পরাজিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা - চার

সত্যপীর এর ছবি
লিখেছেন সত্যপীর (তারিখ: সোম, ০৯/০৪/২০১২ - ৩:০৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কোলকাতা আক্রান্ত। ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ ঘিরে মুহুর্মুহু কামান দাগছে নবাবফৌজ, চলছে তুমুল লড়াই। উমিচাঁদের বিশাল বাগানবাড়িতে বসে ছক কষছেন তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা। এইরকমটাই আমরা দেখেছিলাম গত পর্বে। আজ দেখব কোলকাতার পতন এবং অন্ধকূপ হত্যার বিবরণ।

পুরাতন ফোর্ট উইলিয়ামের মিলিটারি জেলের একটি সেল অন্ধকূপ নামে কুখ্যাত। আঠেরো ফিট বাই চোদ্দ ফিট দশ ইঞ্চি জায়গা, দুটো খুপরি ঘুলঘুলির মত জানালা। ঐখানে ২০ জুন ১৭৫৬ সালে কোলকাতা পতনের পর নবাব ১৪৬ ইংরেজ বন্দী (মহিলা সহ) ঠেসে ভরে রাখেন, পরবর্তীতে এক বন্দী জে হলওয়েলের মতে ১২৩ জনই মারা পড়ে ঐ রাত। ইংরেজের চোখের পানির সীমা থাকেনা এতবড় ট্র্যাজিক ঘটনায়। কিন্তু সিরাজ মদ খাওয়ায় যেমন পারঙ্গম ইংরেজ মিথ্যে বলায় সেরকম পটু। তাই ঘটনাটা খুঁটিয়ে নজর করা যাক। থিওরেটিক্যালি, সিরাজের পক্ষে এই নিষ্ঠুরতা কি সম্ভব? নিশ্চয়ই। সিরাজ ছিলেন মহাপর্বতসম নিষ্ঠুর, যুদ্ধবন্দীদের গারদে পুরে মারা তার জন্যে তেমন ব্যাপার না। কিন্তু অন্ধকূপ নিয়ে প্রথম সমস্যা অংকে। ১৮ বাই ১৫ ফিট, অর্থাৎ ২৭০ বর্গফুট। ১৪৬ বন্দী। অতএব বন্দীপিছু বরাদ্দ ১.৮৫ বর্গফুট। নিজের কাঁধের দিকে তাকিয়ে দেখুন, দেড় থেকে দুই ফুট কি বলেন? ইংরেজ সিপাই ঘাড়ে গর্দানে চওড়াই হবার কথা, সুতরাং তাকে যদি ২ বাই এক ফুট অর্থাৎ দুই বর্গফুট বরাদ্দ করি তাহলে ১৪৬ বন্দীর জন্য লাগে অন্তত ২৯২ বর্গফুট। এবং এ শুধুই অংকের হিসাব, বাস্তবে এভাবে মানুষ পোরা সম্ভব নয়, মানুষ কি মুড়ি? তারা নড়বে চড়বে, মুড়ির মতন বয়ামে মানুষ ভরা অসম্ভব।

অন্ধকূপ নিয়ে অন্য সমস্যা সাক্ষ্যপ্রমাণ। জীবিত বন্দী হলঅয়েলের লিখিত রিপোর্টই মোটামুটি একমাত্র প্রমাণ। লর্ড কার্জন ঐ রিপোর্টের উপর বিশ্বাস করেই ফোর্ট উইলিয়ামে স্মারক টারক খোদাই করে দেন। অনেকটা আলুপেপারের মতন ব্যাপার, অরা লিখলেই বেবাক সত্য। সুতরাং অন্য উৎস খুঁজতে হয়। কাছাকাছি সময়ে কোলকাতার আর্মানী সওদাগর জোসেফ আমিন তার ছেলেকে পত্রে লিখেন, “বদমাইশ সিরাজউদ্দৌলা বিরাট আর্মি নিয়ে শহর দহল করে, আর অন্ধুকূপে প্রায় চল্লিশ নিরপরাধ ইংরেজকে এক রাতে মেরে ফেলা হয়। লুটপাটের কথা আর বোলোনা, আমার ষোলটি হাজার রূপী লুট”। পাঠক লক্ষ্য করুন জোসেফ আমাদের নয়নের মণিকে ডাকছেন “বদমাইশ সিরাজউদ্দৌলা”, সুতরাং তার কুকীর্তি সত্য হলে তিনি ১২৩ মৃতের কথাই বলার কথা। বলছেন মোটে চল্লিশ মৃত। ঠিক আছে। আরেক আর্মানী সওদাগর টমাস খোজামল বলেন, “...লুটের পর প্রচুর ইংরেজ বন্দী করা হয় আর ছোট একটি অন্ধ সেলে পুরে দেয়া হয়। এতই জায়গা কম ছিল যে তারা একে অন্যের উপর হাত পাও উঠিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হয় সিরাজউদ্দৌলার নিষ্ঠুর অফিসারদের নির্দেশে। পনেরোজনেরও অধিক ইংরেজ সেই রাতেই মারা যায়”। আচ্ছা। তাহলে পনেরো জন মারা যায়। হলওয়েল সায়েবের ১২৩ জন নয়, ১৫ জন। সুতরাং একজন বলছে ৪০ জন একজন ১৫ জন। দুইটি নাম্বারই ১২৩ এর অনেক কম। তাছাড়া জুন মাসের আমপাকা গরমে ১৪৬ ইংরেজ বয়ামে ভরে রাখলে একটি ইংরেজও আস্ত থাকার কথা নয়, ২৩ জন দূরে থাক।

এছাড়া পরবর্তীকালে যখন সিরাজের পতন হয় তখন ক্লাইভ ক্ষতিপূরণবাবদ যে ব্যাপক টাকা নবাব মীরজাফরকে চার্জ করে তার মধ্যে ছোটখাট ব্যাপারেও ছাড় দেয়া হয়নি, পাইপয়সা গুণে নেওয়া হয়েছে। ঐখানে লক্ষ্যণীয় যে অন্ধকূপ হত্যার মৃতদের ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে আদৌ কোন আওয়াজ নাই। ক্লাইভ বা ওয়াটসন নানাবিধ সময়ে সিরাজকে যে চিঠি লিখেন তাতেও অন্ধকূপের কোন উল্লেখ নাই। ঘটনা সেরকম হলে ক্লাইভ নবাবকে ছেড়ে কথা কইবার কথা নয়।

সুতরাং অন্ধকূপ সম্ভবত মিথ্যে নয়, অতিরঞ্জন। যুদ্ধবন্দীদের পাইকারী সেলে পুরে রাখা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা, এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। আহত যুদ্ধবন্দী চিকিৎসার অভাবে মারা পড়বে সেটাও স্বাভাবিক, সাথে যুক্ত হয়েছিল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। কিন্তু বন্দীসংখ্যা ১৪৬ ছিলনা, মৃতের সংখ্যাও ১২৩ নয়। বন্দীও কম ছিল মারাও গিয়েছিল কম সংখ্যক।

এবার পড়বো অনুবাদ।

….................................................................................
(তৃতীয় পর্বের পর)

রাত একটা দুটোর দিকে ইংরেজ অফিসারেরা জরুরী সভা ডাকলেন। গোলাবারুদে টান পড়ে গিয়েছিল, সিপাইরাও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল বলেন অফিসারেরা। মদ খেয়ে চুর হয়ে ছিল তারা, যুদ্ধে যাবার নির্দেশে বেয়নেট উঁচিয়ে পালটা হুমকিও দিচ্ছিল। এদিকে নবাব বাহিনী দিচ্ছে বেধড়ক মার। ঠিক হল আর লড়ে কাজ নেই, দূর্গ ছেড়ে যাবার সময় হয়েছে। বিশ তারিখ সকালে ধোঁয়া কমে এলে দেখা গেল দূর্গের ঠিক বাইরে নবাব বাহিনী কাছিয়ে এসেছে। বিকেলের দিকে দূর্গের পতন হল।

একুশ তারিখ সকালে দুইটি ইংরেজ ছোট জাহাজ নবাববাহিনীর হাতে ধরা পড়ে আর লুট হয়। শোনা যায় একগাদা মেয়েমানুষ লুটেরাদের হাতে পড়ে, কিন্তু মোটা টাকার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। সিপাইরা তাদের গায়ে হাত তোলেনি।

নবাব তখন বজবজ শহর সুরক্ষায় ব্যস্ত। আশপাশের লোকেদের ইংরেজদের সাথে সকল লেনদেন নিষিদ্ধ করার কড়া হুকুম জারি ছিল। সুতরাং ইংরেজ পর্তুগীজ আধা ফিরিঙ্গি মেয়েমদ্দ বাচ্চাকাচ্চা বোঝাই জাহাজ কোথাও ভিড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। শেষমেষ ২৫ তারিখ ওলন্দাজদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে চিঠি লিখলে পরে তারা ফুলতায় জাহাজ ভিড়ানোর অনুমতি পায়। ঐখানে ওলন্দাজের ছোট পত্তনি ছিল।

কুঠিপ্রধান ড্রেক ও অন্যান্য জাঁদরেল অফিসারদের বীরত্বের সাথে পলায়নের খবরে ফোর্ট উইলিয়ামবাসীরা আঁতকে ওঠে। আর্মানী পর্তুগীজ বাদ দিয়ে ধরলে দেখা গেল ১৭০ পুরুষমানুষ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। তারা মিলে জরুরী সভা ডাকল আর ড্রেক ইত্যাদি অফিসারদের বহিষ্কার ঘোষনা করা হল। হলওয়েল সায়েবকে নয়া কাউন্সিল প্রধান খাড়া করিয়ে দেয়া হল। ঠিক কি কারণে এই ব্যক্তিটি নির্বাচিত হয় তা নিশ্চিত করে জানা যায়না। তিনি মাঝবয়েসে কোম্পানীর নোকর হয়ে আসেন, বয়েসহিসেবে কাউন্সিলের মুরুব্বিও তিনিই ছিলেন। লোকে তাকে তেমন পছন্দ করতো না, শোনা যায় তিনি দূর্গে রয়ে গিয়েছিলেন কারন তিনি ঠেলাঠেলি করে জাহাজে উঠতে পারেননি। সে যাই হোক, কোম্পানীর এই ঘোর দূর্যোগের সময় তিনি গভর্নর হলেন।

ঐ অল্প সংখ্যক লোকে আস্ত কুঠি ঠেকিয়ে রাখা দূরের কথা দূর্গই ঠিকমত সুরক্ষা করতে অপারগ। স্থানীয় গীর্জায় সকলকে ডেকে হলওয়েল কাপুরুষ ড্রেকের মুন্ডুপাত করেন আর বলেন যেকোন মূল্যে কুঠি রক্ষা করতে হবে। দূর্গের ভিতরে তিন বাক্সভর্তি সোনাজহরত তাদের মধ্যে বিলিবাঁটোয়ারা করা হবে বলেও কথা দিলেন তিনি। উজ্জিবীত সিপাইরা গ্যারিসন ঠেকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা করতেই আবার খেতে থাকল মারের পর মার। নবাবের প্রকান্ড কামানের গোলার বিপরীতে তাদের কামান মারছিল অল্পই। সারারাত চলল এরকম গোলাগুলি, আশপাশের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে ঘিরে আসছিল নবাবফৌজ। নিশ্চিত পরাজয় জেনে দূর্গের সিপাইরা আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানিয়ে বরং মদ খাওয়া ধরল। এক কর্পোরাল আর ছাপ্পান্ন সিপাই ঐ রাতেই পালিয়ে নবাবফৌজে যোগ দেয়। তাদের অধিকাংশই ওলন্দাজ।

২০ জুন দিনটি ছিল রোববার। কোলকাতার ইতিহাসে এরকম ভয়াল রোববার এসেছিল অল্পই। দূর্গের চতুর্দিক দিয়ে শত্রুপক্ষ আক্রমণ করে, দুই পক্ষেই প্রচুর হতাহত হয়। কথা ওঠে আত্মসমর্পনের, কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে হলওয়েল তা করতে রাজি হননি। লড়াই চলে দুপুর পর্যন্ত, তারপর পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হয়। ততক্ষনে ২৫ ইংরেজ নিহত আর ৭০ আহত। গোলন্দাজ বাহিনীর মাত্র ১৪ জন বাদে সকলেই মারা পড়ে।

