পাঠ প্রতিক্রিয়া — ঈশ্বরীতলার রূপোকথা

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি
লিখেছেন ষষ্ঠ পাণ্ডব (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৫/০৭/২০১৮ - ২:১৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ যারা ‘বাকিটুকু রূপালী পর্দায় দেখুন’ টাইপ গ্রন্থালোচনা পড়তে আগ্রহী তারা এই লেখাটা পড়া এখানেই শেষ করুন। যারা স্পয়লারের তোয়াক্কা না করে পাঠ প্রতিক্রিয়া পড়তে চান তারা এগিয়ে যেতে পারেন।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘ঈশ্বরীতলার রূপোকথা’র যে সংস্করণটি আমি পড়েছি সেটি মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে ১৩৮৩ সালে প্রকাশিত। উপন্যাসের শুরুতে ‘আমার লেখা’ নামে ১৪ পৃষ্ঠার এক আত্মকথন আছে। যারা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী ‘জীবন রহস্য’ পড়েছেন তারা বুঝতে পারবেন এই আত্মকথনটি ঐ আত্মজীবনীর অংশবিশেষ মাত্র। উপন্যাসের শুরুতে এটি দেবার চিন্তা লেখকের মস্তিষ্কজাত নাকি প্রকাশকের বুদ্ধিজাত সেটি জানি না, তবে কাজটি ভালো হয়নি। শ্যামলের উপন্যাস ‘কুবেরের বিষয় আশয়’, ‘সরমা ও নীলকান্ত’, ‘চন্দনেশ্বরের মাচানতলায়’, ‘পাপের বেতন পরমায়ু’ ইত্যাদির অনেকগুলোতে কখনো ছায়া হয়ে, কখনো রেখাচিত্র হয়ে, আবার কখনো মাংসের ভেতরে হাড়ের কাঠামো হয়ে তাঁর নিজের জীবন প্রবলভাবে এসেছে। একই ব্যাপার ‘ঈশ্বরীতলার রূপোকথা’র ক্ষেত্রেও সত্য। যারা শ্যামলের জীবনের কথা জানেন তাদের পক্ষে এই উপন্যাসের অনাথবন্ধু বসুকে চিনতে মুহূর্ত সময় লাগবে না। তাই উপন্যাসের শুরুতে এই আত্মকথন পাঠকের করোটিতে একটা অদরকারী কীট ঢুকিয়ে দেয়। সেই কীটের পদচারণা ও দংশনকে উপেক্ষা করে পাঠক যদি অগ্রসর হন তাহলে তিনি একটু একটু করে ঈশ্বরীতলা নামের এক জাদুবাস্তবতার জগতে ঢুকে পড়বেন। মোটা দাগে উপন্যাসটির গোটা কাহিনী ঘোরতর বাস্তব, কিন্তু তার সাথে পরতে পরতে সূক্ষ্মভাবে মিশে আছে জাদু। ঈশ্বরীতলার আকাশ-বাতাস-পুকুর-বাওড়-হাঁস-মুরগী-কুকুর-বেড়াল-গরু-বৃক্ষ-ফসল-বাড়ি সবই জীবন্ত-কম্যুনিকেটিভ-মায়াময়। সেই মায়ার জগত বাস্তবের দুনিয়ায় সবার অনুভবযোগ্য নয় যেমন এই উপন্যাস বা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখালেখি সবার জন্য সহজপাচ্য নয়। বস্তুবাদ, ভোগবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে যাদের এলার্জি আছে তারা শ্যামল না পড়ে অ্যান্টিহিস্টামিন নিতে পারেন।

