মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ৩। দ্রৌপদী। পর্ব ২

মাহবুব লীলেন এর ছবি
লিখেছেন মাহবুব লীলেন (তারিখ: রবি, ১০/০২/২০১৩ - ১১:৫৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

তোমার লাইগাই ভীমের আইজ না খাইয়া থাকতে হয়; এইটা তুমি বোঝো? তোমার মায় যেমন ফকিন্নি আছিল তেমনি তুমিও তো আছিলা ফকির। কিন্তু আমারে তো নিয়া আসছ রাজবাড়ি থেকে। সেই তোমার লাইগা পাঞ্চাল রাজের মাইয়া আজ বনবাসী; এইটা তুমি বোঝো? তুমি নাকি ধর্ম বোঝো খুব? তয় জুয়া খেলার সময় তোমার ধর্মবুদ্ধি আছিল কই?

কৃষ্ণ চলে যাবার পর পাণ্ডবেরা চইলা আসে দ্বৈতবনে সরস্বতী নদীর কাছে। এর মধ্যে দ্রৌপদী কিছুটা সামলাইয়াও নিছে। কিন্তু অন্যদের লগে স্বাভাবিক হইলেও যুধিষ্ঠিররে এখনো সহ্য হয় না তার- তুমি কোন মুখে নিজেরে ক্ষত্রিয় পরিচয় দেও? নকল ব্রাহ্মণের পোশাক পইরা দুয়ারে দুয়ারে গিয়া তোমার ভিক্ষা করাই ভালো। তাতে বাকিরা মুক্তিও যেমন পায় তেমনি ভীম গিয়া রাজ্যটাও উদ্ধার করতে পারে...
যুধিষ্ঠির যুক্তি বাদ দিয়া কয়- সকলই কপাল বিবি...

ভীম দ্রৌপদীরে থামাইতে এসে উল্টা নিজেই খেপে উঠে যুধিষ্ঠিরের উপর- বালছাল বুঝাইতে আসবা না তুমি। কপাল আর ধর্ম কপচাইয়া তুমি একটা হিজড়া হইছ। তোমার ধর্মব্যাখ্যায় খালি শত্রুদেরই লাভ। ওইটা ধর্ম না; ওইটা হইল নপুংসকের কুযুক্তি। ...তোমার তেরো বছর টছর আমি বুঝি না। তেরো বছর পরে বাঁচব কি মরব তার কী নিশ্চয়তা? আর বাঁচলেও বাঁচতে হইব বুড়া হাবড়া হইয়া লাঠি ভর দিয়া। এই কয়দিনেই দিনেই যথেষ্ট হইছে। যা করা লাগে আমি একলাই করব। তোমার কিছু করা লাগব না। এখন চলো হস্তিনাপুর...

যুধিষ্ঠির ভীমরে বুঝাইতে চায় যে রাজসূয় যজ্ঞের সময় জোর কইরা যাদের কাছ থেকে কর আনছিলাম তারা সবাই এখন দুর্যোধনের পক্ষে। বিষয়টা ভীম যত সোজা মনে করে তত সোজা না। কিন্তু ভীম তা মানতে নারাজ- সোজা হউক আর ব্যাকা হউক। যা করা লাগে আমিই কৃষ্ণের লগে মিলা করমু...

যুধিষ্ঠির এইবার গম্ভীর হইয়া যায়- হস্তিনাপুরের রাজসভায় তুমি যখন আমারে মারতে গেছিলা; তখন মাইরা ফালাইলেই ভালো করতা। তা হইলে এখন বড়োভাই হিসাবে পাণ্ডবগো সিদ্ধান্ত তুমিই নিতে পারতা। কিন্তু যখন তা করো নাই তখন আমারে না মাইরা তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারো না...