উমিচাঁদ তখনো ইংরেজের বন্দী, তাই এবার তাকে খবর দিয়ে আনা হয়। নবাবের অন্যতম পিয়ারের লোক রাজা মাণিকচাঁদের কাছে চিঠি লিখানো হয় উমিচাঁদকে দিয়ে যেন তিনি একটা ফয়সালার উদ্যোগ নেন। দুপুর দুইটার দিকে পত্র যায়। তার কিছুক্ষণ পর খবর আসে দূর্গের মূলদ্বারের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে এক লোক গুলি থামানোর জন্য চিৎকার করছে। হলওয়েল ভাবলেন যাক পত্রমিতালিতে কাজ হয়েছে। সাদা পতাকা উড়িয়ে তাদের ভিতরে আনা হল আর তাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হল।

অস্ত্রসমর্পণের পর চারটার দিকে খবর এলো যে নানাবিধ লোকে দেয়ালের বাইরে জটলা করছে আর হ্যেডলবার্গ নামের এক ওলন্দাজ সার্জেন্ট দূর্গ থেকে নদীতে যাবার ছোট দরজাটি উড়িয়ে দিয়েছে। বাঁশের পলকা মই বেয়ে নবাবী সিপাইরা পাইকারি দেয়াল টপকে ভেতরে আসা শুরু করল আর পথে কাউকে পেলেই ধরে ধরে কল্লা ঘ্যাচাং। বিশেষ করে লালকোটধারী কাউকে পেলে ডবল ঘ্যাচাং। হলওয়েল ভেবেছিলেন তাকেও ঘ্যাচাং করে দেওয়া হবে, তাই তিনি আমৃত্যু লড়াই চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু নবাববাহিনীর এক অফিসার তাকে আত্মসমর্পনের সুযোগ দিলে তিনি অস্ত্র নামিয়ে রাখেন।

দূর্গের ভিতরে এলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। তিন দফায় বৈঠক হয় তার হলওয়েলের সাথে, প্রথমবার তার হাত ছিল বাঁধা। নবাব বন্ধন খোলার অনুমতি দেন আর বলেন তার কোন ক্ষতি হবেনা। তিনি যেন নিচ্চিন্ত থাকেন। তারপর তাকে প্রতিরোধ করার ব্যাপক দুঃসাহসে ইংরেজদের প্রতি তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন তিনি, আর ড্রেক বদমাসটিকে নানাবিধ দুষ্ট নামে ডাকা হয় কারন তিনি চমৎকার কুঠিবাড়িটি ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন ইংরেজ বাড়িঘরগুলি কতনা সৌন্দর্য্য, এই মনোরম স্থাপনাসমূহ ধ্বংস করতে বাধ্য করায় নবাব অতীব আফসোস প্রকাশ করেন।

আর্মানী পর্তুগীজদের ছেড়ে দেয়া হল, আরো কিছু ইয়োরোপীয়ও দূর্গ ছেড়ে হাঁটা দিল। ভিতরে চলছিল লুটপাট, কিন্তু মালসামান বাদে আর কিছুতে নবাব ফৌজের লোক হাত দিচ্ছিলো না। কাউকে দুর্ব্যবহারও করা হয়নি। এমন সময় ঘটনা ভিন্ন মোড় নিল। কয়টা সাদা মাতাল সিপাই ফট করে তলোয়ার বাগিয়ে আক্রমণ করে বসে। নবাবের কানে এই খবর যাওয়ার পর তিনি হুকুম দেন যেসব বজ্জাত এই কাজ করেছে তাদের যেন ধরে ধরে ফাটকে পোরা হয়। নবাবের অফিসারেরা ঠিক করলো তাদের বিভিন্ন সেলে না রেখে একটি সেলেই বন্ধ করা যাক, সারারাত এদের উপর চোখ রাখবে কে। নবাবফৌজ এমনিতেই ক্ষেপে ছিল, এই অভিযানে শোনা যায় ৭০০০ সিপাই মারা পড়ে। তাই সাদা অপরাধী গারদে পোরার হুকুম পেয়ে তারা বাছবিচার না করে ধরে ধরে সবাইকে অন্ধকূপে ঢুকিয়ে দেয়। ঐ সেলটি মাত্র দুইজন কয়েদী রাখার জন্যে নির্মিত, তাইতে ঠেসে ঢুকানো হয় ১৪৬ জন। সেলটি মোটামুটি ১৮ বর্গফূট। চান্দিফাটা গরম রাতে একে অপরের উপর হাতপাও উঠিয়ে মুর্গী লাদাই বন্দীর দল সামান্য পানির জন্য কাড়াকাড়ি করতে লাগল। নবাবী সিপাইদের সামনেই চলছিল এই তামাশা, আর বন্দীর দল কাতর কন্ঠে আবেদন জানাচ্ছিল যেন তাদের গুলি করে মেরে এই জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলে এই কান্ড, এমনকি নবাবের কিছু সিপাই যারা এই ঘটনায় একটু বিচলিত ছিল তারাও তার ঘুম ভাঙিয়ে কথা বলার সাহস পায়নি।

পরদিন অন্ধকূপ থেকে হেঁটে বেরিয়ে এল মোটে তেইশ জন। নবাব হলওয়েলকে তলব করে জানতে চাইলেন দূর্গের তিন বাক্স হীরাজহরত কোথায়? সবচাইতে পয়সাওলা কুঠির মধ্যে মাত্র ফকিরা পঞ্চাশ হাজার রূপী কেন? ক্রুদ্ধ নবাব হলওয়েলসহ আরো তিনটে অফিসারকে মীরমদনের হাতে তুলে দিলেন বন্দী হিসেবে। মীরমদন গরুর গাড়িতে বেঁধে তাদের কড়া রোদের মধ্যে বসিয়ে রাখলেন উমিচাঁদের বাগানে। এমনিতেই সারারাত অন্ধকূপে থেকে তাদের হালুয়া টাইট, তার উপর এই আমসত্ত্ব ভাজা। অশেষ যন্ত্রনাদানের পর নৌকাচেপে তাদের মুর্শিদাবাদ পাঠিয়ে দেয়া হল। ঐখানে পৌঁছে তাদের পুনরায় জেলে পোরা হল। সম্ভবত নবাবের নানি এবং মাতা এই শ্বেতাঙ্গ বন্দীদের প্রতি করুনা দেখাতে বলেন নবাবকে। এদিকে অন্য শলা দেওয়ার লোকেরও অভাব ছিলনা, তাদের মতে হলওয়েলকে কোলকাতায় মাণিকচাঁদের কাছে পাঠানো হউক যদি লুকানো ধনজহরতের হদিস পাওয়া যায়।

নবাব অপ্রত্যাশিত উদারতা দেখিয়ে বললেন, “জহরত হয়তো আছে হয়তো নেই। কে জানে। থাকলে থাকুক, তার তকলিফ যথেষ্ঠই হয়েছে। তাকে ছেড়ে দেয়া হোক।”

এদিকে সকল শ্বেতাঙ্গকে কোলকাতা ছেড়ে যাবার হুকুম জারি করেন নবাব ২১ তারিখ, নইলে নাক আর কান কেটে রাখার গ্যারান্টি দেওয়া হয়। শহরের নাম পাল্টে রাখা হয় আলিনগর, আর দূর্গের ভিতর তৈরি হয় সুদৃশ্য মসজিদ।

(চলবে)

স্যামুয়েল চার্লস হিল লিখিত Bengal in 1756-1757; a selection of public and private papers dealing with the affairs of the British in Bengal during the reign of Siraj-uddaula অবলম্বনে। অনুদিত অংশের সকল মতামত লিখকের নিজস্ব।

পাদটীকা

  • ১. মাসরভ জ্যাকব শেঠ রচিত Armenians in India, পৃষ্ঠা ৪৭২,৪৭৩
  • ২. জসবন্ত লাল মেহতা রচিত Advanced Study in the History of Modern India 1707-1813, পৃষ্ঠা ৩৭২
  • ৩. দক্ষিন চব্বিশ পরগনার অন্তর্গত বজবজ একটি ছোট শহর। বৃহত্তর কোলকাতার অন্তর্গত।
  • ৪. উড়িষ্যার অন্তর্গত ফুলতা একটি ছোট গ্রাম।
  • ৫. মীরমদন সিরাজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত অফিসার ছিলেন। পলাশীর যুদ্ধে তার মৃত্যু হয়


মন্তব্য

নিলয় নন্দী এর ছবি

খুব পরিশ্রমী লেখা পীরবাবা। অনেক কিছু জানতে পারছি এই লেখা থেকে।
চলুক চলুক চলুক

সত্যপীর এর ছবি

থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু।

..................................................................
#Banshibir.

চরম উদাস এর ছবি

চলুক
দারুণ

সত্যপীর এর ছবি

কন কি?

..................................................................
#Banshibir.

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

এত পড়াশোনা করার সময় কোথায় পান বলুন তো !!

দারুণ চলছে। চলুক

এরিক  এর ছবি

অনেক কিছুই জানলাম !

সত্যপীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

..................................................................
#Banshibir.

সত্যপীর এর ছবি

কি যে বলেন প্রদীপ্তদা।

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি

ইংরেজের ২৮শে অক্টোবর।

সত্যপীর এর ছবি

আম্রিকান সিভিল ওয়ারের কথা কন? (কনফিউজড ইমো)

..................................................................
#Banshibir.

নজমুল আলবাব এর ছবি

ইতিহাসের কাছাতো সব খুলে ফেলছেরে এই ছোকড়া। এরে আটকা...

সত্যপীর এর ছবি

কি যে বলেন নজমুল ভাই খাইছে

..................................................................
#Banshibir.

বাউলিয়ানা এর ছবি

দারুন।

চলুক চলুক।

সত্যপীর এর ছবি

থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু।

..................................................................
#Banshibir.

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

হাততালি
সত্যপীর রকস !

সত্যপীর এর ছবি

রক পেপার সিজর লিজার্ড স্পক! চাল্লু

আসেন ক্যামন?

..................................................................
#Banshibir.

ব্যঙের ছাতা এর ছবি

দেঁতো হাসি
হায় হায়! আপনি দেখি কবি হয়ে গেলেন! দারুন চন্দ মিলিয়েচেন (চ দিতে পারচিনা কেন?)
আমি ভালো আচি।

তৌফিক জোয়ার্দার এর ছবি

দারুণ হচ্ছে। চালিয়ে যান। চলুক

সত্যপীর এর ছবি

থ্যাঙ্কু ভাই, আসেন ক্যামুন?

..................................................................
#Banshibir.

হাসান এর ছবি

আপনার এই পর্বের জন্নে অপেক্ষা করছিলাম। ধন্যবাদ সাবলীল এবং মজার অনুবাদ এর জন্নে ।

এখানে আমার একটা কথা আছে। সিরাজউদ্দউলা যে নিষ্ঠুর ছিলেন- ইংরেজ দের এই দাবির মূল ভিত্তি আমার ধারণা ব্ল্যাক হোল হত্যাকাণ্ড। ব্ল্যাক হোল ছাড়া সিরাজ এর আর কোন নিষ্ঠুরতা র বর্ণনা আমি দেখিনি । এখন ব্ল্যাক হল এর কাহিনী যদি মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত হয় (আমার ধারণা অতি অতিরঞ্জিত - রুমানা পেইন্ট দিয়া) তাহলে তার পর্বত সম নিষ্ঠুরতা ও অতিরঞ্জিত হতে পারে কিনা ? অথবা আপনার আর কোন নিষ্ঠুরতার কথা জানা আছে কিনা। নিজের কাজিন কে যুদ্ধে হত্যা নিষ্ঠুরতা হতে পারে, কিন্তু এই দোষ সমসাময়িক কোন নবাব এর ছিলনা তা প্রস্ন সাপেক্ষ। তাহলে সিরাজ এর নিষ্ঠুরতা নিয়া ইংরেজ রা এত চিন্তিত কেন ? চরিত্র হনন?