এই উপন্যাসের ঈশ্বরীতলা বিদ্যেধরী নদীর মরা বাঁকের বাওড়ের কাছের এক গাঁ যেখান থেকে ইলেকট্রিক ট্রেনে কলকাতা ডে’লি প্যাসেঞ্জারি করা যায়। ঈশ্বরীতলায় যেমন রেলস্টেশন-স্টেশনবাজার-ধানেরগোলা-ব্যাংকবাড়ি-গম ভাঙানোর কল-আলুর চপের দোকান-সিনেমা হল-পঞ্চানন অপেরা আছে তেমনি আছে অবারিত ফসলের মাঠ, মাছের ভেড়ি, পয়স্তি চর, জলভরা বাওড়, কোম্পানির বাঁধ, ইরিগেশন ক্যানেল, ঘন জঙ্গল, পঞ্চাননতলার জাগ্রত থান। এখানে ভেড়ির মালিক অক্রুর বিক্রম মজুমদার, জনতার লোক রিটায়ার্ড ম্যাজিস্ট্রেট দক্ষিণা চক্রবর্তী, আপস্টার্ট বংশী চন্দ্র কাপালি’র সাথে জেলখাটা ডাকাত সন্তোষ টাকি, জুতোর দোকানদার যাত্রাপাগল জগাই, মৎস্যশিকারী-কাম-দিনমজুর মদন-বদন, অপার্থিব জগতের মানুষ মহম্মদ বাজিকরও আছেন। কলকাতার খুব কাছে হয়েও একেবারে জগতবিচ্ছিন্ন, মফস্বল শহর আর গাঁয়ের সুবিধা-অসুবিধা, তার নানা রঙের মানুষ, কখনো সবাক জীবকুল কখনো সচল প্রকৃতি মিলিয়ে ঈশ্বরীতলা যা তার কিছু কিছু দেখা মেলে শ্যামলের অন্য লেখাগুলোতেও — কোথাও কোটালপাহাড় নামে, কোথাও কদমপুর নামে, কোথাও অন্য কোন নামে। এমন ধারা স্থানের দেখা মেলে মার্কেজের ‘মাকোন্দো’তে, আযেন্দের ‘কর্দিলেরা’য় বা নারায়ণের ‘মালগুড়ি’তে। এগুলোর একটির বহিরঙ্গের সাথে আরেকটির মিল নেই, তবে এগুলোর প্রত্যেকটির সাথে প্রত্যেকটির কোথায় মিল আছে সেটা জাদুবাস্তবতার পাঠকেরা জানেন।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কি অনাথবন্ধু বসু নাকি ঈশ্বরীতলা স্বয়ং সেটা নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে, তবে তা অহেতুক। অনাথবন্ধু গ্রাজুয়েশন করা, ছাত্রজীবনে রাজনীতি-ডিবেট-প্রেম করা, কলকাতায় চাকুরিকরা একজন মানুষ যিনি নিরিবিলি থাকার জন্য ঈশ্বরীতলায় বাড়ি করেন। তার সেই বাড়িতে তিনি তার স্ত্রী শান্তা, দুই কন্যা টুকু ও লিলি, গৃহকর্মী বলাই, উমা নামের গাভী, কানাই নামের বাছুর, বজ্জাত নামের বেড়াল, বাঘা নামের কুকুর, অরুণ-বরুণ নামের রাজহাঁস, আটটা পাতিহাঁস, এগারোটা ছাগল যার বেশিরভাগ শুক্লা নামের এক ছাগীর সন্তানসন্ততি আর একান্নটা সাদা লেগহর্ন মুরগি নিয়ে বাস করেন। অনাথ সকালে কাঁকড়াভাজা সহযোগে গেলাসের পর গেলাস হাঁড়িবাঁধা তাড়ি খান, কখনো কন্যা টুকুকেও তার ভাগ দেন। টাটকা মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে অফিসে যান, সেখানে একজনে তিনজনের কাজ করেন আবার অল্প সময়েই অফিস থেকে বের হয়ে যান। অনাথ নিয়মত অফিস কামাই করেন যেমন তার কন্যারা নিয়মিত স্কুল কামাই করে। ইচ্ছে হলে তিনি কাজ ফেলে দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমান। অবসরে তিনি ডায়েরিতে নিজের ভাবনা লিখে রাখেন, নিরালায় তিনি কুকুর-বেড়াল-গরু-ছাগল সবার সাথে তাদের ভাষায় কথা বলেন, তৃষ্ণা মেটাতে আকাশ অথবা জ্যোৎস্না পান করেন, মহম্মদ বাজীকরের অপার্থিব জগতের আলোয় নিঃশ্বাস নেন। অনাথ একই সাথে ঘোরতর সংসারী ও উদাস সংসারবিবাগী, একই সাথে চরম বৈষয়িক ও হাতখোলা। অনাথের চরিত্রের সাথে, জীবনযাপনের সাথে পাঠক কখনো নিজের অংশকে কখনো নিজের স্বপ্নের খণ্ডকে আবিষ্কার করতে পারবেন। তাই অনাথ পাঠকের কাছে মোটেও অজানা কেউ নন্‌, বরং নিজের খুব চেনা, নিজের ভেতরের খুব একান্ত একটি চরিত্র। মার্কেজের বুয়েন্দিয়ারা যেমন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রবাহিত হন, ক্যানভাস সংক্ষিপ্ত হওয়ায় শ্যামলের অনাথবন্ধু বসু এক জন্মেই এক জীবন থেকে অন্য জীবনে প্রবাহিত হন। বার বার পরাজিত হতে হতে ঘুরে দাঁড়ান, সৃষ্টি করেন > সৃষ্ট জগত ধ্বংস হয় > পুনরায় নতুন কিছু নির্মাণ করেন। প্রতিবার নিজের পরিচয় আর অবস্থান পরিবর্তন করেন। সাধারণ গল্পে নাগরিকায়িত মানুষ পরাজিত হলে বিনাগরিকায়িত হন, এখানে অনাথ বিনাগরিক জীবনে পরাজিত হয়ে নাগরিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করে জীবনপ্রবাহ অব্যাহত রাখেন।

এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র অনাথের কার্যক্রম বিশেষত কলকাতার মতো মহানগরের বাঁধানো জীবন ছেড়ে ঈশ্বরীতলাতে থানা গাড়ার ব্যাপারটি গড়পড়তা বাঙালীর তুলনায় একটু খাপছাড়া মনে হতে পারে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের চম্পাহাটি পর্ব’তে দশজন সাধারণ বাঙালীর চেয়ে তাঁর যে স্বতন্ত্রতা দেখিয়েছেন সেটি বিবেচনায় নিলে অনাথকে আর খাপছাড়া মনে হবে না। শ্যামলের এই স্বতন্ত্রতা অনেককে স্বস্তি দেয়নি, অনেককে ঈর্ষান্বিত করেছে — যেমনটা অনাথের জীবনেও ঘটেছে। শ্যামল ঘোরতর অস্তিত্ত্ববাদী একজন লেখক। জীবনের রঙ-রূপ-রস তিনি নিজে যেমন উপভোগ করেছেন তেমন তাঁর চরিত্ররাও করেছে। কোন প্রকার ইনহিবিশন, পিউরিটান ভাবনা তাঁর লেখার প্রবাহকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেয়নি। তাঁর এই সাবলীল আচরণের সাহস যাদের ছিল না তাদের কেউ ‘রাম’, ‘রাম’ বলে সরে পড়েছে; কেউ না পেরে গালি দিয়েছে; কেউ কেউ কিছু জানেনা এমনভাব করে থেকেছে — এবং এই সকল পক্ষ তাঁকে ঈর্ষা করে গেছে যেমন অনাথও অন্যদের মাৎসর্যের তাপে দগ্ধ হয়েছেন।

