দ্য অ্যালকেমিস্ট/ অণুকাহিনী ৯

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ০১/০৫/২০২২ - ১০:৫৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মাক্তুব, ভাবল ও।

“আরে কী হলোটা কী, জিজ্ঞেস করো!” ইংরেজের কথায় সম্বিত ফিরে পেল সান্টিয়াগো।

মেয়েটির কাছাকাছি গেল ও। ইতস্তত করে একটু হাসল।
“আপনার নামটা জানতে পারি কি?”

“ফাতিমা,” চোখের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে নিতে বলল মেয়েটি।

“ও আচ্ছা... আমাদের দেশের মেয়েদেরও এই নাম হয়।”

“আমাদের নবীজির মেয়ের নাম ছিল এটা,” বলল মেয়েটি। “দখলদাররা সবখানেই এই নাম বয়ে নিয়ে গেছে।” দখলদারদের কথা বলার সময় সুন্দরী ফাতিমা যেন একটু গর্বিত হয়ে উঠল।

“আরে কী হলো কী আজব তো, জিজ্ঞেস করো,” ইংরেজ চেঁচিয়েই যাচ্ছে।

সান্টিয়াগো এবার একটু দম নিয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো এখানকার লোকজনের অসুখ বিসুখ সারায় এমন কোনো লোক আছে কি না।

“আছে তো, একজন আছে এখানে, দুনিয়ার সব জানে লোকটা!” বলল ফাতিমা। “মরুভূমির জ্বিনদের সাথেও লোকটার কথা হয়, জ্বিনদের মধ্যে ভালো জ্বিন আছে খারাপ জ্বিন আছে।”

দক্ষিণ দিকে হাত তুলে ফাতিমা দেখালো আজব ঐ লোকটা নাকি ওইদিকে থাকে। তারপর কলসি ভরে নিয়ে চলে গেল।
ফাতিমার বলাও সারা ইংরেজের দৌড়ও সারা। সেই দক্ষিণদিক ধরে ভোঁ দৌড় লাগালো ইংরেজ। মুহূর্তেই উধাও।

অনেকক্ষণ ধরে আচ্ছন্ন হয়ে কূপের পাশে বসেই থাকল সান্টিয়াগো। এ কী করে হয়! মনে পড়লো, সেই দিনের কথা। যেদিন তারিফায় শহরের বড় প্রাসাদটার চূড়ায় বসেছিল, সেইদিনটার কথা। লেভান্টার বাতাসের তীব্র ঝাপটা এসে লাগছিল ওর মুখে, সেদিন লেভান্টারের ঝাপটায় ওর মুর জাতির কথা মনে হয়েছিল। মনে পড়লো, সেদিন সেই ভাবনার সময় মনে মনে একটা মিষ্টি সুগন্ধও টের পেয়েছিল ও। সেটাকে অবচেতনে মনে হয়েছিল উষর মরু আর ঘোমটাবৃতা মেয়েদের সুবাস। অথচ এখন চকিতে মনে হলো সেটা ছিল ফাতিমারই সুবাস। তা কী করে হয়! তবে কি এমন কেউ থাকে যাকে চেনাজানার আগেই ভালোবেসে ফেলা যায়! মনে হচ্ছে ফাতিমার জন্য এই যে তীব্র আকর্ষন এটা যদি ভালবাসা হয় তবে শুধু এই ভালোবাসার জোরেই ও পৃথিবীর সব ধনদৌলত খুঁজে বার করতে পারবে।

পরদিন, কূপের ধারে ফিরে আসলো সান্টিয়াগো, ফাতিমার সাথে যদি আবার দেখা হয়! অবাক ব্যাপার, ইংরেজও বসে আছে, ধু ধু মরুর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

“বুঝলে হে, সারা দুপুর, সারা সন্ধ্যা অ্যালকেমিস্টের অপেক্ষায় থাকলাম,“ ওকে দেখে শুরু করল ইংরেজ। “সন্ধ্যা তারারা ওঠা মাত্রই ওনার দেখা মিলল। আমি বললাম ওনাকে আমার কথা, সব ইতিহাস বললাম, কিসের সন্ধানে ঘুরে মরছি সবই জানালাম। উনি জিজ্ঞেস করলেন আমি কখনো সীসা থেকে সোনা বানিয়েছি কিনা। বললাম, ওমা, ও কী কথা! ওটা শিখতেই তো আসা। সে কী বলল জানো? বলল, সেটা নাকি আমার নিজেকেই চেষ্টা করে দেখতে হবে। 'যাও, চেষ্টা করো' এই... এই বলেই বিদায় করল আমাকে।”

সান্টিয়াগো চুপ করে আছে। বেচারা ইংরেজ অ্যালকেমিস্টের খোঁজে এতোদূর রাস্তা আসলো, শেষকালে এসে এই কথা শুনতে হলো!