ভীম শান্ত হয় না। মাটিতে একটা লাত্থি দিয়া আবার গিয়া যুধিষ্ঠিররে জিগায়- আইচ্ছা। ধইরা নিলাম বারো বছর বনবাস আর এক বছর অজ্ঞাতবাসের পর তোমার ধর্মসম্মত উপায়ে আমরা রাজ্য ফিরা পামু। কিন্তু এমন কি নিশ্চয়তা আছে যে তুমি আবার জুয়ার দানে সব ভাসাইয়া দিবা না? পাশা খেলার কথা শুনলে তো তোমার আবার হুশ বুদ্ধি থাকে না; কিন্তু খেলতে বসলে খেলো আমার ধোনটা...

ভীম পারলে আইজই হস্তিনাপুর গিয়া দুর্যোধনের লগে মারামারি করে। যুধিষ্ঠির যতই বোঝায় যে এইসব আলোচনা ঠিক না। বনবাসেও দুর্যোধনের চর আছে। কিন্তু ভীম রাগে গাছের ডালডুল ভাইঙা রাগ সামলাইয়া আবার ফিরা আসে যুধিষ্ঠিরের কাছে- আইচ্ছা; পণ্ডিতরা তো কয় পুঁইশাকের বীজ হইল পুঁইশাকের প্রতীক। সেই হিসাবে মাসও তো বছরের প্রতীক। ...আমরা বনে আছি তেরো মাস হইল; তো একটা যুক্তি দিয়া তেরো মাসরে তেরো বছরের প্রতীক বানাইয়া এখন আমরা ফিরা যাইতে পারি না?
যুধিষ্ঠির কয়- না; তাতে পাপ হয়
- ধুত্তুরি তোমার বালের পাপ। পাপ ধুইয়া ফেলার লাইগা না কত কী ভগিচগি আছে? পাপ করার পর সেইরকম একটা কিছু করলেই তো হয়। এইরকম ছোটখাট পাপের প্রায়শ্চিত্তের লাইগা একটা বলদরে ঘাস খাওয়াইয়া খুশি করলেই তো যথেষ্ট। ... চলো যাই। গিয়া কই তেরো মাসেই আমাগো তেরো বচ্ছর পূর্ণ হইছে...

যুধিষ্ঠির এইবার খেইপা উঠে- ছাগিবাচ্চার লাহান ফালাফালি বন্ধ করো। গেলে তো যাওয়াই যায়। কিন্তু দুর্যোধন পর্যন্ত পেঁছাইতে হইলে যে তোমার কর্ণের সামনে পড়া লাগব সেইটা খেয়াল আছে? তোমারে নাকি কেউ মাকুন্দা কইয়া গালি দিলে তুমি তারে মাইরা ফালাও? কই? কর্ণ তো তোমারে ট্যারা পেটুক মাকুন্দা ছাড়া আর কোনো নামে কোনোদিনও ডাকে না? কই একদিনও তো কর্ণের একটা বাল ছিঁড়তেও দেখলাম না তোমারে...

ভীম ধুম ধুম কইরা মাটিতে লাথি মারতে থাকে। এইটা তার সবচে দুর্বল জায়গা; তার ট্যারা চোখ আর দাড়িগোফবিহীন মুখ। সবাই জানে যে ভীমরে কেউ মাকুন্দা কইলে তার আর জীবিত থাকার অধিকার নাই। কিন্তু কর্ণ সব সময়ই প্রকাশ্যে তারে মাকুন্দা কইয়া ডাকে। কিন্তু কর্ণরে কিছু করার সাহস তার কোনোদিনও হয় নাই। কথাটা সে আগে ভাবে নাই যে দুর্যোধনরে মারতে হইলে তার কর্ণের সামনে পড়তে হবে; যে কর্ণরে কৃষ্ণও ভয় পায়...

আশপাশের গাছপালার উপর ভীম রাগ ঝাড়তে থাকে। অবস্থা খারাপের দিকে যাইতাছে দেইখা দ্রৌপদী ভীমেরে সরাইয়া নেয়। অর্জুন এই বিষয়ে নাক গলায় না। কিন্তু একটু পরেই একটা অজুহাত নিয়া যুধিষ্ঠিরের সামনে খাড়া হয়- খালি তো বনবাসে থাকলেই হইব না। আমাগের তো কিছু অস্ত্রশস্ত্রও জোগাড় করতে হইব। না হইলে যুদ্ধ করব কেমনে?