ঈশ্বরীতলার রূপোকথা অনাথবন্ধুর জীবনের সাথে সাথে আরও অনেকগুলো চরিত্রকে খুব কাছে থেকে দেখায়, নির্মাণ করে, পরিণতিতে নিয়ে যায়। তাই উপন্যাস হিসেবে এটি যত কম ফর্মারই হোক না কেন এর ক্যানভাসের ব্যপ্তি ঈশ্বরীতলার ফসলের মাঠ অথবা এর আকাশের মতো বিশাল। এখানে কমেডি আছে, রোমান্স আছে, ট্র্যাজেডি আছে। এখানে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সতেরজন পুত্রের মতো অনাথের পশুপাখিরা প্রাণ হারায় মাঠের ফসলেরা ধুয়ে যায়, আবার মেলকিয়াদেসের মতো মহম্মদ বাজিকর মৃত্যুর জগত থেকে ফিরে আসেন। এখানে পিয়েত্রো ক্রেসপির প্রতি আমারান্তা বুয়েন্দিয়া অথবা রেবেকা উযোয়ার ভালোবাসার মতো ভীরু প্রেম যেমন আছে, তেমন জোয়াকিন আন্দিয়েতা আর এলিযা সমার্সের বাঁধভাঙা অসম প্রেমের মতো প্রেম আছে। স্তালিনের যৌথখামারের স্বপ্ন ভেঙে পড়ে ভ্রান্ত নীতির কারণে আর এখানে অনাথের অনাবাদী জমি চাষের যৌথ প্রচেষ্টা মার খায় নোনা জলে, জলের অভাবে, মাজরা পোকার আক্রমণে, অকাল প্লাবনে। এই যৌথ প্রচেষ্টার শুরুটা কি এক Epiphany, নাকি অনাথের চিন্তা মহম্মদের বাক্যে মূর্ত হয়ে আসে! মহম্মদ কি আসলেই ভিন্ন কেউ নাকি অনাথের এক অবতার যে সময়ের ভিন্নতায় বা মাত্রার ভিন্নতায় বাস না করে একই সময়ে একই স্থানে সমান্তরালে বিচরণ করে! সে ভাবনা পাঠকের, ডেলফির মন্দিরের অমোঘ বাণীর মতো শ্যামল শুধু তার বর্ণনা করে যান।

বাংলা সাহিত্যের অত্যাবশকীয় উপাদান ‘প্রেম’। শ্যামলের রচনাগুলোতে প্রেম মূলত প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তমনস্কদের প্রেম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা বৈবাহিক সম্পর্কের তোয়াক্কা না করে বা সামাজিক রীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। কিশোর-কিশোরীর প্রেম বা পরিবারের সবাইকে মানিয়ে সদ্য যুবক-যুবতী তাদের প্রেম-বিবাহকে প্রতিষ্ঠিত করছে শ্যামলের লেখা এমন গল্প খুব বেশি নেই। শ্যামলের নায়ক-নায়িকারা মূলত বিবাহিত/বিবাহিতা, এবং পরকীয়াতে রত। এমন সৃষ্টিছাড়া লেখকের লেখা ঘরে ঢুকলে যারা গোবর-গঙ্গাজল ছিটান তারা শ্যামলকে নিরাপদে এড়িয়ে যান। এই উপন্যাসে অবশ্য প্রেম নিয়ে শ্যামল অমন খেলা খেলেননি। সুতপা বসু আর বিকাশ মজুমদারের প্রেম সাধারণ বাঙালী জীবনের আর দশটা প্রেমের গল্পের মতো এগিয়েছে। এমনকি সেখানে সিনেমাটিক অ্যাকশনও আছে। রিনি মজুমদারের সাথে সন্তোষ টাকির প্রেমটা বরং সাহসী। তবে সেটাও সাধারণ বাঙালী জীবনের ব্যতিক্রম নয়। এই জুটির পরিণতিটি স্বাভাবিক, তবে ঠিক শ্যামলীয় নয়।