“তাহলে সেটা করলেইতো হয়... একবার নিজে নিজেই চেষ্টা করে দেখেন হতেও তো পারে” বলল সান্টিয়াগো।

“হ্যাঁ হ্যাঁ করব, সেটাই করব। এখনই কাজ শুরু করে দেবো।”

ইংরেজ যেতে যেতেই ফাতিমা আসল, কলসিতে পানি ভরল।

ক্ষণিকের পরিচয় তবু একদম সরাসরি কথাটা বলল সান্টিয়াগো “আমি শুধু তোমাকে একটা কথাই বলতে এসেছি আজকে, ভালোবাসি তোমাকে। আমি চাই তুমি আমার বৌ হও।”

দড়াম করে ফাতিমার হাতের পানি সুদ্ধ কলস মাটিতে পড়ে গেল।

“প্রতিদিন এখানে তোমার অপেক্ষায় থাকব। তুমি জানো আমি কেন পথে বেরিয়েছিলাম? আমি একটা স্বপ্ন দেখতাম, বারবার দেখতাম, পিরামিডের কাছাকাছি নাকি কোনো এক জায়গায় কী সব গুপ্তধন আছে। সেই গুপ্তধনের খোঁজে বেরিয়ে মরুভূমি পার হয়েছি...মরুভূমির যুদ্ধ, রাস্তা বদল, তারপর এখানে এসে হাজির হওয়া। এইসবে শাপ শাপান্ত করেছি কত, এখন মনে হচ্ছে শাপে বর হয়েছে, ওই যুদ্ধের জন্যই তোমার কাছে আসতে পারলাম।”

“তো সেই যুদ্ধও তো কোনো না কোনোদিন শেষ হবে, তখন আপনার গুপ্তধনের কথা যদি আবার মনে পড়ে?” বলল ফাতিমা।

আশপাশে খেজুর গাছগুলোর দিকে সান্টিয়াগো কতক্ষণ চোখ বুলালো। মনে পড়লো, আগে সে তো একটা রাখালই ছিল, তাহলে আর কী সমস্যা। এখানেই থেকে যাবে, আবার রাখাল হবে। পৃথিবী উল্টে যাক, যা ইচ্ছা তাই হোক, গুপ্তধনের চেয়েও ফাতিমা বড়।

ফাতিমা যেন ওর মনের কথাই বুঝতে ,পারলো। বলল, “শোন, গুপ্তধন খোঁজা নতুন কিছু না, আমাদের গোষ্ঠীর লোকেরাও সব সময় গুপ্তধনই খুঁজে বেড়ায়,” বলল “আর মরুকন্যারা সেজন্যই ওদের পুরুষদের নিয়ে গর্ব করে।”

বলে, কলসি ভরে নিয়ে চলে গেল ফাতিমা।

এই টুকরো আলাপের ফল যেটা হলো, রোজ ফাতিমার সাথে দেখা করার জন্য সান্টিয়াগো এখন কূপের ধারে যায়। কথা কি আর শেষ হয়! রাখাল জীবনের গল্প, বুড়ো রাজার কথা, স্ফটিকের দোকানের কথা, আরবি ভাষা শেখার কথা, কত কথা বলল ওকে সান্টিয়াগো। ওরা এখন বন্ধুর মত, কত কথা, কথা যেন শেষই হয় না, কোথায় ছিল এতসব কথা এতকাল! দিনে শুধু মিনিট পনেরর মত ফাতিমার সাথে কথা হয়, ওইটুকু সময় বাদে দিনের বাকী সময় যেন আর কাটেনা।