বাকিদের বনে রাইখা অস্ত্র সংগ্রহের নামে অর্জুন বাইর হইয়া যায়। দ্রৌপদী বোঝে তেরো মাসেই অর্জুন বনের জীবনে হাঁপাইয়া উঠছে; তাই একটা অজুহাত দিয়া বন থাইকা বাইরে যাবার উপায় বাইর করছে সে। দ্রৌপদী বেশি কিছু বলে না। খালি কয়- ভালো থাইকো আর দয়া কইরা শক্তিমান কারো লগে বাহাদুরি করতে যাইও না...

অর্জুন পিছলাইয়া যাবার পর ভীমেরে দৌড়ের উপরে রাখতে যুধিষ্ঠির আবার জায়গা বদলাইয়া কাম্যকবনে ফিরা আসে। এইখানে জঙ্গল টঙ্গল পরিষ্কার করে থাকার জায়গা টায়গা করতে গিয়া ভীম কয়দিন চুপচাপ থাকে। কিন্তু তারপরে আবার সে অস্থির হইয়া উঠে। তবে এইবার চিল্লাচিল্লি লাফালাফি বাদ দিয়া বহুত মাথা খাটাইয়া এমন যুক্তি বাইর করছে যাতে যুধিষ্ঠিরের প্রতিজ্ঞাও থাকে আবার পাণ্ডবদেরও বনে থাকতে হয় না। সে ঠান্ডা মাথায় বিনীতভাবে যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়া কয়- ভাইজান। ক্ষত্রিয়ের কামই তো হইল রাজ্য শাসন; বনবাস না; কথাটা ঠিক কি না? ...তো এক কাম করি; আমরা অর্জুনরে ফিরাইয়া আইনা কৃষ্ণের লগে মিলা তেরো বছর হইবার আগেই হস্তিনাপুর আক্রমণ কইরা দুর্যোধনরে বিনাশ কইরা ফালাই। কিন্তু তাতে প্রতিজ্ঞাভঙ্গের লাইগা আপনের পাপ হইব; কথাটা আমি মানি। তো তেরো বছরের প্রতিজ্ঞা কইরা সময়ের আগেই হস্তিনাপুর যাওয়ার লাইগা যে পাপ হবে; সেইটা খণ্ডানের লাইগা রাজ্য জয়ের পর আপনে না হয় আবার আইসা একলা একলা বনবাস করবেন। এতে রাজ্যও জয় হবে আবার আপনের পাপও খণ্ডাইবে... বুদ্ধিটা ঠিক আছে না ভাইজান? আর এতেও যদি পাপ খণ্ডন না হয় তাইলে আমরা সকলে মিলেই না হয় পাপ খণ্ডনের লাইগা বামুন খাওয়াইয়া যজ্ঞ করব। ...ক্ষমতা থাকলে পাপমুক্ত হওয়া তো কঠিন কিছু না; তাই না ভাইজান?

যুধিষ্ঠির ভীমেরে বোঝায়- তোমার কথা ধর্মের মতো শুনাইলেও এইটা কিন্তু চতুরতা...

ভীম আজকে ধর্মের যুক্তি নিয়াই ধম্মপুত্তুরের লগে তর্ক করতে আসছে। একটায় যখন যুধিষ্ঠিররে পটানো গেলো না তখন সে আরেকটা বাইর করে। সে কয়- আইচ্ছা ভাইজান। ঠিকাছে। তুমি যখন কইছ যে এইটা চতুরতা তখন আমি মাইনা নিতাছি। এইবার তাইলে তোমারে বেদ থাইকা একটা খাটি নিখুঁত ধর্মের ব্যাখ্যা দেই...। তুমি তো জানোই যে বেদে কইছে দুঃখকষ্টের এক রাত্রিই সাধারণ এক বৎসরের সুমান হয়? সেই হিসাবে বনে জঙ্গলে তো আমরা তো দুঃখ-কষ্টেই আছি। আর বেদের এই যুক্তিতে তেরো দিনেই তো আমাদের তেরো বছর পার হইয়া গেছে। তাই না? তাইলে আর দেরি কীসের? আমরা তো বেদ আর ধর্ম মাইনাই এখন ফিরা যাইতে পারি?