এই উপন্যাসের সম্ভাব্য রচনাকালের সময়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রগতির ভেকধারীদের হাতে বাম হঠকারীরা কচুকাটা হচ্ছে এবং স্বঘোষিত স্তালিনপন্থীরা আস্তে আস্তে ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময়কালে গোষ্ঠীবিশেষের রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো থেকে কর্তৃত্বকাঠামোতে মাইগ্রেশনের যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল ঈশ্বরীতলাতে তার রেশ দেখা যায়। তাছাড়া বাস্তবে কর্তৃত্ববাদী স্বঘোষিত স্তালিনপন্থীরা ভ্রান্ত পরিকল্পনার যে অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে এক সময় ক্ষমতায় এসেছিল, এবং চার দশকে যে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছিল ঈশ্বরীতলার অনাথও তেমন এক বেহিসেবী স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে জড়ো করেছিলেন এবং এক সময় সে স্বপ্ন চরমভাবে ভঙ্গ হয়। একটা পার্থক্য অবশ্য এখানে আছে, বাস্তবের দুনিয়ায় কর্তৃত্ববাদীরা কোথাও নিজেদের ভুল বা দোষ স্বীকার করেনি অথবা তার দায় নেবার হিম্মত দেখায়নি। অনাথ অবশ্য তাদের মতো নপুংসক নন্‌, তিনি যাবতীয় দায় নিজে চুকেছেন — নিজের সর্বস্ব দিয়ে চুকেছেন। ভবিষ্যতদ্রষ্টা সাহিত্যিক মানুষকে বহুকাল আগে তার কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, মানুষরূপী অমানুষ রাজনীতিবিদরা সেই কর্তব্যের পথে না হেঁটে নিজেরা ধ্বংস হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির অকপট চিত্র, ভোটের রাজনীতির কুৎসিত চেহারা, বিপ্লবের ব্যর্থ প্রচেষ্টা, সামন্তবাদের অবশেষকে ছাপিয়ে পুঁজিবাদের উত্থান, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের উত্থান, মূল্যবোধের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানবিক ভালোবাসার গল্প, জয়পরাজয়ের গল্প, ইতিহাসের অস্পষ্ট নোট এমন অনেক কিছুকে ধারণকরা এই রূপোকথা নিয়ে আরও বলতে গেলে গোটা উপন্যাসটিকেই বর্ণনা করতে হবে। বিশেষত কেউ যদি এখান থেকে উদ্ধৃতিযোগ্য অংশ তুলে ধরতে চান তাহলে তাকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা টাইপ করে যেতে হবে।

বাংলা সাহিত্যের গদ্যকারদের মধ্যে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় না জনপ্রিয়, না আলোচিত। একজন গদ্যকার ঠিক কী কী কারণে জনপ্রিয় হন সেটা বলা মুশকিল। কখনো কোন লেখক জনপ্রিয় হয়ে যাবার পর তার লেখা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে অনেক কিছু হয়তো প্রমাণ করা যেতে পারে, তবে জনপ্রিয় লেখক হতে পারার ফরমুলা কেউ বলতে পারবেন না। বাংলা ভাষায় লেখা বিশ্বমানের লেখা যেমন জনপ্রিয় হয়েছে তেমন ছাপানো ভূষিমালের ত্রিশটির বেশি সংস্করণ বের হবার ইতিহাসও সবার জানা আছে। শ্যামল জনপ্রিয় না-ই হতে পারেন, তাঁর জনপ্রিয় হবার দরকারও নেই। ঈশ্বরীতলার রূপোকথা পড়তে গিয়ে অনেকেই হাই তুলবেন, খেই হারাবেন, বিরক্ত হবেন, পড়া বন্ধ করে দেবেন — তাতে শ্যামল বা ঈশ্বরীতলার কিছু যাবে আসবে না। বাংলা সাহিত্যে যারা বিশ্বমানের কাজের নিদর্শন খুঁজতে চান তারা শ্যামল অথবা ঈশ্বরীতলাকে ঠিকই খুঁজে নেবেন।


মন্তব্য

সোহেল ইমাম এর ছবি

কোন বইয়ের আলোচনা পড়া থাকলে পড়তে আরো ভালো লাগে। কাহিনির একটা ছায়া জানা হয়ে গেলে আরো ভেতরে ঢুকে পড়া যায়, কেননা তখন অযথা কৌতুহলে নাকানিচুবানি খেতে হয়না। বইটা পড়া হয়নি, পড়ার তালিকায় লাল দাগ দিয়ে রাখলাম। আপনার লেখাটা মুগ্ধতা নিয়ে পড়লাম। বইটা পড়ার পর আবার আপনার এই লেখাটা পড়বো পাণ্ডবদা।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