এছাড়া আপনার প্রিয় ঐতিহাসিক ঈশ্বরচন্দ্র কিন্তু বলেছেন সিরাজ কে লোকে রাক্ষশ মনে করত এই কারণে । এবং মজার বেপার, তিনি কিন্তু ব্ল্যাক হল এর জন্নে সিরাজকে পুরা দায়মুক্তি দিয়া দোষ চাপাইছেন মানিকচাঁদ এর ঘাড়ে । পড়ুন বাংলার ইতিহাস, ২৫৮-২৫৯ পাতা।

আপনি পণ্ডিত লোক , আপনার জানার পরিধি অনেক । তবে পড়াশুনা করুন আর সাথে যা পড়বেন সেটা নিয়ে একটু বিশ্লেষণ ও করার চেষ্টা করুন । যে কেউ কিছু একটা লিক্লেই মেনে নিবে না।

ধন্যবাদ ।

কর্ণজয় এর ছবি

আপনার লেখাগুলো পড়ছি একেবারে প্রথম পোস্টটি থেকে। একটা উপন্যাসের মত করে। একটা উপন্যাস - একটি গল্প। আবার এটি - একটি ইতিহাসের দলিলও। কিন্তু ইতিহাসের সাথে উপন্যাসের পার্থক্য হচ্ছে ইতিহাসে ‘ইতিহাস রচয়িতা’র ব্যক্তিগত অবস্থানটি প্রকাশ্যে থাকে না - থাকে পাত্রপাত্রীর প্রামাণ্যতা। আর উপন্যাসে - পাত্রপাত্রীর প্রামাণ্যতা চলে যায় অন্তরালে, হয়ে ওঠে রচয়িতার দৃষ্টিকোণ থেকে তার পর্যবেক্ষনকৃত সামাজিক ইতিহাসের একটা প্রতীক।
কিন্তু আমরাতো জানিই ইতিহাসও কিভাবে রচয়িতার সৃষ্টি হয়ে দাড়ায়। আমরাতো দেখিই এটা। তাই একই ঘটনা অনেক দৃষ্টিকোণ থেকে জন্ম দেয় অনেক ইতিহাসের। এই অনেক ইতিহাস মিলেই আবার একটা উপন্যাস।
এভাবে আপনার লেখাগুলো পড়তে ভালো লাগছে।

সত্যপীর এর ছবি

আপনার লিখা আমি পড়লাম এই সেদিন। সাহিত্যের মাঝে ফট করে ইতিহাস মিশিয়ে আবার দ্রুত বের হয়ে আসা সহজ কথা নয়। ইতিহাসভিত্তিক ফিকশন লিখার ইচ্ছে আমার অনেক কিন্তু মৌলিক লিখা আমার আসেনা। তাই মুগ্ধ হয়ে আপনার লিখাগুলি পড়ছিলাম। চেষ্টা করে যাই দেখি, বলা যায়না গাইতে গাইতে একদিন গায়েন হয়েও যেতে পারি।

ভালো থাকবেন। অনেক ভালো।

..................................................................
#Banshibir.

আনোয়ার এর ছবি

চলুক

সত্যপীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

..................................................................
#Banshibir.

তারেক অণু এর ছবি
সত্যপীর এর ছবি

খালি পপ্পন খায় চিন্তিত

..................................................................
#Banshibir.

ওডিন এর ছবি

বরাবরের মতোই! চলুক

সত্যপীর এর ছবি

খাইসে বলেন কি?

..................................................................
#Banshibir.

তুলিরেখা এর ছবি

আহ আপনার এই মজারু করে লেখা ইতিহাস যে কী দারুণ ব্যাপার। খুবই মন দিয়ে পড়ছি একেবারে শুরু থেকেই। কোনো কোনো পোস্টে হাসতে হাসতে মনের খিল পর্যন্ত খুলে যায়। আজকেরটা একটু টাইট ব্যাপার, খুবই কঠিন বিতর্কিত কান্ড। তবু আপনার লেখার গুণে পড়তে ভালো লাগে।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

সত্যপীর এর ছবি

সিরিয়াস লিখারই তো চেষ্টা করি ক্যান যে মানুষ খালি হাসে আমার লিখা পড়ে ইয়ে, মানে...

চরম উদাস ভাইয়ের মতন ঠিক করসি ট্যাগ দিব "গবেষণা", তাও যদি মানুষ এট্টু সিরিয়াসলি নেয়।

আফ্রিকার উপকথা আর নাই?

..................................................................
#Banshibir.

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

পড়ছি। ভিন্নভাবে চিন্তা করবার খোরাক পাচ্ছি। চলুক

সত্যপীর এর ছবি

ধন্যবাদ।

..................................................................
#Banshibir.

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

৫ম পর্বের অপেক্ষায় আছি। নিয়মিত পড়ছি।

সত্যপীর এর ছবি

ধন্যবাদ ভাইয়া। নিয়মিতই লিখার চেষ্টা করি।

..................................................................
#Banshibir.

সাই দ এর ছবি

পীরসাব - পলাশীর যুদ্ধ কবে আইব

সত্যপীর এর ছবি

নবাব জয়ের পর জয়ের মুডে আসে, আপনে পলাশীর দুঃখের কথা আনেন ক্যান? কয়দিন আরাম করুক নবাব, সামনেই দুর্যোগের ঘনঘটা!

..................................................................
#Banshibir.

দুর্দান্ত এর ছবি

কিন্তু উমিচাদ ইংরেজের বন্দী হল কিভাবে?

সত্যপীর এর ছবি

নবাব বাহিনী মার্চ করে আসার সময় কুঠিপ্রধান ড্রেক সায়েবের সন্দেহ হয় যে কোলকাতা শহরে নবাবের স্পাই আছে। জুনের ১৩ তারিখ একটা নৌকা ধরা পড়ে, ওতে পাওয়া যায় রাজারাম লিখিত উমিচাঁদের প্রতি পত্র। পত্রে সন্দেহজনক কিছু ছিলনা, জমিজমা নিয়ে কথা বার্তা। কিন্তু কোড ল্যাঙ্গুয়েজ সন্দেহ হওয়ায় ড্রেকের কুনজরে পড়ে উমিচাঁদ, তাকে দূর্গে আটক করা হয়। চুয়ান্ন ধারার মতন ব্যাপার, সন্দেহ হইসে তাই জেলে ভরো।

..................................................................
#Banshibir.

দুর্দান্ত এর ছবি

সিরাজ যে তিন পেটি রূপার গন্ধ পেয়ে ফোরট উইলিয়াম দখলে উদ্গ্রীব হল, সেটা কার?

যে উমিচাদ (আসলে আমীরচান্দ, শালার ব্রিটিশরা আমাদের বাল্ছাল কত কিছু শিখাইল!) কোম্পানির কাছে লাখ লাখ টাকা পায়, তার সাথে জগতশেঠ আর খাজা ওয়াজিদের সিরাজের অভিষেকের প্রাক্কালে কি জানি একটা লাফড়া হয়েছিল?

আমীরচান্দকে যদি ইংরেজরা এই টাইমে ৫৪ ধারায় বন্দী থাকে, তাহলে আবার তাকে দিয়েই নবাবের কাছে যুদ্ধবিরতির চিঠি লেখানোর জাস্টিফিকেশান কি? কোম্পানির যদি তাকে এতই সন্দেহই হয়, তাইলে ক্লাইভের লাল-সাদা চুক্তির খেলার দরকার কি ছিল? আমীরচান্দকে খরচ করে ফেললে কি হত?

বস আরেকটু ঘেঁটে দেখা যায়?

সত্যপীর এর ছবি

সিরাজ তিন বাক্স জহরতের গন্ধে দূর্গ দখল করেন বলে আমার মনে হয়নি। তবে দূর্গ দখলের পর মাত্র পঞ্চাশ হাজার রুপী পেয়ে তার চান্দি গরম হয়ে গিয়েছিল, আর ইংরেজ সিপাইদের কেউ তাকে বলে থাকবে যে হলওয়েল আগের দিন তাদেরকে তিন বাক্স জহরত বাঁটোয়ারা করে দেবার প্রতিশ্রুতি দ্যায়। ঐ শুনেই সিরাজ হলওয়েলকে তলব করে।

উমিচাঁদ (আমি এই নামেই থাকলাম সারা জীবন শুনে এসেছি চোখ টিপি ) জগতশেঠ খাজা ওয়াজিদ এই তিন সোনার চান নিয়ে ইন্টারেস্টিং একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম একটা আর্মানি ইতিহাস বইয়ে, আপনার লাফড়ার ব্যাপারটা ঐখানে কিছু ছিল। আবার পড়ে দেখতে হবে।

উমিচাঁদকে সন্দেহ করে বন্দী করে ড্রেক, সে ব্যাপক ঘাড়ত্যাড়া ছিল। ইচ্ছেমত মোগলাই ফরমান ব্যবহার করত এই লোক। খাজা ওয়াজিদ কেও লাথি দিয়ে দরজা থেকে হাঁকিয়ে দ্যায় এই ড্রেক। পরে ড্রেক সায়েব পিটটান দিলে হলওয়েল বাটে পড়ে সন্ধি করতে উদ্যোগী হয়, আর উমিচাঁদকে দিয়ে চিঠি লিখানোর ব্যবস্থা করা হয়।

তিন বাক্স জহরত আর উমিচাঁদ কোম্পানীর লাফড়া নিয়ে আরেকটু দেখি কিছু পাই কিনা।

..................................................................
#Banshibir.

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

তোমার অনুবাদ নিয়ে কোন কথা নেই। বরাবরের মত সুখপাঠ্য। হাসি

এবার একটু ইতিহাস নিয়ে কথা বলা যাক।

১৭৫৬ সালে সিরাজদ্দৌলার কলকাতা আক্রমণের সময় ‘অন্ধকূপ হত্যাকান্ডের’ গল্প তৈরি করা হয়। এ নিয়ে ১৭৬০ সালে জন জেফানিয়া হলওয়েল রাইটার্স বিল্ডিংয়ের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। পরে গর্ভনর জেনারেল হেস্টিংসের নির্দেশে সেটি ভেঙে ফেলা হয়।
১৯০২ সালে লর্ড কার্জন স্মৃতিস্তম্ভটি পুন:নির্মাণ করেন। ১৯৪০ সালে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে স্মৃতিস্তম্ভটির অপসারণ আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের ফলে ওই বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর স্মৃতিস্তম্ভটি সরিয়ে সেন্ট জর্জ চার্চের প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়। এখনও এই স্মৃতিস্তম্ভটি রয়েছে সেন্ট জর্জ চার্চের প্রাঙ্গণে।

ইতিহাসবিদ বিহারীলাল সরকার ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রথম যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ দিয়ে অন্ধকূপ হত্যার গল্পকে মিথ্যা প্রমাণ করেন।

এবার আসা যাক সিরাজের ইংরেজদের প্রতি বিদ্বেষ বা, নৃশংসতার দিকে:
ঔপনিবেশিক শক্তির বিজয়ী হওয়া এবং টিকে থাকার অনিবার্য উপায়টি হলো স্থানীয় শক্তির বা, ব্যক্তির চরিত্র হনন করা। অনেক ইউরোপীয়ানের সাথে সাথে কিছু ভারতীয়ও এই কাজটি করেছেন।
১৭৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সিরাজ ও ইংরেজদের মাঝে একটি শান্তিচুক্তি হয়। নবাবী নথি ছাড়াও খোদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বেঙল-কুঠির নথিরও বর্ণনা অনুসারে নবাব এ চুক্তিকে সম্মান করেছিলেন।
০১ মে, ১৭৫৭ সালে ফোর্ট উইলিয়ামে অনুষ্ঠিত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের ধারা বিবরণী থেকে জানা যায়, এই বৈঠকে সিরাজকে উৎখাতের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।
অনেক ভারতীয় ও ভারত বিদ্বেষী ঐতিহাসিক সিরাজের বিরুদ্ধে কাশিম বাজারে ইংরেজ নির্যাতনের অভিযোগ করে। অথচ, কাশিমবাজার অবরোধ করার পরও ইংরেজদের কোনো সম্পত্তি লুণ্ঠন কিংবা বিনষ্ট করার প্রমাণ নেই। খোদ ক্লাইভ এবং ওয়াটসনের দেয়া সাক্ষ্যও একথা প্রমাণ করে।
২১ জুন এক সরকারী ফরমানে সকল ব্রিটিশদের নগর ছাড়ার নিদের্শ দেয়া হয় কিন্তু ব্রিটিশ নথির বর্ণনা অনুসারে এতে কোন খারাপ সম্ভাষণ বা, হুমকি ছিল না।

সিরাজ নবাব হিসেবে অপদার্থ ছিলেন ঠিকই, মানুষ হিসেবেও অত ভাল ছিল না কিন্তু একজন মানুষের নেগেটিভ চরিত্র বর্ণনা করার সময় সে যতটুকু নেগেটিভ ততটুকুই বর্ণনা করাটাই বোধ করি ঠিক, এক্ষেত্রে বায়াসড হওয়া ঠিক হবে বলে মনে হয় না।
ব্রিটিশ কর্নেল ম্যালিসনের একটি উক্তি মনে পড়ে গেল, ‘এই মহানাটকের অভিনেতাদের মধ্যে সিরাজই একমাত্র ব্যক্তি যিনি স্বদেশের সাথে প্রতারণা করবার চেষ্টা করেনি।’
অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় বলেছিলেন, ‘সিরাজ অযোগ্য শাসক ছিলেন ঠিকই কিন্তু এর চেয়ে বেশি দুর্ভাগা ছিলেন তিনি।’

ইদানিং কিছু কিছু লেখকের প্রবন্ধে এমন নেগেটিভভাবে সিরাজকে উপস্থাপন করা হয় যে, সহজেই বলে দেয়া যায়, সিরাজের শাসক হিসেবে অযোগ্যতা নয় বরং মুসলিম পরিচয়টিই তাদের সিরাজ বিরোধিতার মূল কারণ। সেলুকাস!