ভীমের কাছে যুধিষ্ঠিরের বেদ বুঝতে হবে এইটা ভাইবা তার দম আটকাইয়া যায়। যুধিষ্ঠির কিছু না কইয়া ছটফট করে। ভীম মনে করে যুধিষ্ঠিররে সে যথেষ্ট পরিমাণ বেদ বুঝাইতে পারছে। এইবার তার যুক্তিগুলারে আরো পাকাপোক্ত করার লাইগা কিছু রেফারেন্স দেওয়া দরকার। ভীম আরো স্থির হইয়া ঋত্বিক বামুনের মতো যুধিষ্ঠিরের সামনে আসন পাইতা বসে- আমি যা কইলাম তাতে যুদি তোমার কোনো সংশয় থাকে তবে তুমি ঠাকুরদা দ্বৈপায়ন কিংবা ভীষ্ম কিংবা জ্যাঠা শুকদেব কিংবা বিদুর কাকারে জিগাইয়া দেখতে পারো যে আমি বেদবিরুদ্ধ কিছু কইছি কি না...

যুধিষ্ঠির পুরা তাব্দা খাইয়া বইসা থাকে। একটাও কথা কয় না। ভীমের মনে হয় চাইর চাইরজন বেদবিজ্ঞের রেফারেন্সসহ বেদের ব্যাখ্যা শুইনা যুধিষ্ঠিরের যেহেতু আর কিছু কওয়ার নাই তাই ধইরা নিতে হইব যে ভীমের যুক্তিটা সে মাইনা নিছে। ভীম এইবার আসন ছাইড়া উঠে পাছার ধুলা ঝাইড়া মুচকি হাসি দিয়া যুধিষ্ঠিরের কাছে নিজের বেদবিদ্যার রহস্য উন্মোচন করে- তুমি তো মনে করো আমি খালি খাই আর কিলাকিলি করি; কিন্তু বেদব্যাস দ্বৈপায়নের নাতি আমি; চতুর্বেদী ঋষি শুকদেবের ভাতিজা। সেই হিসাবে দুই চাইর পাতা বেদ পড়া তো আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে; তাই না?

যুধিষ্ঠির এখনো কিছু কয় না। ভীমের মনে হয় বেদের ব্যাখ্যা খণ্ডাইতে না পারলেও যুধিষ্ঠির মনে মনে দুঃখ পাইছে। তারে একটু সান্ত্বনা দেওয়া দরকার। সে গলায় দরদ মাখাইয়া যুধিষ্ঠিরের কান্ধে হাত রাখে- আরে ভাইজান; কষ্ট পাওয়ার কী আছে? গুণীজনরা তো কইয়াই দিছেন যে বাটপারের লগে বাটপারি করা কোনো পাপ না...

এইবার দপ কইরা যুধিষ্ঠিরের চোখ জইলা উঠে। সাথে সাথে ভীম টের পায় একটা মারাত্মক ভুল কইরা ফালাইছে সে। সে এখন যে কথাটা কইছে সেইটা বেদেও নাই আবার কোনো বেদজ্ঞও কয় নাই। সে লগে লগে তার দোষ কাটায়- না না। এইটা কিন্তু বেদের কথা না। এই কথাটা আমি কৃষ্ণের কাছে শুনছি...

যুধিষ্ঠিরের জ্বলে উঠা চোখ আবার ফ্যাকাশে হইয়া উঠে। ভীম মজা পায়। এই অবস্থায় যুধিষ্ঠিররে একটা খোঁচা না মরতে পারলে ভীমের কইলজা ঠান্ডা হয় কেমনে? সে একটু দূরে আইসা হাসে- ভাইজান। তুমি মূর্খ কইয়া আমার কথা ফালাইয়া দিলেও কৃষ্ণের কথাতো আর ফালানোর ক্ষমতা তোমার নাই?