পাঠ প্রতিক্রিয়া অথবা গ্রন্থালোচনা উভয় প্রকার পাঠকের জন্যই লেখা - যারা বইটি পড়েছেন এবং যারা তখনো বইটি পড়েননি। যারা বইটি আগেই পড়েছেন তারা নিজের বোঝার সাথে আলোচকের বোঝাটা মিলিয়ে নিতে পারেন, এবং তার ভিন্নমত থাকলে বা সংযোজন কিছু থাকলে সেটা জানাতে পারেন। যারা বইটি আগে পড়েননি তারা এখান থেকে ধারণা নিতে পারেন তিনি বইটি পড়বেন কি পড়বেন না, এবং আলোচনাটি থেকে প্রাসঙ্গিক কোন বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের রচনা পাঠে যাদের নূন্যতম আগ্রহ আছে তারা ঈশ্বরীতলার রূপোকথাকে অবশ্যই তালিকাতে রাখবেন।

অটঃ নিচের কোন বাক্যটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত হয়?

রচনাটি/গানটি/ছবিটি মুগ্ধতা নিয়ে পড়লাম/শুনলাম/দেখলাম

নাকি

রচনাটি/গানটি/ছবিটি পড়ে/শুনে/দেখে মুগ্ধ হলাম


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সোহেল ইমাম এর ছবি

দ্বিতীয় উদাহরণটিই হয়তো ঠিক কিন্তু ভালোলাগাটা বিশেষ ভাবে অনুভব করলে আমি সাধারণত প্রথম পংক্তির বাক্য গুলোই বলে ফেলি। ব্যাকরনে ভালো কোন কালেই ছিলামনা এটাও হয়তো এর একটা কারণ।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ ইটা রাইখ্যা গেলাম...

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

অন্য অনেকের লেখায় তো বটেই আমারও কিছু লেখায় দেখেছি আপনি এমন ইটা রাইখ্যা গেলাম... রেখে গেছেন কিন্তু পরে আর কোন মন্তব্য করেননি। যদি পরে মন্তব্য করতে আগ্রহী না-ই হন তাহলে খামাখা এমন ইটা রাইখ্যা গেলাম... রেখে যান কেন?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

মাফ করবেন, আগে সকালের ইটা বিকেলেই সরিয়ে নিতাম। এখন নানাবিধ চলকের মান বদলে সকাল-বিকেলের পার্থক্য বেড়ে পৃথিবী ছেড়ে গ্রহরাজ বৃহস্পতির মাপে গিয়ে ঠেকেছে। আপনার লেখার শুরুতে 'স্পয়লার এলার্ট' দেখে ইটা রেখেছিলাম বইটা পড়ে এসে মন্তব্য করব ভেবে। বই পড়ার সুযোগ হয় নি, খুব তাড়াতাড়ি হবে সেই আশাও নেই। মন খারাপ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপনি কবে সকালের ইটা বিকালে সরিয়েছেন জানি না, তবে আমার কিছু লেখাতে এখনো আপনার রাখা ইটা আছে। সেগুলোর সময়কাল আপনার 'এখন' নাকি 'তখন' জানি না, তবে দুয়েক বছর পার হয়েছে এমন ঘটনাও আছে। পরে পড়া বা মন্তব্য করার জন্য একটা পোস্ট বুকমার্ক করে রাখলে হয়। কাজ শেষ হলে বুকমার্ক সরিয়ে নেয়া যায়। ইটা রাখলে সেটা কি সময়ে সময়ে রিমাইন্ডার দেয়? রিমাইন্ডার পেতে সচলের পাঠককূল যদি পোস্টগুলোতে এমন ইটা রাখতে শুরু করেন তাহলে বছর শেষে 'সচল মহল' বানাতে আর ইট কেনার দরকার পড়বে না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হাসিব এর ছবি