পাদটীকা

  • ১. শত শত বছর ধরে ভারত উপমহাদেশে স্থায়ী বসতি স্হাপনকারী তুর্কি অথবা, মধ্য বা, পশ্চিম এশিয়ানদের আমি বিদেশী বলতে পারি না। আর মুসলমান হবার কারণে এদের বিদেশী প্রতিপন্ন করার সংকীর্ণ মানসিকতার ব্যাক্তি সচলে আছেন বলে আমার মনে হয় না।
আব্দুর রহমান এর ছবি

চলুক

------------------------------------------------------------------
এই জীবনে ভুল না করাই সবচেয়ে বড় ভুল

সত্যপীর এর ছবি

চমৎকার মন্তব্য।

অন্ধকূপ যে গল্প তা তো দেখলামই।

সিরাজ নবাব হিসেবে অপদার্থ ছিলেন ঠিকই, মানুষ হিসেবেও অত ভাল ছিল না কিন্তু একজন মানুষের নেগেটিভ চরিত্র বর্ণনা করার সময় সে যতটুকু নেগেটিভ ততটুকুই বর্ণনা করাটাই বোধ করি ঠিক, এক্ষেত্রে বায়াসড হওয়া ঠিক হবে বলে মনে হয় না।

অপদার্থ লোককে অপদার্থ বলা বায়াসনেস নয়। ধর টিপু সুলতানকে আমি মহামূর্খ বললাম, তাতে প্রমাণ হত আমি বায়াসড এবং রামছাগল। সিরাজ যা ছিল তাই বলছি। মহামূর্খ। আমাদের শাসক হিসেবে তাকে পাওয়া অতি দুর্ভাগ্যের কথা।

অনেক ভারতীয় ও ভারত বিদ্বেষী ঐতিহাসিক সিরাজের বিরুদ্ধে কাশিম বাজারে ইংরেজ নির্যাতনের অভিযোগ করে। অথচ, কাশিমবাজার অবরোধ করার পরও ইংরেজদের কোনো সম্পত্তি লুণ্ঠন কিংবা বিনষ্ট করার প্রমাণ নেই। খোদ ক্লাইভ এবং ওয়াটসনের দেয়া সাক্ষ্যও একথা প্রমাণ করে।

ঠিক কথা। এই বইয়েও দেখতে পাই নবাবী ফৌজ মহিলাদের গায়ে হাত দেয়নি বা লুটতরাজের সময় সব কল্লা নামিয়ে দেয়নি। তারা কন্ট্রোলেই ছিল।

ইদানিং কিছু কিছু লেখকের প্রবন্ধে এমন নেগেটিভভাবে সিরাজকে উপস্থাপন করা হয় যে, সহজেই বলে দেয়া যায়, সিরাজের শাসক হিসেবে অযোগ্যতা নয় বরং মুসলিম পরিচয়টিই তাদের সিরাজ বিরোধিতার মূল কারণ। সেলুকাস!

আমারে কইলা? বুঝিনাই। সে মুসলিম বলে আমি বিরোধিতা করব ক্যান? সে মহামূর্খ সেটাই আমার বিরক্তির কারন।

আর অফ টপিক, নামের শেষে উদ্দৌলা লাগালেই মুসলিম হয়? মদে চুর হয়ে হেরেমে রাত কাটায় ক্যামন মুসলমান?

..................................................................
#Banshibir.

আব্দুর রহমান এর ছবি

চলুক

------------------------------------------------------------------
এই জীবনে ভুল না করাই সবচেয়ে বড় ভুল

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

পীর,
একটু ভুল বুঝাবুঝি হল মনে হয়। চোখ টিপি

আমার প্রথম মন্তব্যর প্রথম লাইন দুটো তোমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছি আর বাকি মন্তব্যটি সিরাজ সর্ম্পকিত আলোচনা, সেখানে তোমাকে নয় বরং সিরাজকে নিয়ে লিখেছেন এমন ঐতিহাসিক ও বর্তমান যুগের প্রাবন্ধিকদের সিরাজ বিদ্বেষের উপর সামান্য আলোকপাত মাত্র।

আর, বায়াসনেসের ব্যাপারটিও তোমাকে বলিনি। হাসি

দুর্দান্ত এর ছবি

"এ নিয়ে ১৭৬০ সালে জন জেফানিয়া হলওয়েল রাইটার্স বিল্ডিংয়ের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন।"

১৭৬০ সালে কি রাইটারস বিল্ডিং বলে কিছু ছিল?

"সিরাজই একমাত্র ব্যক্তি যিনি স্বদেশের সাথে প্রতারণা করবার চেষ্টা করেনি।"

'স্বদেশের সাথে প্রতারণা' কি শুধু ইংরেজদের পক্ষে থাকলেই সম্ভব? সিরাজ তো গুজরাতি, আরমানি, ফরাসি, ওলন্দাজ সবার কাছেই বিক্রী হয়ে ছিল।

আরো বড় কথা, সিরাজের সময়ে জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেমের কোন ধারনা ছিল কি? 'দেশ-জাতি-রাষ্ট্র' ধারনাই যেখানে ছিলনা, সেখানে স্বদেশের সাথে প্রতারনা আসবে কোথা থেকে? ১৮ শতকে বাংলা দিল্লীর কলোনি, আর সেই কলোনির গভরনরগিরি (নবাবি) সিরাজ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করে হস্তগত করেছে। একই রকম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সে মরেছে, মীরজাফর তার জায়গায় এসেছে, পরে তাকে সরিয়ে এসেছে ইংরেজরা।

দালালদের ধারবাহিকতা থেকে সিরাজকে আলাদা করে ধরবো কেন?

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

রাইটার্স বিল্ডিং; হে হে। ১৭৬০ সালে ও নামে বিল্ডিং থাকবে কেন? আমি বর্তমান লোকেশন বুঝিয়েছি।

ব্রিটিশ কর্নেল ম্যালিসন উক্তিটির ইঙ্গিত পলাশী-কেন্দ্রিক অর্থাৎ সিরাজের নবাবীর শেষ থিয়েটার নিয়ে; আমার তাই মনে হয়েছে।

দিল্লী সালতানাত প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশের মানুষ নিজেদের ভারতবর্ষের মানুষ বলে পরিচয় দিত। (বায়ু পুরাণ)
ভারত উপমহাদেশের উত্তরাংশের মানুষরা নিজেদের "হিন্দুস্তানী" পরিচয় দেয়া শুরু করে দশম শতাব্দী হতে। দিল্লী সালতানাতের প্রতিষ্ঠার পর তা পুরো ভারত উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

২৯ ডিসেম্বর, ১৯৩০ সালের আগে কোন ভারত উপমহাদেশীয় ভারত উপমহাদেশকে ভেঙে আলাদা সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা বাসভূমির কথা চিন্তা করেছে কি? অর্থাৎ, এখন যেমন দিল্লী আমার কাছে পরভূমি, ১৯৪৭ এর আগে দিল্লী একজন সাধারণ ভারত উপমহাদেশীদের কাছে পরভূমি ছিল কি?

শুধুমাত্র বর্তমান যুগের জাতি-রাষ্ট্র ধারণার আলোকে/প্রেক্ষিতে চিন্তা করলে সে সময়ের জাতি-বাসভূমির ধারণা/বোধ অনুধাবণ করা যাবে কি?

দুর্দান্ত এর ছবি

২৯ ডিসেম্বর, ১৯৩০ সালের আগে কোন ভারত উপমহাদেশীয় ভারত উপমহাদেশকে ভেঙে আলাদা সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা বাসভূমির কথা চিন্তা করেছে কি? অর্থাৎ, এখন যেমন দিল্লী আমার কাছে পরভূমি, ১৯৪৭ এর আগে দিল্লী একজন সাধারণ ভারত উপমহাদেশীদের কাছে পরভূমি ছিল কি?

তাহলে আপনি বলছেন

১) শুঙ্গ, চোল, শতবাহন, কুশান
২) পাল-গুর্জার-রাষ্ট্রকূট-পল্লব-চালুক্য
৩) দিল্লি-বিজয়নগর-মালওয়া-গন্ডওয়ানা-বাংলা
৪) মারাঠা-মহিশুর-শিখ-রাজপুত-দুররানি
৫) বার্মা-বেঙ্গল-মাদ্রাজ-আসাম-সম্মিলিত প্রদেশ

এই বিভাজনগুলো কল্পিত? যুগে যুগে এইসব রাজত্ব-প্রদেশ-সুবাহ-প্রেসিডেন্সিতে বসবাসকারিরা নিজেদের আবাস্থলের বাইরেও একটি সম্মিলিত পরিচিতি বোধ করতো? যেখানে বর্ণপ্রথা, জবন-ম্লেচ্ছ, আশরাফ-আতরাফ, মীর্জা-খান-মোঘল এসব বিভাজন মোটামুটি জামাকাপড় দিয়ে আলাদা করে চেনার ব্যাবস্থা ছিল, সেখানে স্থানীয় রাজপুরুষের শুল্ক-এলাকার বাইরে আরেকটি কাঠামো কল্পনা কতটুকু কষ্টকর হতে পারে সেদিকে আর যাচ্ছিনা।

আপনি নিজেই টিপুর গল্প সবিস্তারে লিখেছেন। আপনার কি মনে হয়, টিপু-শিবাজি-আলিবর্দি-ফররুখসাইয়ার এরা নিজেদের কোনভাবে একটি এককের অংশ ভাবতো? সিরিয়াসলি?

দিল্লী সালতানাত প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশের মানুষ নিজেদের ভারতবর্ষের মানুষ বলে পরিচয় দিত। (বায়ু পুরাণ)

এই সেই খড়, যেটা উটের পিঠ ভাংতে পারে। আপনি ইতিহাসের আলোচনায় পুরানের সুত্র দিচ্ছেন কি ভেবে?

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

একজন চট্টগ্রামবাসীকে কোন বাংলাদেশী যদি প্রশ্র করে আপনার দেশ কোথায়? উত্তর দেবেন: চাঁটগা। সেই ভদ্রলোককে কোন চাইনীজ যদি প্রশ্ন করে আপনার দেশ কোথায়? উত্তর দেবেন: বাংলাদেশ।
বিষয়টি বুঝাতে পারলাম কি?