দেখতে দেখতে মরুদ্যানে থাকার প্রায় একমাস হয়ে এলো।

এর মধ্যে একদিন ওদের কাফেলার সর্দার লোকটা দলের সবাইকে ডেকে পাঠালো।

“শোনেন ভাইসব, আমরা আপাতত রওনা হইতে পারতেছিনা। কেউই জানে না যুদ্ধ কবে শেষ হবে...,” বলল সে। “অনেকদিন চলতে পারে এই যুদ্ধ, এমনকি বছরের পর বছর। দুই দিকেই বড় বড় শক্তি, দুই দলের কাছেই যুদ্ধটা জরুরি। আসলে এইটা খারাপের সাথে ভালোর যুদ্ধ না। এই যুদ্ধ ক্ষমতার সমান সমানের যুদ্ধ, আর যখন এমন যুদ্ধ হয় তখন সেইটা আর সব যুদ্ধের চাইতেও লম্বা সময় নিয়া হইতে থাকে- কারণ আল্লাহপাক দুই পাশেই থাকেন।”

দলের লোকেরা সমাবেশ শেষে যে যার আস্তানায় ফিরে গেল।

বিকেলে সান্টিয়াগো গেল ফাতিমার সাথে দেখা করতে। সকালের কথা জানাল ওকে।

“আচ্ছা শোন, যেদিন আমাদের দেখা হলো তার পরদিন, মনে আছে?” বলল ফাতিমা, “তুমি বলেছিলে, ভালোবাসো আমাকে। তারপর, তোমার ওই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভাষার ব্যাপারটা শিখিয়েছো, পৃথিবীর অন্তরাত্মার কথা মাথায় ঢুকিয়েছ ... তাহলে তো হয়েই গেল, ওইসব ওইসব কারনে এখন আমিও তোমার একটা অংশ হয়ে গেছি।”

সান্টিয়াগোর কানে ফাতিমার সেই কথা মরুদ্যানের খেজুর পাতার ঝিরিঝিরি বাতাসের চেয়েও মধুর মনে হলো।

“এই মরুদ্যানে যে কতদিন ধরে আমি কী এক অধীর অপেক্ষায় বসে আছি। অতীত ভুলে গেছি, আচার- প্রথা ভুলেছি, মরুভূমির পুরুষরা এখানকার মেয়েদের যেভাবে চলাফেরা করতে বলে, সব ভুলেছি। স্বপ্ন দেখেছি, সেই ছোট্টবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখেছি যে এই মরুভূমি আমাকে একদিন চমৎকার কোনো একটা উপহার দেবে। আমার সেই উপহার এবেলা এসে পড়েছে, তুমিই সেই উপহার।”

সান্টিয়াগো চাইছিল ফাতিমার হাতটা ধরতে। কিন্তু ওর হাতদুটো কলসের হাতলে সেঁটে আছে।

“তুমি তোমার স্বপ্নের কথা বলেছ, বুড়ো রাজা, গুপ্তধন, দৈবইশারার কথা বলেছ। এখন আমি বুঝতে পারি এসব। এখন আমার আর কোনো ভয় নেই। ওইসব দৈবইশারাই তো তোমাকে আমার কাছে এনে দিয়েছে। এখন আমি তোমার স্বপ্নের একটা অংশ, যেটাকে তুমি বল জীবনখাতার গল্প, আমি সেই গল্পেরই অংশ।” আরও বলল, “সেজন্যই আমি চাই তুমি তোমার লক্ষ্য ঠিক রাখো, আমার মত হলো… তুমি স্বপ্নের কথা যাতে ভুলে না যাও সেই চেষ্টা কর। যদি যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় করো। কিন্তু তার আগেই যদি চলে যেতে হয় সেটাতেও আমার সমস্যা নেই, আমি যাকে ভালোবাসি আমি চাই তার স্বপ্নও সত্যি হোক। মরুভূমির বালিয়াড়ি বাতাসে বদলে যায়, মরুভূমি কিন্তু কখনও বদলায়না। ঠিক দেখো, এই মরুভূমির মতই আমাদের ভালোবাসাটাও কখনও বদলাবে না। “মাক্তুব,” বলল ফাতিমা। “আর আমি যদি সত্যিই তোমার স্বপ্নের অংশ হয়ে থাকি তাহলে একদিন না একদিন তুমি ফিরে আসবেই।”

ফাতিমার সাথে এসব কথাবার্তার পর সান্টিয়াগোর মনটা বিষণ্ণ হয়ে থাকল। আরসব রাখাল, মানে যেইসব বিবাহিত রাখালদেরকে ও চিনত, ও বেচারাদের কথা মনে পড়ল। পশুপাল নিয়ে রাখালদের কত দূর-দূরান্তের মাঠে যেতে হতো। কিন্তু বিয়েকরা রাখালদের বৌদেরকে রাজি করাতে সে কী কষ্ট। ভালোবাসার মানুষের মন রাখতে ও বেচারা রাখালরা আর দূরে যেতে পারতো না, ওখানেই আটকে থাকতো। দূর থেকে দূরান্তে আর যাওয়া হয়নি ওদের কোনদিনই।

