবং কোরিয়ানসহ পূর্ব এশীয়দের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মধ্যে মদ্যপানের সাথে সম্পর্কিত একটা সমস্যা আছে। এলকোহলের বিপাকক্রিয়ায় অতিরিক্ত পরিমাণে বিষাক্ত এসিটাল্ডিহাইড তৈরি হয় যা তাদের শরীরে জ্বলুনি সৃষ্টি করে, মুখমন্ডল লালচে রঙ ধারণ করে এবং ফুস্ফুড়ি মত দেখা যায়। হকস উল্লেখ করেন, জিনতাত্ত্বিক গবেষনায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে এটি গত ২০,০০০ বছরে প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে ধান চাষাবাদের সাথে সাথে এই বৈশিষ্ট্য আমাদের জিনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিছু গবেষক ধারণা করেন, এটি সম্ভবত বেশী পরিমাণ ধানকে মদের রূপান্তরিত করা থেকে বিরত রেখেছিল যেটা দীর্ঘদিনের খাবারের জোগান দিয়েছিল। ধান চাষাবাদের সময় বা এই বিশেষ জিনগত পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সময়সীমা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া, এসিটালডিহাইড সম্ভবত পরজীবী থেকে আমাদের রক্ষা করেছিল কারণ ওইসব পরজীবী এই বিষ হজম করতে পারতোনা। যাহোক, হকস বলেন, “পূর্বে এটা এখনকার মত এত অধিক ছিলনা তবে তখনকার জনগোষ্ঠীর জন্য এটি কোন এক কারনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল”। “এটা অনেক বড় পরিবর্তন কিন্তু কেন হয়েছিল সেটা আমরা এখনো নিশ্চিত নই”।

বিভিন্ন গবেষণা থেকে ধারণা করা হয় যৌন নির্বাচনসহ অন্যান্য কারণগুলোর পাশাপাশি, খাদ্যাভ্যাসের প্রতিক্রিয়া হিসাবেও মানুষের ত্বকের রঙ কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। বর্তমান সময়ে মানুষের ত্বকের রঙের যে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায় সেটা তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে। অতীতের গবেষণায় দেখা গেছে, কোন একটা স্থানের মানুষের ত্বকের রঙ নিরক্ষরেখা থেকে ওই স্থানের দূরত্ব এবং অতিবেগুনী রশ্মির প্রাচুর্যতার সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত। সূর্যের আলোর প্রভাব যেহেতু নিরক্ষরেখা বরাবর সবচাইতে বেশি তাই ধারণা করা হয় নিরক্ষীয় অঞ্চলের প্রবল অতিবেগুনি রশ্মিই মূলত কালো রঙের ত্বকের জন্য দায়ী। সেকারণে মানুষের ত্বকের আদর্শিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ধরে নেয়া হয়, নিরক্ষীয় অক্ষাংশে ত্বকের কালচে প্রভাব সর্বোচ্চ হবে এবং নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর ও দক্ষিন গোলার্ধের দিকে দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে তা কমতে থাকবে। প্রশ্ন হলো কালচে ত্বকের সাথে অতিবেগুনী রশ্মির কি সম্পর্ক? আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন-ডি তৈরিতে অতিবেগুনী রশ্মি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অধিক পরিমাণ অতিবেগুনী রশ্মি আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর কারণ এটি ডিএনএ’র আনবিক গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারে ফলে ক্যান্সারসহ নানারকম সমস্যা দেখা দেয়। আমাদের ত্বকের রঙ কালচে হওয়ার জন্য দায়ী মেলানিন নামক একধরণের রঞ্জক পদার্থের আধিক্য যা কিনা অতিবেগুনী রশ্মিকে নিউট্রালাইজ করে শরীরে প্রবেশে বাধা দেয়। ফলে কালো চামড়ার মানুষরা ওইসব অঞ্চলে প্রাকৃতিক নির্বাচনে টিকে যায়।