ভীমের হাতে চটকনা খাওয়ার ভয়ে বড়োভাইদের কথাবার্তা না শোনার ভান কইরা মুখ ঘুরাইয়া হসে নকুল-সহদেব। দ্রৌপদী হাসব না কানব বুইঝা উঠতে পারে না। ভীম যেভাবে দ্বৈপায়ন শুকদেবের রেফারেন্স দিয়া যুধিষ্ঠিররে বেদ আর ধর্ম শিক্ষা দিতাছে তা দেখার মতো একটা বিষয়। ভীম বোধহয় আইজ সিদ্ধান্তই নিয়া ফালাইছে যে সাক্ষাত দ্বৈপায়নের মতো ঠান্ডা মাথায় যুধিষ্ঠিররে বেদের যুক্তি দিয়া হস্তিনাপুর ফিরত নিয়া ছাড়ব সে। আইজ যুধিষ্ঠিরের ধৈর্যশক্তির পরীক্ষা হইতাছে না সে বেকুব বইনা গেছে সেইটা এখনো দ্রৌপদী ঠাহর করতে পারে না ঠিকমতো। দ্রৌপদী দূরে খাড়াইয়া ত্যাড়া চোখে ভীমের বেদ শিক্ষার ইস্কুলের দিকে নজর রাইখা গাছ-লতা-পাতা নাড়াচাড়া করে। যুধিষ্ঠির ঠাটাপড়া মানুষের মতো কাঠ হইয়া বইসা আছে। যুধিষ্ঠিররে যথেষ্ট পরিমাণ ধর্মশিক্ষা দিবার কৃতিত্ব জাহির করার লাইগা ভীম বারবার নকুল সহদেব আর দ্রৌপদীর চোখে পড়ার চেষ্টা করতাছে। কিন্তু নাটকের বাকি অংশ দেখার লোভে সকলেই মুখ ঘুরাইয়া কান খাড়া কইরা আছে দুইভাইয়ের দিকে...

ভীমের লাইগা দুঃখ হয় দ্রৌপদীর। মানুষটা সরল সোজা কিন্তু পরিবারের কোনো বিষয়ই বিন্দুমাত্র অবহেলা করে না সে। ধৃতরাষ্ট্রের পোলাদের লগে অন্য কোনো পাণ্ডবই মারামারি করে নাই; যা করার করছে শুধু এই ভীম। ধৃতের পোলাদের একমাত্র শত্রুও এই ভীম। মানুষটা খায় একটু বেশি; কিন্তু বনবাসে আসার দিন ভীমেরে খাওনের খোঁটা দিয়া দুর্যোধন যেভাবে ভ্যাংচাইছে তা সহ্য হয় নাই দ্রৌপদীর। নিজের দুঃখ ভুইলাও সেদিন তার মনে হইছিল কামটা ভালো করল না দুর্যোধন...

ভীম হাঁটে ঝুইকা ঝুইকা; লম্বা লম্বা পা ফালাইয়া। মোটা মানুষ হওয়ায় হাটার সময় তার হাঁটু ভাঙে কম। পুরা পা ফালাইয়াই সে ঝুইকা ঝুইকা হাটে। রাগের মাথায় যখন হাটে তখন তার হাঁটার ঝাঁকুনি আরো বাড়ে। হস্তিনাপুর ছাড়ার সময় পঞ্চপাণ্ডব আর দ্রৌপদী যখন হাটতে হাটতে আসছিল তখন দুর্যোধন আইসা ভীমের পাশাপাশি তারে ভ্যাংচাইয়া ঝুইকা ঝুইকা হাঁটা শুরু করে- হি হি হি....