পরেরদিন সকালে যখন দেখা হলো ফাতিমাকে বলল সেকথাও।

ফাতিমা হেসে বলল, “মরুভূমি আমাদের পুরুষদের আমাদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়, আর ওরা যে সবসময় ফিরে আসে তাও কিন্তু না। সেটা আমরা জানি, কিন্তু আমরা ওটাতেই অভ্যস্ত। যারা আর ফিরে আসেনা, ওরা কী হয় বলতো? ওরা… মেঘের অংশ হয়ে যায়, ওরা গিরিখাতে লুকিয়ে থাকা প্রাণীদের অংশ হয়ে যায়, মাটির বুক চিরে যে জল বেরোয়, আমাদের ফিরে না আসা পুরুষেরা সেই জলেরও অংশ হয়ে যায়। ওরা সবকিছুর মধ্যে মিশে যায়... ওরা এই পৃথিবীর অন্তরাত্মায় মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়।
“কেউ কেউ ফিরে আসে। যারা আর ফিরে আসেনা তাদের বউয়েরাও কিন্তু খুব গর্ব করে, খুশি খুশি থাকে, শুধু বুকে বিশ্বাস নিয়ে থাকে যে একদিন ওদের পুরুষেরাও হয়তো ফিরবে। আমি ওদের দেখতাম, ওদের সেই খুশি দেখে আমার হিংসে হতো। এখন আমিও ওদের মত হব, অপেক্ষায় থাকব...
“আমি মরুকন্যা, ওতেই আমার গর্ব। আমি চাই আমার স্বামী ঘুরে বেড়াক, যে বাতাস মরুর বালিয়াড়ি কে ভাঙ্গে...গড়ে, আমার মানুষ সেই বাতাসের মত মুক্ত স্বাধীন হয়ে ঘুরে বেড়াক। যদি আর নাও ফেরো সেটাও মেনে নেব, ভেবে নেব তুমি মেঘদলে মিশে আছো, হয়ত আছো গিরিখাতের জীবজন্তু পাখপাখালির মধ্যে, হয়ত জলের সাথে মাটির সাথে মিশে আছো।”

সান্টিয়াগো ইংরেজকে খুঁজতে গেল। কাউকে কিছু বলার জন্য মন আনচান করছে। ফাতিমা নামক অত্যন্ত সুখের শান্তির একটা ব্যাপার ওর জীবনে আসলো এটা ইংরেজকে জানাতেই হবে। তারওপর মনে অনেক প্রশ্নের জট, অনেক ব্যাপার ঘটে চলেছে। ইংরেজের সাথে কথা বলা দরকার।

ইংরেজের ওখানে গিয়ে সান্টিয়াগো অবাক, দেখে লোকটা তাঁবুর সামনে হাপরের মত একটা মস্ত চুল্লি বানিয়ে বসেছে! অদ্ভুত রকমের একটা চুল্লি, কাঠ দিয়ে জ্বলছে, উপরে একটা স্বচ্ছ কাচকুপীতে কী যেন গরম হচ্ছে। কোথায় সেই বই পড়া ইংরেজ আর কোথায় এই মরুভূমির ইংরেজ। যখন বসে বসে শুধু বই পড়ত তখনকার চেয়ে মনে হচ্ছে এখন লোকটার চোখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তপ্ত বালির দিকে বেশি বেশি তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কি এমন অবস্থা হলো নাকি!