দশম শতাব্দীতে আল বোগদাদীর লিখা "তারিখ বাগদাদ" বইতে দেখতে পাই- এক ব্যবসায়ীর সাথে বাগদাদে আল বোগদাদীর দেখা হয়। লোকটির মাথায় বাবরী চুল, লাল রঙের পাগড়ি, ইয়া বড় গোঁফ, দাঁড়ি নেই। বোগদাদী প্রশ্ন করেন, কোথাকার কাফেলা? লোকটি জবাব দেয়- হিন্দুস্তান। বোগদাদীর সাথে ভারতীয় ব্যবসায়ীটির ঘনিষ্টতা গড়ে উঠে। বোগদাদী হিন্দুস্তান নিয়ে অনেক কিছু জানতে চান। একদিন কথা প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীটি বোগদাদীকে বলেন, আমরা হিন্দুস্তানীরা আমাদের দেশকে বলি ভরতবর্ষ(Bhorot Brosho, মূল আরবীর ইংরেজী)। বোগদাদীর সাথে লোকটির আরো কথোপকথনে আমরা জানতে পারি, লোকটির নাম গুরজার সিং সূর্যবংশী (Gurjar Singh Suryavanshi) এবং হিন্দুস্তানে তার বংশীয়/গোত্রীয় লোকেদের 'আভিরা' (অর্থাৎ, গুরজার একজন অহির গোত্রীয় রাজপুত) বলা হয়।

টিপুকে নিয়ে গল্প লিখছিনা তো মশাই। আমি তো ইতিহাস চর্চা করছি। আপনার যদি কোন অংশ গল্প মনে হয়, তাহলে তা কোট করে দেখাতে পারেন। হাসি

রাজনৈতিকভাবে এক অংশ নয় কিন্তু ভূতাত্ত্বিক পরিচয়ে ভারতবর্ষের লোকেরা নিজেদের এক ভূমির মানুষ ভাবত। আমি প্রমাণ দিয়েই কথাটি বললাম। আর একই ভূতাত্ত্বিক পরিচয়ের মানুষদের রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা হতে পারে বৈ-কি। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম কিংবা, নব্বইয়ের দশকের চট্টগ্রাম প্রজাতন্ত্রের ধারণা ও প্রয়াসকে এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। এই দুটো ধারণার কোনটি যদি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে, এর মানুষদের ভারত উপমহাদেশ বা, বাংলা অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক পরিচয় হতে বের করে দেয়া যায় কি?
রাজনৈতিক ও ভূতাত্ত্বিক পরিচয়কে এক করে দেখাটা ঠিক হবে না।

বায়ু পুরাণ তো আজকের রচনা নয় মশাই। বহু পুরনো রচনা। ইতিহাসমতে, পুরাণগুলো লিখা হয়েছে খ্রীস্টপূর্ব ২০০০-১৫০০ অব্দের দিকে। সেই সময়ের রচনাতেও ভারত উপমহাদেশকে ভারতবর্ষ সম্বোধন করা হয়েছে। ধর্মগ্রন্থ হলেও আমরা ২০১১ সালে এসে যে ভূমিটিকে ভারতবর্ষ বলছি, সেটাকে আজ থেকে প্রায় ৩৫০০ বছর আগেও ভারতবর্ষ ঢাকা হতো, পুরাণের রচয়িতারা অন্তত: সে নামেই জানতো, এটি তো প্রমাণ হয়। বিষয়টি বুঝাতে পারলাম কি?

দুর্দান্ত এর ছবি

"দশম শতাব্দীতে আল বোগদাদীর লিখা "তারিখ বাগদাদ" বইতে দেখতে পাই- এক ব্যবসায়ীর সাথে বাগদাদে আল বোগদাদীর দেখা হয়। লোকটির মাথায় বাবরী চুল, লাল রঙের পাগড়ি, ইয়া বড় গোঁফ, দাঁড়ি নেই। বোগদাদী প্রশ্ন করেন, কোথাকার কাফেলা? লোকটি জবাব দেয়- হিন্দুস্তান। বোগদাদীর সাথে ভারতীয় ব্যবসায়ীটির ঘনিষ্টতা গড়ে উঠে। বোগদাদী হিন্দুস্তান নিয়ে অনেক কিছু জানতে চান। একদিন কথা প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীটি বোগদাদীকে বলেন, আমরা হিন্দুস্তানীরা আমাদের দেশকে বলি ভরতবর্ষ(Bhorot Brosho, মূল আরবীর ইংরেজী)। বোগদাদীর সাথে লোকটির আরো কথোপকথনে আমরা জানতে পারি, লোকটির নাম গুরজার সিং সূর্যবংশী (Gurjar Singh Suryavanshi) এবং হিন্দুস্তানে তার বংশীয়/গোত্রীয় লোকেদের 'আভিরা' (অর্থাৎ, গুরজার একজন অহির গোত্রীয় রাজপুত) বলা হয়।"

মধ্য়প্রাচ্য়ের বাচ্চাগিরি সংক্রান্ত কেলেন্কারির ইতিহাসে আল-বাগদাদির নাম বেশ উজ্জল অক্ষরে লেখা আছে। তিনি নিজে ভুজুং ভাজুং হাদিছের সংগ্রাহক হলেও ইতিহাস রচয়িতা (ঐতিহাসিক নয়) হিসাবে তার বিশেষ সুখ্য়াতি আছে বলে পড়িনি। তার এই এনকাউন্টার অব এন ইন্ডিয়ান গল্পটা আমি সবিস্তারে পড়তে চাই। দয়া করে বইয়ের হদিস দিলে বাধিত হব। কিন্তু 'গুরজার সিং সুরযবংশি' কারো নাম ভাবা আর 'চাকমা চৌধুরী তান্ত্রিক' অথবা 'আহমদিয়া খান পাঠান' কে কারো নাম মনে করা একই রকম কিছু। এই বিষয়টা যুগে যুগে বদলে যাবার কথা না।

"বায়ু পুরাণ তো আজকের রচনা নয় মশাই। বহু পুরনো রচনা। ইতিহাসমতে, পুরাণগুলো লিখা হয়েছে খ্রীস্টপূর্ব ২০০০-১৫০০ অব্দের দিকে।"

পুরাতন হয়েছে বলেই সেগুলো ইতিহাসগ্রাহ্য় হয়ে গেছে?

আলোচনা হচ্ছিল উপমহাদেশের সবাই একটি এককের অংশ ভাবতো কিনা। বাইরের লোক মানে মোঘল, আরব, ইউরোপিয়দের কাছে তো ভারত একটি একক। উপনিবেশের ইতিহাস আমাদের মাথায় সেই একক ধারনাটিই বসিয়ে দিয়েছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সেই একক ধারনাটি সাহায্য় করেছে। সেখানে আল খতিব আর বাগদাদীর কাছে একজন হিন্দুস্তানি নিজের দেশ বলতে হিন্দুস্তান/ভারতবরষ গুলিয়ে ফেলেছে আর তাতে করে বাংলা-বিহার-উরিষয়াও সেই হিন্দুস্তান/ভারতের অংশ হয়ে গেল?

আপনি আমাকে দেখান যে পাল, গুপ্ত, সেন, চন্দ্র, আরাকান, ত্রিপুরা, মারাঠা, কামরুপ, বারো ভূইয়াদের কেউ কোনদিন নিজেকে ভারতবরষ নামক একটি এককে নিজেদের পরিচিত করতো কিনা।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

Tarik Baghdad: The History of Baghdad.
by Al Khatib Al Baghdadi.
Translated by Hisam Al Saher.
Publication: 1972.
Al Hilal Publication.

"সিং সূর্যবংশী" রাজপুতদের অহির গোত্রীয় নাম।

পুরাণের রেফারেন্স টানার কারণ ছিল, "ভারতবর্ষ" শব্দটির প্রয়োগের প্রাচীনত্য দেখানোর জন্য।

শেষ অংশের জবাব একটু পরে দিচ্ছি।

একটি প্রশ্ন ছিল:
আপনি বারো ভূঁইয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বারো ভূঁইয়ার নাম নিলে ইসা খানের কথা চলে আসে। বারো ভূঁইয়াদের মাঝে ইসা খানদের কি আপনি এদেশীয় ধরছেন নাকি বিদেশী হিসেবে গণ্য করছেন? আপনার সাথে আলোচনার সুবাদে যতটুকু আপনাকে বুঝেছি, ওদের আপনি বিদেশী হিসেবে গণ্য করার কথা। তারপরও ওদেরকে এই অংশে এসে স্বদেশী ভাবলেন?

দুর্দান্ত এর ছবি

ইসা খাঁকে নিয়ে আমার জানাশোনা সীমিত। যতটুকু জানি, তাকে কররানিরা তুরান থেকে তুলে নিয়ে আসে, ক্রমে সে স্থানীয় প্রভাবশালিতে পরিনত হয়। আপনার কি মনে হয়, ইসা খাঁ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জোশ থেকে মোঘলদের সাথে যুদ্ধ করেছিল?

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

বর্তমানের জাতীয়তাবাদের চেহারা বা, ধারণার আলোকে সেই যুগের এই চেতনার তুলনা খুঁজলে আমার এখানে কিছু বলার থাকে না।
জাতীয়তাবাদের সহজ অর্থ হল নানান দৃষ্টিভঙ্গি হতে কতিপয় মানুষের একক পরিচয়বোধ ও দলবদ্ধ থাকার চেতনা। এই দৃষ্টিভঙ্গি সংস্কৃতিভিত্তিক হতে পারে, হতে পারে ভাষাভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক, অঞ্চলভিত্তিক, রাজনৈতিক ও ভূতাত্ত্বিক চেতনার উপর ভিত্তি করে।
ভারত উপমহাদেশের লোকেরা ভূতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ভিত্তিতে বহু প্রাচীনযুগ হতে নিজেদের ভারতবর্ষ/হিন্দুস্তানের মানুষ হিসেবে পরিচিত হত। আঞ্চলিক পরিচয়বোধের সাথে বিশাল ভূতাত্ত্বিক পরিচয়বোধ মিলিয়ে ফেললে আমার কিছু বলার থাকে না। সেক্ষেত্রে খোদ বর্তমানের বাংলাদেশকে নিয়েই চিন্তিত হতে হয়- পাহাড়ী, উপজাতি, চাঁটগাইয়া ও সিলোটী।
ভারতে স্থায়ী বসতি স্থাপনকারী মুঘলরা ভারতবর্ষের বিদেশী জাতিসত্তা নয়। মুঘল শাসনামলকে ঔপনিবেশিক শাসনামলও বলা চলে না। ভারতে আগমনকারী ও স্থায়ী বসতিস্থাপনকারী মুঘলরা ভারতবর্ষে কোন কলোনী স্থাপন করেনি। অন্যথায়,আপনার সাথে একমত হলে বলতে হবে, পৃথিবীর সব জাতিই কলোনিস্ট।
ইসা খাঁ বা, বাংলার বারো ভূঁইয়াদের কেউই ভারতবর্ষব্যাপী কোন ফিগার হতে পারেননি। এঁনারা ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ফিগার। দিল্লীর মুঘলদের সাথে যুদ্ধে ভারতবর্ষীয় চেতনা কাজ করবে কেন? আঞ্চলিক যুদ্ধে এই চেতনা আসার কথা নয়।
আপনি বর্তমানের জাতীয়তাবাদের চেতনা/ধারণার সাথে সেই যুগের এই জাতীয় চেতনাকে এক করে ফেলছেন। আজকের জাতীয়তাবাদের চেতনার সাথে সে যুগের এই ধরণের চেতনার মিল থাকা অসম্ভব।
আমার বক্তব্যর সারমর্ম দুটো:
০১। ভারতবর্ষে স্থায়ী বসতি স্থাপনকারীদের কাউকেউ বিদেশী বলে ট্যাগিং করা যায় না।
০২। বহু প্রাচীন সময় হতে ভারত উপমহাদেশের মানুষরা ভূতাত্ত্বিক পরিচয় হিসেবে নিজেদের ভারতবর্ষের মানুষ ও পরবর্তীতে হিন্দুস্তানী হিসেবে পরিচয় দিত।
আর দুটো বিষয়:
ক) বোগদাদীর সাথে ওই রাজপুত ব্যবসায়ীর সাক্ষাতে সময়কাল দশম শতাব্দী। গুরজার যে অংশের রাজপুত ওই অঞ্চলে তখনও মধ্য/পশ্চিম এশিয়ানদের আগমন ঘটেনি। তাই, তার উপর আপনার বর্ণিত চাপিয়ে দেয়ার ট্যাগিংটা প্রযোয্য হয় না।
খ) ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে এর মানুষরা নিজেদের মাঝে আঞ্চলিক পরিচয় বহন করবেও বিদেশীদের কাছে ভারতবর্ষ পরিচয় প্রকাশ পাবে এটাই তো স্বাভাবিক, তাই নয় কি?