উদাহরণস্বরূপ, আজ থেকে প্রায় ২ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে আমাদের প্রজাতির উদ্ভব হয়েছিল। ধারণা করা হয়, আজকের আফ্রিকানদের ন্যায় আমাদের পূর্বপুরুষরদের ত্বকও কৃষ্ণ বর্নের ছিল কারণ ওই অঞ্চলে কালো চামড়া বাড়তি সুবিধা দেয়। কিন্তু প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে, মানুষ যখন আফ্রিকা ছেড়ে ইউরোপের দিকে স্থানান্তরিত হয় কারন তখন তাদের ত্বকের সুরক্ষার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ফলে ত্বকের কালচে ভাবও কমতে শুরু করে যাতে কম সূর্যের আলোতেই শরীর অধিক পরিমাণ উপকারী ভিটামিন-ডি তৈরি করতে পারে। তবে মানুষের চামড়ার রঙের এই পরিবর্তন হুট করে হয়নি, বরং এটা হয়েছে অনেক পরে ধীরগতিতে। সম্প্রতি ২০১২ সালে, স্পেনের ইউনিভার্সিটি অফ বার্সেলোনার চার্লস লালুয়েজা ফক্স নামের এক বংশগিতিবিদ ৮০০০ বছরের পুরানো এক শিকারি পূর্বপুরুষের কঙ্কাল থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখেন তার চামড়া সাদা নয় বরং আফ্রিকানদের ন্যায় কালো ছিল। এছাড়া, আধুনিক ইউক্রেনীয়দের এবং তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের ডিএনএ’র তুলনা করে দেখা যায়, ইউরোপীয়দের ত্বকের রঙ গত ৫,০০০ বছর ধরে পরিবর্তিত হচ্ছে যেটা এখনো চলমান। এটা নির্দেশ করে সাদা চামড়ার প্রাকৃতিক নির্বাচন অপেক্ষাকৃত বেশ পরে হয়েছে। কিন্তু সাদা চামড়ার বিবর্তন কেন এত পরে হলো, যেখানে মানব প্রজাতি আফ্রিকা ছেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে!? অন্য একটি তত্ত্ব দিয়ে এটাকে ব্যাখ্যা করা যায়। সম্ভবত ত্বকের রঙ সাদা হওয়ার পেছনে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কারণ হিসাবে দেখা যায়, তাদের শিকারী পূর্বপুরুষরা মাছ ও বিভিন্ন প্রাণীর যকৃত থেকে অধিক পরিমান ভিটামিন ডি পেতো ফলে সূর্যের আলোর অতিবেগুনী রশ্মির প্রয়োজন হতোনা। পরবর্তীতে যখন তারা কৃষি নির্ভর হয়ে পড়ে, ফলে গম ও যব জাতীয় খাদ্যশস্য হয়ে যায় তাদের প্রাধান খাদ্য, যেকারণে তাদের শরীরে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি এর প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়। এইক্ষেত্রে তুলনামূলক কম মেলানিন থাকা ত্বক (অপেক্ষাকৃত সাদা চামড়া) সম্ভবত তাদের বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল এবং এভাবেই সাদা চামড়ার মানুষরা প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত হয়।

পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্বকের রঙের গবেষক নিনা জাবলোনস্কি বিজ্ঞান সাময়িকীকে বলেছিলেন যে, নতুন গবেষণায় অধিকতর কৃষি নির্ভর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ায় খাদ্যজাত ভিটামিন-ডি এর পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে যেটা সাদা চামড়ার বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। চোখের সামনে বিবর্তন ঘটতে দেখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু জিনোম সিকুয়েন্সিং এর মত নব্যপ্রযুক্তি এবং বিপুল পরিমাণ ডাটা নিয়ে কাজ করার মত শক্তিশালি কম্পিউটারের বদৌলতে অতিসামান্য ডিএনএ’র পরিবর্তনও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে যেটা বহু জেনারেশনে জমা হয়ে বিবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ক্রমবর্ধমান জিনগত তথ্যের ডাটাবেস ও অন্যান্য তথ্য যেমন চিকিৎসার ইতিহাস ও পরিবেশগত উপাদান যেমন খাদ্যাভ্যাস এর সমন্বয় করে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নির্নয় করা সম্ভব। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী হখমণেশ মোস্তফাভি একটি জিনোম গবেষণাপত্র লেখেন, যেখানে কেবল এক বা দুই প্রজন্মের বিস্তৃতিতে আমাদের বিবর্তন কিভাবে ঘটে সেটা দেখার জন্য ২১৫,০০০ জনের ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়। মোস্তফাভী বলেন, “অবশ্যই বর্তমানে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে, এর বিবর্তনীয় প্রভাব কি হবে কে জানে”। “প্রাকৃতিক নির্বাচনে এর সরাসরি প্রভাব না থাকলেও, কোনো বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন জিনগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে”।

মোস্তফাবির জিন গবেষণায় আরও কিছু জিনের ভ্যারিয়ান্ট পাওয়া গেছে যেগুলো মানুষের জীবনকাল কমিয়ে দেয়। যেমন, ৭০ বছরের বেশী বয়স্ক মহিলাদের মধ্যে আলঝেইমার সম্পর্কিত জিনের একটি ভ্যারিয়েন্ট (পরিবর্তিত ApoE4 জিন) কম দেখা গেছে কারণ পূর্ববর্তী গবেষনায় দেখা গেছে এই ভ্যারিয়ান্ট যাদের আছে তারা ৭০ বছর বয়স হওয়ার আগেই মারা যায়। আবার ধূমপায়ীদের স্বাভাবিক মাত্রা থেকে বেশী মাত্রায় ধুমপানের সাথে জড়িত একটি জিন ভ্যারিয়েন্ট (পরিবর্তিত CHRNA3 জিন) মধ্যবয়স থেকে বেশী বয়স্ক মানুষে আস্তে আস্তে কম লক্ষ্য করা যায় কারণ এই জিনের উপস্থিতি দীর্ঘদিন বেচে থাকার সম্ভবনা কমিয়ে দেয়, সুতরাং যাদের এই জিন নেই তাদের বেশী বয়সে উপনীত হওয়ার সম্ভবনা বেশী, ফলে তারা সফল প্রজননের মাধ্যমে সন্তান এমনকি নাতিপুতিদের বেচে থাকায়ও প্রভাব রাখবে। এইসব জিন ভ্যারিয়ান্টগুলো এখনো প্রাকৃতিক নির্বাচন হচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “আজ আমরা মানুষের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে এইসব জিনের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখতে পাই”। “এবং আপনি হয়তো ভাবতে পারেন খাদ্যাভ্যাসেরও একই ধরণের প্রভাব থাকতে পারে। আমাদের উদাহরণস্বরূপ ফাস্টফুডের মতো প্রচুর সাম্প্রতিক আমাদের খ্যাদ্যাভাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে যেমন ফাস্ট ফুড এবং এসব খাবারের কোন প্রভাব আছে কিনা সেটা আমরা এখনো জানিনা”।

সৌভাগ্যক্রমে, মোস্তফাবি এবং হক্সের মতো বিজ্ঞানীদের গবেষণার কল্যানে এটা জানতে হয়তো ২০,০০০ বছর অপেক্ষা করতে হবেনা এবং সেজন্য তাদেরকে সাধুবাদ।

সূত্রঃ
১। https://www.smithsonianmag.com/science-nature/how-cheese-wheat-and-alcohol-shaped-human-evolution-180968455/#Lgpk7ixyp3gR98MR.99
২। http://pubs.sciepub.com/ijcd/5/3/3/index.html
৩। https://www.sciencemag.org/news/2014/03/new-diet-sexual-attraction-may-have-spurred-europeans-lighter-skin

ছবিঃ স্মিথসোনিয়ান সাময়িকী

অনুবাদ - জুলকার নাইন।
জৈবপ্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য