“এটা প্রাথমিক ধাপ,” ওকে দেখে বলল ইংরেজ। “সালফার কে আগে আলাদা করে নিতে হবে। আর সেটা ঠিক মত করতে হলে, হবেনা হলোনা কী হবে কী হবে এসব ভয় থাকা যাবে না। এতদিন ধরে শুধু ভয় পেতাম, কিভাবে হবে যদি না হয় এইসব চিন্তাভাবনা করতে করতে আমার জীবনের এই শ্রেষ্ঠ কাজ শুরুই করিনি। যে কাজ দশ বছর আগেই শুরু করতে পারতাম, সেটা ঘুরেউল্টে এখন শুরু করতে হচ্ছে। কি আর করা, যাক, বিশ বছর তো আর দেরি হয়নি।”

ইংরেজ আগুন কাঠ দিয়ে দিয়ে জিইয়ে রাখছে।

পড়ন্ত বেলা।

সূর্যের ডুবন্ত ছটায় গোলাপি মরুদিগন্ত। আরও কিছুক্ষণ ওখানেই থাকল সান্টিয়াগো। ইংরেজের সাথে যে বিষয়ে কথা বলতে এসেছিল, হলো না।

মরুর দিকটায় একবার যেতে পারলে ভালো হতো, নিরিবিলিতে ওদিকটায় কিছুক্ষণ থাকলে যদি মনের মধ্যে পাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব মেলে।

কতক্ষণ এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াল ও। চোখের সামনে খেজুর গাছের সারি। বাতাসের ঝরোঝরো শব্দ, এমন সময় পায়ের নিচে কিছু একটা পাথরের মত বাধল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে এখানে সেখানে আশেপাশে অনেক ঝিনুকের খোলা। ইশ। অনেক অনেককাল আগে কোন প্রাগৈতিহাসিক সুদূর সময়ের কথা, এই মরুভুমিই একদিন সমুদ্র ছিল!

একটা পাথরের উপর বসে দিগন্তের দিকে সম্মোহিতের মত তাকিয়ে থাকল সান্টিয়াগো। সেই কখন থেকে মনটা উচাটন হয়ে আছে। ফাতিমা তখন কীসব বলল তাই ভাবছে; আমি চাই আমার মানুষ মরুর বাতাসের মত মুক্ত স্বাধীন হয়ে ঘুরে বেড়াক! এ কেমন ভালোবাসা, কোনও কূল-কিনারা পাচ্ছে না সান্টিয়াগো। ভালোবাসা যেখানে থাকবে সেখানেতো দাবীদাওয়ার জোর থাকবে অধিকার থাকবে, অধিকারকে কী করে ভালোবাসা থেকে সরিয়ে রাখা যায়! মাথাটা হাপছাড়া হয়ে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। হে মরুকন্যা ফাতিমা, তোমার দখলহীন অধিকারহীন ভালোবাসার মনস্তত্ব বোঝা বড় কঠিন। সেই তত্ত্ব বুঝতে আমাকে যদি কেউ সাহায্য করেও সেটা এই মরুভূমিই।

বসে বসে এইসব সাতপাঁচ ভাবছে ও। এমন সময় চোখের কিনার দিয়ে দূরে ...ওপরে কিছুর নড়াচড়া খেয়াল করল। তাকিয়ে দেখে এক জোড়া বাজ পাখি আকাশের উঁচুতে উড়ে বেড়াচ্ছে।
পাখিগুলোর দিকে ও তাকিয়ে রইল, ওরা বাতাসের টান বুঝে উড়ছে। এমন আহামরি কোনো কারুকাজ নেই সেই ওড়াউড়িতে তবুও ওর মনে হলো কী যেন একটা আছে কী যেন একটা আছে, সেটা কী বুঝতে পারছে না ও। একদৃষ্টে তাকিয়েই থাকল। কে জানে ওই মরুপাখিগুলোর থেকেও যদি ও স্বত্বহীন ভালোবাসার ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত পায়।

ঘুম ঘুম লাগছে। ঘুমাতেও চাচ্ছে আবার মনে প্রাণে জেগেও থাকতে ইচ্ছে করছে।

“পৃথবীর ভাষা বোঝার চেষ্টা করছি, সবকিছুই এখন বোধগম্য হচ্ছে... এমনকি বাজপাখির ওড়াউড়িও,” আনমনেই হাসতে হাসতে বলল ও। প্রেমের সুমহান আবিষ্টতা এই মুহূর্তে সান্টিয়াগোকে আচ্ছন্ন করে আছে। জীবনে ভালোবাসা আসলে অনেক ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে ধরা দেয়, ভাবল সে।

(চলবে)

পাওলো কোয়েলো

অনুবাদ- জে এফ নুশান

অণুকাহিনী ৮
অণুকাহিনী ৭
অণুকাহিনী ৫ ও ৬
অণুকাহিনী ৪
অণুকাহিনী ৩
অণুকাহিনী ২
অণুকাহিনী ১


মন্তব্য

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।