দুর্দান্ত এর ছবি

"গুরজার যে অংশের রাজপুত ওই অঞ্চলে তখনও মধ্য/পশ্চিম এশিয়ানদের আগমন ঘটেনি।"

তাহলে আপনি নিশ্চিত যে 'গুরজার' রা সাদা-হুনদের সাথে উত্তর দিক থেকে সিন্ধু অববাহিকা বেয়ে দক্ষিনে আসেনি। দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে এই এবং এই বইগুলো আপনার সাথে দ্বিমত পোষন করে।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে আপনার অবস্থান বেশ পোক্তভাবে উপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদি ঘরানার ইতিহাস প্রভাবিত। তাতে দোষের কিছু নেই। আমার অবস্থান হল মহা/রাজপুরুষের ইতিহাস আমাদের বিভ্রান্ত করে। ৪৭ এর আগে লেখা ভারতের বেশীরভাগ ইতিহাস ও সেইসব পুরাতন মদ ভরা নতুন বোতলগুলোতে এসব ভারসাম্য় আশা করতে পারিনা। স্পনসরড সাহিত্য়ে করপোরেশানের ব্রান্ড তো থাকবেই।

আধুনিক লেখকদের লেখা উপনিবেশউত্তর বা গণইতিহাস (সাবঅল্টারন?) ঘরানার ইতিহাস পড়ে দেখতে পারেন। রামসরন শরমা, রমিলা থাপর , ইরফান হাবিব এরা ম্য়াক্স মুলার, মিলার ও তাদের অনুসারীদের চাইতে ভিন্ন চোখে উপমহাদেশের ইতিহাসকে দেখতে চেয়েছে। আপনি তাদের কিছু লেখা পড়ে দেখতে পারেন। উপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদি ঘরানার চাইতে উপনিবেশোত্তর ঘরানা কোনভাবে বেশী সঠিক বা উন্নত সে ব্য়াপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে এই ঘরানার ঐতিহাসিকেরা ক্ষমতার কেন্দ্রের সভাকবিত্ব গ্রহন করেনি বলে আমার মনে হয়।

চলুন আমরা একমত হই যে, আমাদের একমত হওয়ার কোন বাধ্য়বাধকতা নেই। ভারতীয় পরিচিতির ক্রমবিকাশের উপরে কোনদিন সবিস্তারে পোস্ট করেন, সেখানে আবার কথা হবে। ভাল থাকুন।

আজকে হাটের বেলা চলে যাচ্ছে।

মন মাঝি এর ছবি

রাজাভাই, কয়েকটা কৌতুহল জেগে উঠল আপনার মন্তব্যে। স্বল্প জ্ঞান বিধায় প্রশ্নগুলি সংক্ষেপে করা সম্ভব হল না কিছুতেই, কিন্তু খুবই আগ্রহের বিষয় বলে না করেও সামলাতে পারলাম না। আর প্রশ্নের ফাঁকে ফাঁকে হয়তো নিজের কিছু সিদ্ধান্তসূচক মতামত চলে আসতে পারে, কিন্তু সেগুলিও মোটেই চূড়ান্ত কিছু নয়, এবং এগুলি সব প্রশ্নই আসলে --

১। বোগদাদীর প্রশ্নের উত্তরে গুরজার সিং যখন বলল যে তার দেশের নাম "ভরতবর্ষ", তখন কি তার মনে ভারতের সেই ম্যাপই ছিল যে ম্যাপ এখন আমাদের মনে জেগে উঠে 'ভারত' বা 'ভারতীয় উপমহাদেশ' কথাগুলি উচ্চারন করলে? এ কথাটা জিজ্ঞেস করছি একারনে যে, আমি কোথাও বোধহয় পড়েছিয়াম যে মহাভারতের যুগে ভারতবর্ষ বলতে আসলে আযোধ্যা ও তার আশেপাশের একটা সীমিত অঞ্চলকেই শুধু বোঝাত। এটা যদি ঠিক হয়, তাহলে বুঝা যায় যে "ভারতবর্ষ"-এর ধারনা একেক যুগে একেক রকম ছিল সাধারন মানুষের মনে (সবার মধ্যে হয়তো সেটা ছিলও না আদৌ) এবং সেটার সাথে এখনকার কোন "ভারতীয় উপমহাদেশিকতাবোধ"-জাতীয় কন্সট্রাক্ট বা আইডিওলজিকাল সাব্জেক্টিভিটি বা প্রচলিত "ভারতীয়"-ধারণার সমীকরণ টানা চলে না, বা শব্দগত মিল থাকলেও দুটোকে এক জিনিষ বলা চলে না। এখন আমরা যে ভারতীয় (দেশ বা উপমহাদেশ) ম্যাপ আকি - ভূতাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক, সেটা সেযুগের কারও বা তখনকার শত-সহস্র সমস্ত জাতিগোষ্ঠীর (এখনকার ম্যাপ অনুযায়ী) মানসে চাপিয়ে দিলে কি সঠিক হবে - যেটা আসলে সেখানে ছিল না? শুধু নাম বা শব্দগত মিল থেকে কি কনসেপ্ট, আইডেন্টিটি ও কনসেন্সাসের ধারাবাহিকতা ও সমতা প্রমান হয়? আমার তো মনে হয় আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে আমি উলটো উদাহরন দেখাতে পারব বাস্তব ইতিহাস থেকে। এই একই কথা 'হিন্দুস্থানী' কথাটার বেলাও কমবেশি প্রযোজ্য। আপনার কি মনে হয়?

২। বিদেশে গিয়ে মানুষ অনেক সময় বিদেশিদের কাছে নিজের জাতীয় এমনকি রাষ্ট্রীয় পরিচয় পরিষ্কার করতে অসুবিধায় পড়ে, কারন ঐ বিদেশির কাছে তার পরিচয়ের লেবেলটা পূর্বপরিচিত নাও হতে পারে। এই অসুবিধায় সাধারনত ক্ষুদ্রতর জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের পড়তে হয়, যারা হয়তো আন্তর্জাতিক ভাবে তেমন পরিচিত নয়। তখন তাদের বিদেশিদের কাছে পরিচিত কোন বড় লেবেলের সাথে নিজেকে সম্পর্কযুক্ত করে বা রেফারেন্স টেনে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে হয়। এই ব্যাপারটা এমনকি এই ২১শ শতাব্দীতেও হতে পারে। আমার নিজেরই একটা অভিজ্ঞতার উদাহরন দেই। আমি ২০০৭ সালে মিশরে গিয়ে সাধারন মিশরীয়দের প্রশ্নের উত্তরে 'বাংলাদেশি' পরিচয় দিয়ে অনেক সময় বুঝাতে পারিনি - এটা খায় না পিন্দে! (তারা কিন্তু 'ইন্ডিয়া' কি তা চিনে)। আপনার শুনতে খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু এটা সত্যি। এমন অভিজ্ঞতা আমার অন্য দেশেও হয়েছে। তখন আমাকে তাদের বোঝানোর জন্য বলতে হয়েছে যে, 'বাংলাদেশ' 'ইন্ডিয়া'-র এক কোনায় ভিন্ন একটা দেশ, যাকে আমরা ঐ দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশিরা এবং অন্যরা 'বাংলাদেশ' নামে ডাকি! ওরা কি বুঝেছে কে জানে। এতে কি বুঝা যায় যে আমি নিজেকে 'ভারতীয়' মনে করি বা বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়া এক দেশ, এক জাতি বা এক রাষ্ট্র? বোগদাদীর রিপোর্টেড ডায়ালগ থেকে আমার তো মনে হচ্ছে গুর্জার মিয়ারও আমার মতই অবস্থা হয়েছিল অনেকটা (এবং আমার চেয়ে ১০ম শতাব্দীর ঐ মানুষটাকে অনেক বেশি ল্যাটিচ্যুড দেয়া যায়)। ১০ম শতাব্দীর মধ্যপ্রচ্যের আরব মুসলমানদের কাছে হয়ত ভারতবর্ষের (এখনকার অর্থে) তথা সিন্ধুনদের ওপারের লোকেরা এক ধারসে 'হিন্দুস্থানী' নামে পরিচিত ছিল (সিন্ধুনদ থেকেই কি এর এপারের লোকেদের পরিচয় বিদেশি মানসে 'হিন্দুস্থানী' নামক ব্ল্যাঙ্কেট টার্মে রূপধারন করেনি?) , আর গুর্জার সিং হয়তো আমার মতই বিদেশিদের পরিচিত নামটা ব্যাবহার করেই নিজের আঞ্চলিক পরিচয়টা পরিষ্কার করতে চাচ্ছিল। এখানে দুটি প্রশ্ন জাগে, গুর্জার সিং 'ভরতবর্ষ' বলতে কি বুঝাতে চাচ্ছিল - এখনকার ডেফিনিশন অনুযায়ী ভারত, 'ভারতীয় উপমহাদেশ', নাকি তার চেনাপরিচিত উত্তর বা মধ্য ভারতের কোন একটা অঞ্চলকে যাকে বড়জোর এখনকার ভারত রাষ্ট্রের কোন একটা প্রদেশের সমান বলা যেতে পারে - তেমন কোন এন্‌টিটিকে বুঝাতে চাচ্ছিল? ২য়টাই আমার কাছে অন্তত অনেক বেশি সম্ভাব্য মনে হচ্ছে। আপনার কাছে কি উলটো প্রমান আছে? তাছাড়া, মধ্যযুগীয় মুসলমানদের ভারত জ্ঞানের অন্যতম উৎস আলবেরুনী কিন্তু উত্তর ভারতের অতি সামান্য কিছু জায়গা দেখেই পুরো ভারতবর্ষ সম্পর্কে অনেক বড় বড় জেনারালাইজড কথা বলে ফেলেছিলেন যা মোটেই সঠিক ছিল না। গ্রীক ও অন্যরাও এমন অনেক কিছু বলেছে যার সব ঠিক ছিল না। সুতরাং 'হিন্দুস্থানী' কথাটাও যথেষ্ট প্রবলেম্যাটিক।

৩। সুদুর অতীতে একজন মাত্র বিদেশি মানুষের সাথে আরেক জন মাত্র বিদেশি মানুষের বিদেশি মানুষকৃত "রিপোর্টেড" ডায়ালগের ভিত্তিতে কি লক্ষ বা কোটি মানুষের 'জাতীয়তাবোধ" সম্পর্কে কিছু বলা যায়, যদি না বক্তা ও লেখক/দের নিজ নিজ মানসে তাদের 'ফ্রেইম অফ রেফারেন্স' সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট বা যুক্তিসঙ্গত বাস্তবসম্মত ধারনা না থাকে? তাদের মধ্যে যে মিসকমিউনিকেশন হয়নি তা আমরা কিভাবে নিশ্চিত হব? এই মিসকমিউনিকেশন বা গ্যাপের কারনে ইতিহাসের জনক হেরোডোটাসের লেখায় আমরা ভারত সম্পর্কে অনেক আজগুবি কথা পাই।

৪। লক্ষ বা কোটি মানুষের 'জাতীয় আত্নপরিচিতিবোধ' সম্পর্কে কোন প্রামান্য বিশ্লেষন কি একটি মাত্র মানুষের অন্য হাত ঘোরা রিপোর্টেড ডায়ালগের ভিত্তিতে করা সম্ভব? কয়টা এবং কি ধরনের রেফারেন্স লাগবে এমনকি কোন অনুমানের জন্যেও? গুর্জার সিং-এর রিপোর্টেড বক্তব্য তর্কের খাতিরে যদি সত্য ও সঠিক (আধুনিক বা তৎকালীণ যে কোন অর্থে) বলে ধরেও নেই, তাহলেও কি বলতে পারব যে তার সংখ্যাগরিষ্ঠ, এমনকি একজনও, স্বদেশবাসী (আধুনিক বা তখনকার যেকোন ম্যাপের অর্থেই) তার সাথে সহমত ছিল? নাকি জাতীয় পরিচয়বোধের ক্ষেত্রে ঐক্যমত্যের কোন প্রয়োজন নেই? একজনের বক্তব্যই যথেষ্ট? ভিন্নমতের কোন লেজিটিমেসি নাই এক্ষেত্রে, কিম্বা মানুষের 'আইডেন্টিটি' জিনিষটা মতের উর্ধ্বে প্রাকৃতিক বা অন্য কোন ভাবে 'ফিক্সড' একটা বিষয় যে মতামতের কোন প্রাসঙ্গিকতা নাই ?