সজীব ওসমান এর ছবি

আপনার অনুবাদটা বেশ চমৎকার হয়েছে। পরবর্তী কাজের জন্য আমার পরামর্শ রইলো বারবার একই শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলা প্রতিশব্দটা ব্যবহার করবেন। যেমন, এই লেখায় সব জায়গায় উৎসেচক যদি ব্যবহার করতেন এনজাইমের জায়গায় তবে ভালো লাগতো।

লেখা চালিয়ে যান। আরও অনুবাদ করুন! শুভকামনা।

জুলকার নাইন এর ছবি

ধন্যবাদ ভাই। ভাই প্রথমে সেটাই করেছিলাম, পরে মনে হলো উৎসেচক থেকে এনজাইম শব্দটা হয়তো সবার কাছে বেশি পরিচিত সেজন্য ওটাই দিছিলাম সবজায়গায় । পরবর্তীতে বাংলাটাই রাখার চেস্টা করবো। ভালো থাকবেন ভাই।

হিমু এর ছবি

বাংলা শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করি না বলেই অনেকের কাছে অপরিচিত। পরিচিত করে তোলার একটাই উপায়, সেগুলো ব্যবহার করা। প্রথমবার পড়লে অনেক কিছুই খটকা লাগে, দশমবার গিয়ে হয়তো সেটাই স্বাভাবিক মনে হয়।

আপনার করা অনুবাদ ভালো হয়েছে। আরো লিখুন।

জুলকার নাইন  এর ছবি

ধন্যবাদ ভাই। বিজ্ঞান অনুবাদ এটা
ই প্রথম। পরবর্তীতে অবশ্যই লিখবো।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

জুলকার নাইন,
বিষয়বস্তু তো অবশ্যই চমৎকার, অনুবাদও সুন্দুর হয়েছে। একটা বিশয়ে খটকা লাগছে, হোমো স্যাপিয়েন্সরা আফ্রিকা থেকে বের হয়ে এসেছে চল্লিশ হাজার বছর আগে? নাকি আরও আগে, যেমন ৬০-৮০ হাজার বছর আগে?

জুলকার নাইন  এর ছবি

হ্যা, আপনি ঠিক ধরেছেন। সেটা হলো, পূর্ব আফ্রিকা থেকে হোমো সেপিয়েন্সরা ৭০-৫০ হাজার বছর আগে দক্ষিন এশিয়া থেকে ওশেনিয়ার দিকে বিস্তার ঘটিয়েছিল। কিন্তু আফ্রিকা থেকে মানব প্রজাতির ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ার সূচনা হয়েছিল ৪০,০০০ বছর আগে, এখানে ইউরোপের আদিম মানুষের কঙ্কালের ডিএনএ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো সেজন্য ওটা উল্লেখ করা হয়নি। এডিট করে ঠিক করে দিবো সুযোগ থাকলে। ধন্যবাদ ভাই।

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ তথ্যগুলো শেয়ার করার জন্য। বিষয়বস্তু ভালো লেগেছে।

--আমিননোমান

হাসিব এর ছবি

ভাতখেকোদের নিয়ে এরকম গবেষণা আছে?

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

ভাই আপনার ফ্যান হয়ে গেলাম। আরো লেখা দেন তাড়াতাড়ি।

তারেক অণু এর ছবি

গুল্লি দারুণ লাগলো, পরের পর্বের অপেক্ষায়

সোহেল ইমাম এর ছবি

চমৎকার লেখা। আরো আসুক। চলুক

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সৌখিন  এর ছবি

চমকপ্রদ তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। আরও চাই,লেখনী চলুক।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। পড়তে পড়তে হারারির স্যাপিয়েন্সের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। এই বিষয়ে আকর্ষণীয় লেখা কঠিন একটা কাজ। সেই কাজটা সফলতার সাথে করতে পেরেছেন। এমন বৈচিত্রপূর্ণ লেখা আরো আসুক।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।