দুর্যোধন ভীমেরে ভ্যাংচাইয়া হাটে আর হাসে- হি হি হি। ভাইরে। আমার পেটলা ভাই ভীম; তোর লাইগা দুঃখে আমার বুকটা ফাইটা যায়। কত মারামারি করলি দুইডা খাওনের লাইগা। কিন্তু তোর পেট থাকলেও কপাল নাই। নির্বোধ যুধির লাইগা তোর পেট ভইরা খাওনটাও গেলো। আমি জানি রে ভাই; রাজ্য থাকা না থাকায় তোর কিছু যায় আসে না; কিন্তু রাজ্যের লগে লগে যে তোর গামলা ভইরা খাওনের বন্দোবস্তও গেলো। আহারে....

দুর্যোধন কান্নার ভান করে ভীমের সামনে এসে চোখ মোছে- আমার ভাইরে ভাই... পেটলা উপাসি ভাই আমার; আউ আউ আউ...

দ্রৌপদী ভীমের কাছাকাছি থাকে। ভীমের হাটার গতিই বলে দেয় যেকোনো সময় সে সবকিছু ভুইলা দুর্যোধনরে আক্রমণ করে বসতে পারে। কিন্তু দুর্যোধনও যে ভীমের উপরে তার জীবনের সব রাগ আজকেই মিটাইতে চায়...। দুর্যোধন ভীমেরে ভ্যাংচাইয়া কান্দে- ভাইরে আমার ভীম ভাই। বনের লতাপাতা কচুঘেঁচু খাইয়া যুধিষ্ঠির ঠিকই ধর্ম করতে পারব; কিন্তু তোর এই গতরটা টিকব কেমনে রে ভাই? আহারে... তেরো বচ্ছর পর যখন তুই ফিরা আসবি তখন তো আর তোর এই তাকত থাকব না রে ভাই। আমার মাথায় গদা মারার বদলা ভর দিয়া হাটার লাইগা তোর হাতে থাকব একটা বাঁশের লাঠি...। হি হি হি....

দুর্যোধন বারবার ভীমের পথ আগলায়। ভীম একটাও কথা না বলে ফুসতে ফুসতে দুর্যোধনরে এড়ায়। দুর্যোধন আবার দৌড়াইয়া গিয়া ভীমের কাছে খাড়ায়- আমি তোরে কথা দিলাম ভাই। তুই যেদিন ফিরা আসবি সেদিন তোরে আমি পেট ভইরা ঘিয়ে ভুনা মাংস খাওয়ামু। তোর লগে যতই শত্র“তা থাউক; আমি আস্ত একখান ঘিয়ে ভুনা বলদের রান দিমু তোরে। তুই তো জানোসই যে আমি ডেলি ডেলি কতশত ফকির খাওয়াই; সেই ক্ষেত্রে তোরে একটা বলদের রান দিতে পারব না আমি? অবশ্যই দিমু। আরে তুই আমার পাণ্ডুকাকার পোলা না?... আমার ভাই... কিন্তু রে ভাই...

দুর্যোধন আবার ভীমের সামনে এসে কান্দনের ভান করে চোখ মুছে... কিন্তু ... সেইদিন তো গরুর রান চাবানোর লাইগা তোর মুখে একটাও দাঁত থাকব না রে ভাই... তুই মাংস খাবি কেমনে? হি হি হি... এখন দাঁত আছে কিন্তু খাওন নাই; খাওন যখন পাবি তখন থাকব না দাঁত । হি হি হি... আইচ্ছা যা; কথা যখন দিছি তখন তোরে যেমনেই পারি আমি মাংস খাওয়ামু। আমি নিজে মাংস চাবাইয়া থুক কইরা তোর পাতে ফালামু আর তুই সেই থুতু চাইটা সেদিন মাংসের স্বাদ নিবি? এইটাই হইব তোর উপযুক্ত আপ্যায়ন তাই না রে ভাই? উচ্ছিষ্ট ছাড়া তো তোর কপালে আর কিছু জুটার কথা না। হি হি হি...

অদ্ভুতভাবে ভীম একটাও কথা বলে না সেদিন। কিন্তু ভীমরে দেইখাই দ্রৌপদীর মনে হইছিল দুর্যোধন কামটা ভালা করতাছে না। সবাই সবকিছু ভুইলা গেলেও প্রতিশোধ ভোলে না ভীম। ভীমেরে এই টিটকারি দিবার খেসারত দুর্যোধনরে একদিন দিতেই হবে...