৫। আমরা জানি জাতীয় পরিচয়বোধ জিনিষটা বাস্তবে একটা দেশের ক্ষমতাবান প্রভাবশালি ক্ষুদ্রতর এলিট শ্রেণী বা তাদের প্রসাদপুষ্টরাই আসলে প্রোমোট ও আর্টিকুলেট করে ও করতে পারে নিজেদের স্বার্থ ও বায়াসের দৃষ্টিকোন থেকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষমতা বা এলিটত্ব-বহির্ভূত আম-মানুষের সেটার ফ্রেইমিং বা আর্টিকুলেশনে ততটা সুযোগ থাকে না - অনেক সময় এলিট-আরোপিত সংজ্ঞা মেনে নিতে বাধ্য বা বিভ্রান্ত হতে হয়, অনেক সময় দ্বিমত (সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও)-প্রতিরোধ চাপা পড়ে যায়। এযুগে তাও ঐক্যমত্য আদায়ের নানারকম কায়দাকৌশল আছে ও লাগে পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থা ও অধিকতর সচেতনতার জন্য - কিন্তু তাও শেষ পর্যন্ত সেটা এলিট আর্টিকুলেশনই থেকে যায় অনেকখানি এবং কতটা আমমানুষের ইচ্ছা ও স্বার্থের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করে বলা কঠিন। সেখানে হাজার বছর আগে সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক/রাজতান্ত্রিক ও ব্রাম্মন্যবাদী যুগের কোন সম্পুর্ণ অত্যন্ত ক্ষুদ্র এলিট ফ্রেইমড বা আর্টিকুলেটেড পরিচয়বোধ-এর তৎকালীণ সর্বজনীন বাস্তবতা ও বর্তমানকালের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অধীনে তার বর্তমান বাস্তবতা, প্রাসঙ্গিকতা ও বৈধতা কতটুকু?

৬। আপনি বলছেন,

রাজনৈতিক ও ভূতাত্ত্বিক পরিচয়কে এক করে দেখাটা ঠিক হবে না।

- এটা কি সম্ভব? রাজনৈতিক পরিচয়-বিযুক্ত 'ভূতাত্ত্বিক পরিচয়' বলে কি আসলে কিছু আছে? মানুষ বা তার পরিচয় কি উদ্ভিদ বা খনিজ জাতীয় কোন পদার্থ বা ভূতাত্ত্বিক কোন বৈশিষ্ট্য যে কোন একটা নির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল ছাড়া তাকে পাওয়া যায় না এবং ওভাবেই তাকে ক্লাসিফাই করতে হবে? পরিচয় কি মাটি ফুড়ে বেরোয়?
কিম্বা অন্যভাবে বললে, এটা কি অনেকটা 'সোনার পাথরবাটি'-র মত একটা বিষয় হয়ে গেল না? কারন আমি যদ্দুর বুঝি, "পরিচয়" (মানুষের) জিনিষটাই বাই ইটসেলফ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক, কারন এটা হচ্ছে মানুষে-মানুষে (ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত উভয় মাত্রাতেই) সম্পর্ক ও সে সম্পর্কের পারসিভড ফ্রেইমওয়ার্কে তাদের আপেক্ষিক অবস্থান সম্পর্কে তাদের পারসেপশন। একদম পুরাই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপার। এখান থেকে রাজনীতিটা বাদ দিলে মানুষের পরিচয় কি আর 'পরিচয়' থাকে, নাকি মানুষ একটা ভূতাত্ত্বিক ফিচারে পরিণত হয়? প্রশ্নটা বুঝাতে পারলাম কি? না পেরে থাকলে, আপনার নিজের মন্তব্যের শুরুতে নিজের উদাহরনটাই দেখুন না আরেকবার। আপনার উদাহরনের চট্টগ্রামবাসী একবার নিজের দেশ বলছে 'চট্টগ্রাম', আর আরেকবার 'বাংলাদেশ'। এই 'চট্টগ্রাম' আর 'বাংলাদেশ' কিন্তু "পলিটিকাল এন্‌টিটি" বা "রাজনৈতিক সত্তা" (চট্টগ্রামকে হয়তো এডমিনিস্ট্রেটিভ এনটিটি বলা যায়, কিন্তু সেটাও বৃহত্তর পলিটিকাল এনটিটিরই অংশ হিসেবে), কিন্তু ভূতাত্ত্বিক ফিচার বা এন্‌টিটি নয় কিছুতেই। আর আপনার উত্তরদাতাও কিন্তু একটা রাজনৈতিক চিন্তাকাঠামোর অধীনে মানুষের সাথেই রিলেট করে নিজের পরিচয় দিচ্ছে, ভূতত্ত্বের সাথে নয় (নইলে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ অনুযায়ী দিত) - একবার সে ঢাকাবাসী মানুষের সাথে নিজের আপেক্ষিক সম্পর্ক ও অবস্থান নির্নয় করছে আরেকটা রাজনৈতিক-প্রশাসনিক এককের মাধ্যমে, আরেকবার সে একই জিনিষ নির্ণয় করছে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্পর্কের কাঠামোতে "বাংলাদেশ"-নামক আরেকটা আপেক্ষিক "রাজনৈতিক সত্তা"-র লেবেলের মাধ্যমে। এগুলির কোনটাই ভূতাত্ত্বিক বা অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের মত অপরিবর্তনীয়ও নয়। এই একই লোক একই ভূতাত্ত্বিক (ভৌগলিক?) অবস্থানে থেকেই ১৯৭১-এর আগে (৪৭-এর পরে) চায়নিজের প্রশ্নের উত্তরে বলত - 'পাকিস্তানী', আর কয়েকশ বছর আগে মোগল আমলের কোন এক পর্যায়ে ১ম প্রশ্নের উত্তরে বলত 'ইসলামাবাদী' বা অন্যকিছু আর চায়নিজের উত্তরে কি বলত খোদাই মালুম (আমি জানি না এই মুহূর্তে)। কয়েকশ' বছর পর কি বলবে তাও আমি নিশ্চিত জানি না - আরাকানবাসী, বার্মিজ, ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশি, চট্টগ্রামী? কিম্বা বিশ্বমানব, বা স্রেফ মানুষ? তার 'ভূতাত্ত্বিক' বা ভৌগলিক অবস্থান একই থাকা সত্ত্বেও এর যেকোন বা অন্য কোন উত্তর তার কাছ থেকে আসা মোটেই অসম্ভব নয়। মোদ্দা কথায় 'পরিচয়' জিনিষটা প্রায় পুরাপুরিই মানুষে-মানুষে আপেক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপার, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপার, পারসেপশনের ব্যাপার। 'রাজনীতি' এর সাথে অবিচ্ছেদ্য। এবং এর কোনটাই অপরিবর্তনীয়, চিরস্থায়ী, বা ধ্রুব কোন বিষয় নয়। বা ভূতত্ত্ব বা ভৌগলিক অবস্থানের মত নয়। তাই হাজার বছর আগে কি রাজনীতি, সংস্কৃতি আর বিভিন্ন শ্রেণী ও গোষ্ঠীর মধ্যে কি ক্ষমতাকর্তৃত্বস্বার্থ-সম্পর্কের ভিত্তিতে কোথায় কার কি 'আপেক্ষিক পরিচয়চেতনা' বা তার 'লেবেল' ছিল বা গড়ে উঠেছিল - তা আমার কাছে বর্তমান যুগে মোটেই প্রয়োজনীয় বলে মনে হচ্ছে না। গুর্জার সিং-এর 'ভরতবর্ষের' ক্ষেত্রে সেটা যেমন সত্য, সত্যপীরের সিরাজুদ্দৌলার সিরাজীবাদের ক্ষেত্রেও সেটা সত্য। এগুলি থেকে আমরা অন্য শিক্ষা হয়তো নিতে পারি, কিন্তু এগুলিকে আমার নতুন কোন 'বাংলাদেশিত্ব' বা 'উপমহাদেশিকতাবাদ'-এর যোগ্য জনক বা পূর্বপুরুষ বা উদাহরন বলে মনে হচ্ছে না।

আপনার কি মনে হয়? আমি কি ভুলভাবে চিন্তা করছি?

ডিসক্লেইমারঃ সত্যপীরের পোস্টে এত অফটপিক বিশাল মন্তব্যের জন্য দুঃখিত। আর আমার কোন মন্তব্য বা টোনে কেউ আহত বোধ করলেও অগ্রিম দুঃখপ্রকাশ করছি। এরকম কিছু হলে তা ডেলিবারেট নয়, এটুকু আশ্বস্ত করতে পারি।

****************************************

ইয়াসির এর ছবি

শুরু থেকে পড়ে আসতে হত। পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

মন মাঝি এর ছবি

ইতিহাস ও ইতিহাস-আলোচনায় বায়াস নিয়ে এইসব আলোচনা আর বিতর্কে একটা জিনিষ কেন জানি মনে হয় আমরা ভুলে যাই (বা নিজেদের বর্তমানের বায়াস, এজেন্ডা, আইডেন্টিটিকে এমন অতীতে প্রজেক্ট করি যা ওখানে আদতে হয়তো ছিল না) -- সিরাজ আমাদের তথা আম বাঙালির নেতা বা প্রতিনিধি ছিল না। ব্যাটা বাঙালিই ছিল না। আমরা তাকে নির্বাচিতও করিনি, ক্ষমতায়ও বসাইনি - আমাদের প্রতি কোন দায়বদ্ধতাও সে ঘোষনা করেনি। জাতিগত ও ভাষাগত - উভয়ার্থেই সে বহিরাগত 'বিদেশি'। আমরা ছিলাম নেহাতই তার প্রজা ও সেবক - উল্টোটা নয়, আর এদেশ ছিল তার জমিদারি মালিকানা। সে-ই ছিল এদেশের মালিক, আমরা না - আমরা ছিলাম নেহাতই আশ্রিত স্বদেশী হয়েও - কারন রাজতন্ত্রে রাজন্যই সার্বভৌম, প্রজা বাঁচে তার জন্যেই । মোদ্দা কথায় তার একমাত্র বৈধতা 'বলতান্ত্রিক'। তাহলে বৈধতা বা ন্যায্যতার বিচারে ইংরেজদের সাথে কি এমন পার্থক্য হল তার? কি এমন হাতিঘোড়া করেছে সে তখনকার আম-বাঙালির জন্য? তাহলে তার/তাদের প্রতি/প্রতিকুলে ব্যক্তিগত বায়াস প্রকাশ পেল কি পেল না তা নিয়ে এত ইমোশনাল হওয়ার কি আছে? কই ইংরেজের বেলায় নিরপেক্ষ হওয়ার এত তাগিদ তো দেখি না কোথাও? আমি তো বলব ইংরেজ বরং এইসব অপদার্থ আত্নপরায়ন মুর্খ অসভ্য নওয়াবদের থেকে অনেক বেশি দিয়েছে (নিয়েছেও) এদেশকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক - আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি ও গণতন্ত্রচেতনা (সরকার যে আসলে জনগনের প্রতি দায়বদ্ধ, কেবল নিজের জন্যই তার অস্তিত্ত্ব নয়) - সবই ইংরেজের হাত ধরেই কোন না কোনভাবে এসেছে। ভাবুন তো, এইসব মধ্যযুগীয় মূর্খ-লম্পট-শিশ্নোদরপরায়ন-আত্নসর্বস্ব বলদ নওয়াবগুলির শাসন ও তাদের ভাবধারা যদি অক্ষুন্ন থাকত, তাহলে আজও হয়তো বাঙালিকে পিঠে চাবুক খেতে খেতে এদের হারেম আর রঙমহলে খোঁজা-দাসী-বাদী আর বাইজি যোগানের অন্ধকারাচ্ছন্ন ক্ষেত্র হয়েই বেঁচে থাকতে হত। বর্গী-মারাঠাদের ধাওয়া খেয়ে কচুকাটা হতে হত আর বুলবুলিকে দোষ দিয়ে ছড়া কাটতে হত।

সুতরাং আমি বলব এইসব নওয়াবরা আমাদের কেউ নয়, এবং নিরপেক্ষতার দাবী করতে হলে ইংরেজদের প্রতিও সেটা দেখাতে হবে - হারামিপনায় যেমনি, পজিটিভ অবদানেও তেমনি। তখন দেখা যাবে কার অবদান কতটুকু। বায়াস নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কিছু দেখি না আমি - কারন ইতিহাস নিয়ে বায়াস আমার কেন জানি মনে হয় সবসময় ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বলে না বা বিভ্রান্ত করে না, বরং অনেকসময় এই বায়াস আর বায়াসের অভিযোগ দুটি আসলে আমাদের বর্তমান আর নিজেদের সম্পর্কেই বরং অনেক বেশি বলে।

যাইহোক কি বললাম নিজেই বুঝলাম কিনা জানি না, কিন্তু পীরছাহেবের লেখাটা যথারীতি অতি চমৎকার ও উপাদেয় হয়েছে - এটা স্থিরনিচ্চয়।

****************************************

আনন্দ এর ছবি

আহাহা! মাত্র দুইশ বছর ইংরেজ বেনিয়ারা শাসন করে গেছে তাতেই তাদের এত্ত ভালো ভালো গুণ বেরোচ্ছে????