চরিত্রগুলোর পরিণতি পেতেই হয় কেন? লেখকেরা সময় বর্ণনা করেন। আমরা বাস্তবে যে সময়টা যাপন করি সেখানে অনেক অপ্রাসঙ্গিক চরিত্র থাকে। যেমন, রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে ধাক্কা খাওয়া লোকটা, মিটারে যেতে অস্বীকার করা সিএনজি ড্রাইভার, বকশিস চাইতে আশা দারোয়ান ইত্যাদি। আমাদের জীবনে কোনরকম ভূমিকা এসব লোকের না থাকলেও এরা কিন্তু বিরাজ করে। এইসব চরিত্র উপন্যাসে আসলে এরা পরিণতি পাবে না। আবার এদের বাদ দিলে যাপিত জীবনের একটা অংশের গল্প বাদ থেকে যায়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ছোট গল্পে চরিত্রগুলো পরিণতি না-ই পেতে পারে। উপন্যাসে 'পাসিং শট'-এর মতো যে সব চরিত্র আসে (উদাহরণ আপনি উল্লেখ করেছেন) সেগুলোও পরিণতি না-ই পেতে পারে। কিন্তু উপন্যাসে যে সব চরিত্র কাহিনীর বড় অংশ জুড়ে বিস্তৃত থাকে, কাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেগুলো এক প্রকার পরিণতি দাবি করে। লেখক অবশ্য এই দাবি মানতে বাধ্য নন্‌। উপন্যাস আকার-আকৃতি-বিস্তৃতিতে বৃহৎ বলেই পাঠকের এমন আকাঙ্খা থাকে। তবে মীমাংসামূলক পরিণতি থাকুক বা না থাকুক, উপন্যাসে এমন চরিত্রগুলো বিকাশের জোরালো দাবি রাখে - যাতে পাঠকের পক্ষে কাহিনীর গতিপ্রবাহের সাথে সংশ্লিষ্ট চরিত্রগুলোর পরিণতি কল্পনা সম্ভব হয়। বাজে উপন্যাসের এক প্রকার উদাহরণ হচ্ছে কাহিনীতে অনেক চরিত্রের অনেক ঘটনার আমদানী করা, বিস্তৃত করা, তারপর খেই হারিয়ে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে একটা/দুইটা চরিত্রের ওপর জাহাজের সার্চলাইটের আলো ফেলে শেষ করা।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

কর্ণজয় এর ছবি

সুন্দর আলোচনা। চোখের সামনে বদ্ধ দেয়ালে হঠাৎ জানালা খুলে যাওয়ার মতো।।
বইটি পড়া নেই। কিন্তু আলোচনার মধ্যে বইটির একটা চেহারা প্রেক্ষিত শুদ্ধ উঠে আসে।

বাংলা সাহিত্যে যারা বিশ্বমানের কাজের নিদর্শন খুঁতে চান তারা শ্যামল অথবা ঈশ্বরীতলাকে ঠিকই খুঁজে নেবেন-
অনালোচিত, অনেকটা আড়ালে থেকে যাওয়া শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেলায় কথাটি সত্য-

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আমার আশংকা ছিল পাঠকদের বেশিরভাগ জনের বইটি না-পড়া থাকার। তাই স্পয়লারের তোয়াক্কা না করে বর্ণনা দিয়ে গেছি যাতে পাঠকের কাছে রূপোকথাটির রূপ মোটামুটি স্পষ্ট হয়।

বাংলা সাহিত্যে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের টিকে যাবার ব্যাপারে আমি আশাবাদী। তিনি চিন্তায় (এবং কর্মে) নিজের সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিলেন। সুতরাং তাঁর রচনা আরও বহু বহু কাল প্রাসঙ্গিকতা হারাবে না। তাঁর উত্তরাধিকারীরা যদি তাঁর সকল সৃষ্টিকর্ম খুঁজে বার করে রচনাবলী আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নিতেন তাহলে শ্যামল-পাঠকদের উপকার হতো।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