বনে আইসা ভীমের সত্যিই কষ্ট হইতাছে। এর লাইগা সে লাফালাফিও করে। কিন্তু আইজ যে সে বুদ্ধি কইরা যুধিষ্ঠিররে বেদ বুঝাইতে গেছে এইটা দেইখা দ্রৌপদী হাসি থামাইতে পারে না। ভীমের মুখে বেদবাণী শোনার ধৈর্য পরীক্ষায় বোধহয় যুধিষ্ঠির পাশ কইরা ফালাইছে। সে বেশ শান্তশিষ্ট হইয়া চুপ মাইরা বইসা এখন ভীমের বেদের স্টকের পরীক্ষা নিতাছে। ভীমও এখন যুধিষ্ঠিরের লগে ধৈর্যের কম্পিটিশনে নামছে। অশেষ ধৈর্য নিয়া একেকটা কথা ঘুরাইয়া ফিরাইয়া বারবার বলতে বলতে ভীমের খেয়াল হইছে তার বেদের স্টক শেষ কিন্তু এখন পর্যন্ত যুধিষ্ঠির একটাও শব্দ বলে নাই। সে একটু ঘাবড়াইয়া গেলেও ধৈর্য হারায় না। বেদ ছাইড়া এইবার সে যুধিষ্ঠিররে কূটনীতি বুঝাইতে শুরু করে- ভাইজান। না হয় আমরা বারো বছর বনবাস করলাম। কিন্তু তারপরে তেরো নম্বর বছরে তো আমাগের লুকাইয়া থাকতে হবে। লুকাইতে না পারলে তো আবার আরো বারো বছরের লাইগা বনবাস। তো আপনে কি মনে করেন যে তেরো নম্বর বছরে দুর্যোধনের চেলারা আমাগের খুইজা বাইর করব না? আমরা যেখানেই যাই না কেন; সবখানে তার চর আছে; এইখানেও আছে। তার মানে আমরা কিন্তু জীবনেও হস্তিনাপুর ফিরা যাইতে পারব না...

ভীমের এইবারের কথায় মিনতির সুর। এইবার যুধিষ্ঠির মুখ খোলে- একবার যখন ধর্মমতে কইছি যে বারো বছর বনবাস আর এক বছর অজ্ঞাতবাস করব। তখন তেরো বচ্ছরের আগে আমারে তুমি কোনোভাবেই হস্তিনাপুর নিতে পারবা না। যত যাই ব্যাখ্যা দেও আমারে দিয়া কোনো অধর্ম করাইতে পারবা না তুমি...

বেদ শেষ। কূটনীতি শেষ। যুধিষ্ঠিরের সিদ্ধান্ত জানার সাথে সাথে ভীমের ধৈর্যও শেষ। এইবার এক লাফে ভীম তার নিজের চেহারা ধরে- ধর্ম কইরা কোন বালটা ছিঁড়বা তুমি? ধর্ম কইরা রাজ্য পাইলেও পাশা খেলার কথা শুনলে তো তোমার হুশবুদ্ধি কিছু থাকে না। তখন তো আবার বাজি ধইরা নিজের বিচি পর্যন্ত হারাইয়া বসবা তুমি...
২০১২. ১১.১৯ সোমবার

মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ৩। দ্রৌপদী। পর্ব ১
মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ২। কুন্তী [পর্ব ৩]
মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ২। কুন্তী [পর্ব ২]
মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ২। কুন্তী [পর্ব ১]
মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ১। সত্যবতী


মন্তব্য

নির্ঝর অলয় এর ছবি

মহাভারতের আলোকে একটি ভিন্নমাত্রার সাহিত্যিক সংযোজন। সেসময়কার গোমাংস ভক্ষণের রেওয়াজটাও সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন। তবে মূল মহাভারতের ভীম কিন্তু কর্ণকে ভয় পেতেন না মোটেই! তাদের মধ্যে দুবার যুদ্ধ হয় -একবার ভীম জেতেন, একবার কর্ণ। কাজেই সমানে সমান। তবে আপনি যে রসিক আঙ্গিকে ভীমকে দেখেছেন তার সাথে আপনার গপ্পের লাইন সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভালো লাগল। হো হো হো