ভাগ্যিস ফাকিস্তানীরা মাত্র ২৩/২৪ বছর ছিলো! আর শ দেড়েক বছর হলে তাদের থেকেও কত্ত ভালো ভালো গুণ বেরোতো!(এখনো যেমন অনেক বুড়ো হাবড়া প্রাক্তন সি এস পি অফিসাররা বলেন, আইয়ুবের আমলই ছিলো সর্বশ্রেষ্ঠ!)

বাঙালিরা আসলেই অদ্ভুত! সিরাজকে ভিলেন বানায়! তিতুমীরকে জংগী বানায়!(ভাগ্যিস এখনো শ্রী অরবিন্দ আর সূর্যসেনকে টেরোরিস্ট বানানো শুরু করেনি!) আর ভয়াবহ দুটো দুর্ভিক্ষে দেশের একতৃতীয়াংশকে সাফ করে দেওয়া হারামীর বাচ্চা ইংরেজদের গুণ গেয়ে নুন হালাল করে!

উপরে সবুজ পাহাড়ের রাজা মোক্ষম কথাটি কয়েছেন! মূল সমস্যা মনে হয় ওখানেই! যদিও বাঙালি মুসলিমদের অরিজিন খুঁজলে আবার অনেকেই 'নজ্জা' পেয়ে যাবেন!

মন মাঝি এর ছবি

প্রত্যাশিত পাভলভিয়ান প্রতিমন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ!

****************************************

হাসান এর ছবি

ইংরেজের নিজের দেশেই এখনও রাজতন্ত্র, হোকনা যতই পোশাকি - রানী ই সব কিছুর শেষ কথা। রানীর নাতির বিয়ার যে জৌলুশ তা দেশীয় রাজা বাদশাদের থেকে কম কিসে?
আর জেই দেশে ইংরেজ বা ইউরোপীয় রা শাসন করেনি , তারা এখনও সেই আদি যুগে পরে আছে মনে হয়- যেমন চায়না বা জাপান।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

মন মাঝি দা,

ইংরেজরা না এলে আমরা উন্নত হতাম না বা, আমাদের গণতন্ত্র, আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান ইংরেজদের হাত ধরে এসেছে তথা, ইংরেজরা না এলে এ বিষয়গুলো আমাদের মাঝে এসে পৌঁছুতো না।-এই ধারণা কিন্তু ঠিক নয়।

আপনার জাতি বা, রাষ্ট্র বিকাশ ধারণা সম্পর্কে একমত হতে পারলাম না। আমি নয়, কেউই একমত হবে না। সময়ের প্রয়োজনে, প্রয়োজনের তাগিদে সবই হয়।

বরং ইউরোপীয়ানদের হাতে না পড়লে আমরা ভারত উপমহাদেশ হয়ত এখন একটি একক মহাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতাম।

অনেকের ধারণা আমরা ভারত উপমহাদেশীয়রা ইউরোপীয়রা আসার আগে অসভ্য ছিলাম। এটি ভুল ধারণা। সভ্যতার ক্রমবিকাশে সেসময় ইউরোপীয় আর ভারত উপমহাদেশীয়রা ১৯/২০ ছিল মাত্র।

এয়োদশ শতাব্দী হতে স্পষ্টভাবে ভারত উপমহাদেশীয়তাবোধের প্রমাণ পাওয়া যায় কিন্তু বাঙালীত্বের জাতীয়তাবোধের ধারণা সে সময় ছিল বলে জানা নেয়, অন্তত: আমি কোথাও পড়িনি।

আমি সিরাজপ্রেমী নয়; আমার দৃষ্টিতেও সিরাজ শাসক হিসেবে অযোগ্য ও মানুষ হিসেবেও সুবিধের নয়। কিন্তু বৃহত্তর অর্থে যখন এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা হয়, তখন নানান প্রসঙ্গের আর্বিভাব হবে বৈ-কি।

বিতর্ক নয় বরং সচলের সহযাত্রী হিসেবে উপরের কথাগুলো লিখলাম। আলোচনা হিসেবে ধরলেই ভাল লাগবে। হাসি

মন মাঝি এর ছবি

রাজা ভাই,

আমার মন্তব্যে আপনার চিন্তিত হওয়ার কিছু নাই। আমি আসলে অত সিরিয়াসলি মন্তব্যটা করি নাই, বরং উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখার একটা গোপন লোভ ছিল হয়তো এর পিছনে (এবং সেটা আমি পেয়েও গেছি অন্য প্রতিমন্তব্যে) দেঁতো হাসি চোখ টিপি

তবে হ্যাঁ, একটা কথা ঠিক (প্রঙ্গটা যখন তুললেনই), "জাতি বিকাশ" সম্পর্কে 'আমার' ধারণার সাথে আপনার বা আর কারও একমত হওয়ার কোন কারনই নাই। কারন এত গভীড় বিষয়ে আমার আসলে কোন 'ধারণা'ই নাই। এইটুকুই শুধু জানতাম যে, এর ১০০% ধরাবাঁধা কোন নিয়ম নাই, কোন অকাট্য ফর্মুলা নাই। তবে আমার ধারণা ছিল, ইতিহাসে কি হলে কি হতে পারত এই আলোচনা অনেকখানিই অর্থহীণ - কি হয়েছে সেটাই বরং আলোচ্য। এবং ইতিহাসে অবধারিত বলে কিছু নাই - এটাও আমার আরেকটা ধারণা ছিল (ভুলও হতে পারে)। ধরুন, আমাদের বান্দর প্রজাতির পূর্বপুরুষরা গাছের ডাল ছেড়ে মাটিতে নামার সিদ্ধান্ত নাও নিতে পারত, কিম্বা নামলেও পরবর্তীতে হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স পর্যায়ে বিবর্তিত হওয়ার অনেক আগেই তাদেরই মত (নিয়াণ্ডার্থাল ইত্যাদি) আরও অনেক সাব-স্পিশিসের মতই বিলুপ্ত হয়েও যেত পারত, নাকি ? কোন গ্যারান্টি আছে বিবর্তনের ধারায় হোমো স্যাপিয়েন্সদের আবির্ভাব ঘটতই? কত কিছুই তো ঘটতে পারত! আজ আম্রা ইতিহাস নিয়ে আলচনা করতে পারতাম এরও কি কোন গ্যারান্টি আছে? এয়োদশ শতাব্দী হতে ভারত উপমহাদেশীয়তাবোধের কি চেহারা ছিল বা তার পরিণতি কি হত ইউরোপীয়রা না আসলে, ইউরোপীয়ানদের হাতে না পড়লে ভারত উপমহাদেশ এখন একটি একক মহাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করত নাকি এখনও নিরন্তর আঞ্চলিক/জাতিগত মারামারি-কাটাকাটিতে মত্ত থাকত এক বিশাল মাৎসান্যায়ের ফ্রেইমওয়ার্কে -- আমার আসলেই জানা নাই। তাই এবিষয়ে কিছু বলব না।

তবে সবিনয়ে আমার অজ্ঞতা প্রসূত একটা অব্জার্ভেশন বলি - সবসময় না হলেও অনেক্সময়ি আমার কেন জানি মনে হয় ইতিহাস নিয়ে অতীতমুখী হাইপোথেটিকাল আলোচনা্য অনেকসময় আমাদের বর্তমানের বিভিন্ন বায়াস ও এজেন্ডার (এগুলি খুবই মহৎ হতে পারে) ব্যাকওয়ার্ড প্রোজেকশনটাই আমাদের কাছে ইতিহাসের চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়। আমরা হয়তো আকাঙ্খা আর বাস্তবতাকে গুলিয়ে ফেলি। আপনার কি মনে হয়? এটা কি সম্ভব হতে পারে?

কিন্তু বাঙালীত্বের জাতীয়তাবোধের ধারণা সে সময় ছিল বলে জানা নেয়, অন্তত: আমি কোথাও পড়িনি।

আমিও তো সেকথাই বলছিলাম। আমারো জানা নাই।

যাইহোক, আমিও কারো বিন্দুমাত্র সমালোচনা বা বিতর্ক নয় (যদি টোনটা সেরকম মনে হয় তবে তা আমার উদ্দিষ্ট নয়) বরং সচলের জানতে আগ্রহী সহযাত্রী হিসেবে উপরের কথাগুলো লিখলাম। আপনার অধীত জ্ঞান আমাদের সাথে শেয়ার করলে খুব খুশি হব - আমি আসলেই খুব কম জানি। একটা আলাদা পোস্ট দিন না এ বিষয়ে?

****************************************

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

মাঝি দা,
চেষ্টা করবো আলাদা পোস্ট দেয়ার।
"কেউ কারো চেয়ে বেশি জানা বা, কম জানা" জাতীয় টোন আমার মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে কি? তা হয়ে থাকলে আমি দু:খিত। আমার উদ্দেশ্য তা ছিল না।
ভাল থাকবেন।

সাফি এর ছবি

চলুক

সত্যপীর এর ছবি

দেঁতো হাসি

..................................................................
#Banshibir.

স্যাম এর ছবি

দারুন!!

সত্যপীর এর ছবি

ধন্যবাদ হাসি

..................................................................
#Banshibir.

উচ্ছলা এর ছবি

আগে এত ভাল একটা ইতিহাস টিচার পাইলে আমি ‌ম্যাটরিকে ইতিহাসে লেটার পাইতাম রে মন খারাপ

সত্যপীর এর ছবি

আমি ম্যাট্রিকে লেটার কি একখান চিরকুটও পাই নাই ইয়ে, মানে...

..................................................................
#Banshibir.

Rubayat এর ছবি

ইতিহাসের ‌অন‌‌্য অংশের কাছা খোলার সময় সত্য মিথ্যা যাচাই এর দরকার পড়লোনা, অন্ধকূপ হ্ত‌্যার বিষয়ে অন্যথা কেনো?

সত্যপীর এর ছবি

কিছু লোকের ভারি সমিস্যে হচ্ছিলো বুঝার কোনটা লিখকের বক্তব্য কোনটা অনুবাদকের। তাই গত পর্ব থেকে অনুবাদের সাথে আমার বক্তব্যও থাকছে। এই সিরিজে পরবর্তী সকল পর্বেই তা থাকবে। অন্য সিরিজে ভেবে দেখি কি করা যায়।

বুঝাতে পারলাম?

..................................................................
#Banshibir.

nakim Ahmed এর ছবি

সত্তই দারুন,
পড়ে মজা পেলুম
তালগাছটা আপনাকে দিলাম

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।