মাহবুব লীলেন এর ছবি

হয়ত মূল ধরলে বিষয়টা এরকইম

কিন্তু ভীমরে কেউ মাকুন্দা বললে তাকে সে মেরে ফেলত
অথচ কর্ণ তাকে সব সময় মাকুন্দা বলেই ডাকত
ভীম কিন্তু কোনোদিনও কর্ণকে এই কারণে হত্যা করতে যায়নি
আমার মনে হয় ভয়ে... তাই যোগ করে দিলাম

অতিথি লেখক এর ছবি

এটাকে যে কোন ভাবে দেখার স্বাধীনতা আপনার আছে। নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
আচ্ছা, মাকুন্দ বলার কারণে ভীম কাকে কাকে মেরেছিল?

নির্ঝর অলয়

দিগন্ত এর ছবি

গোমাংস ট্যাবু এসেছে এর অনেক পরে।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

মাহবুব লীলেন এর ছবি

হ বহুত বহুত পরে। যদ্দুর মনে হয় গরু ট্যাবুর বয়স হাজার দুয়েক বছর বা তারও কম
আর এই ঘটনা এখন থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

এই পর্বটা দ্রৌপদীকে নিয়ে, তাই আগে থেকেই ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে দ্রৌপদীই ছিলেন। কিন্তু ফোকাসটা দ্রৌপদীর উপর থেকে সরে ভীমের উপর চলে গেছে বলে মনোযোগ কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। মহাভারতে নিয়ে আপনার সমুদয় লেখার মধ্যে এই প্রথম এমনটা হলো। এটা একান্তই আমার ব্যাক্তিগত অভিমত, তবুও একটু ভেবে দেখবেন।

আব্দুল্লাহ এ.এম.

মাহবুব লীলেন এর ছবি

কথাটা সত্য
রাজনৈতিক নারী সত্যবতী আর কুন্তীর সাথে দ্রৌপদীকে আনতে গিয়ে বিপদে আছি
আমার মনে হয় দ্রৌপদী বরং রাজনৈতিক পুতুল

অন্যের ঘটনার শিকার হওয়া ছাড়া বোধহয় তার কিছু নেই। কোনো ঘটনার উপরই তার না আছে নিয়ন্ত্রণ না আছে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বা পরিকল্পনা

নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী তাকে এক রকমভাবে এঁকেছেন; রাজনীতির মাল মসলা দিয়ে। কিন্তু আমার মনে হয় সে রাজনীতি বুঝত/রাজনীতিতে পড়াশোনা করা মানুষ এবং ব্যক্তিজীবনে খুবই শক্ত মানুষ কিন্তু রাজনীতিতে তার কোনো অবদান নাই

০২

নোটগুলো গোছাতে বহু সময় লেগেছে। তাই গেঁথে রাখলাম আপাতত। এটাকে হয়তো দ্রৌপদীর নাম বাদ দিয়েই অন্য কিছু করব। কারণ পরের পর্বেই এসে জুড়ে বসবে ভীমের ছেলে ঘটোৎকচ

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

গতকাল দ্রৌপদীর প্রথম পর্ব পড়েছিলাম, আজ দ্বিতীয় পর্ব।

গোলা !!!
হাসি

মাহবুব লীলেন এর ছবি

ইস্কট ছিল তাই দিয়া দিলাম

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

দ্রৌপদী পর্ব ১ ও এই পর্ব দুটোতেই খুব মজা পেয়েছি। চলুক

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

লীলেন্দা, অনেক তো ঘুমালেন । এবার জাগুন, পরের পর্বটা ছাড়ুন ...

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

কিষান এর ছবি

পরের পর্ব কি আসবে না? মন খারাপ

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।