লেখাটা পড়ে ভালো লাগলো। একই সাথে মনে পড়ে গেলো, প্রায় এগারো বছর আগে মুহম্মদ জুবায়ের শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি লেখা সচলে দিয়েছিলেন। একজনের লেখার মন্তব্যে আরেকজনের লেখার সূত্র গছিয়ে দেওয়া শোভন হলো কি না, বুঝতে পারছি না, কিন্তু লেখাটা হয়তো আপনারও কাজে আসবে।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কোনো লেখাই পড়িনি। কোনটা দিয়ে শুরু করা যায়?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আলোচনার সময় আমরা প্রায়ই প্রাসঙ্গিক নানা খবর, তথ্য ইত্যাদির লিংক দিয়ে থাকি। সেটা যদি শোভন হয়ে থাকে তাহলে একটা প্রাসঙ্গিক ব্লগের লিংক দেয়া অশোভন হবে কেন?

এই লেখাটার পরিকল্পনা যখন করি তখনই জুবায়ের ভাইয়ের লেখাটার কথা মনে পড়ে। তারপর সেটা খুঁজে আবার পড়ি। জুবায়ের ভাই সেখানে উপন্যাসটি থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি ব্যবহার করায় আমি আমার লেখায় আর কোন উদ্ধৃতি দেইনি। কারণ, আমার আশা ছিল আলোচনার সময় কোন না কোন পাঠক জুবায়ের ভাইয়ের লেখাটার প্রসঙ্গ তুলবেন। কাজটা করায় আপনাকে ধন্যবাদ।

শ্যামল পাঠ শুরু করার জন্য 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা' অথবা 'কুবেরের বিষয় আশয়' ভালো। আর যদি হাতে সময় এবং ধৈর্য থাকে তাহলে 'শাহ্‌জাদা দারাশুকো' দিয়ে শুরু করুন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তুলিরেখা এর ছবি

আশ্চর্য সমাপতন! এই গত দু'দিন হল পড়ছি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস "শাহজাদা দারাশুকো"। এর আগেও একবার পড়েছিলাম, স্কুলে থাকতে, সম্ভবতঃ ক্লাস ইলেভেনে ।
"ঈশ্বরীতলার রূপোকথা" পড়িনি, এবারে সন্ধানে রইলাম, সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলবো।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

দারাশুকো'র তৃতীয় পর্ব আর কখনো আসবে না এটা মনে হলেই মন খারাপ হয়ে যায়। বেশির ভাগ ঔপন্যাসিক তাদের 'মোটকা' উপন্যাসগুলোতে খেই হারিয়ে উপন্যাসের বারোটা বাজান। শ্যামল এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমদের একজন। শ্যামল যা কিছু পান, পড়ে ফেলুন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আয়নামতি এর ছবি

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু ছোটো গল্প পর্যন্তই আমার দৌঁড়। এত কম পড়াশোনা আমার। ওঁর কথা ধার করেই তাই বলতে হচ্ছে 'এত অপটু, অশিক্ষিত লাগে নিজেকে'! আপনার এই চমৎকার আলোচনাটা পড়ে 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা' সহ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ে দু একটা উপন্যাস পড়ে ফেলার ইচ্ছা জাগ্রত হলো।
এই আলোচনার মাধ্যমে আপনার পঠিত বইটির অনুভূতি বিস্তারিতভাবে আমাদের সাথে ভাগ করে নেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ পাণ্ডব'দা।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

একটু এদিক ওদিক খোঁজ করুন, শ্যামলের অল্প কিছু বই অবশ্যই পেয়ে যাবেন। তারপর পড়ে ফেলুন, ঠকবেন না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তিথীডোর এর ছবি

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাধু কালাচাঁদ সমগ্র পড়ে মহা চটেছিলাম। ঈশ্বরীতলার রূপোকথা পড়ে দেখতে হবে।

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় 'কিশোর উপন্যাস' টাইপ যা কিছু লিখেছিলেন সেগুলোর কিছুই আমি এঁটে উঠতে পারিনি। এমনটা হতেই পারে। সবার পক্ষে সব প্রকারের জিনিস লেখা সম্ভব নয়। তবে শ্যামল পরিণত পাঠকদের জন্য যা কিছু লিখেছেন সেগুলোই তাঁকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নজমুল আলবাব এর ছবি

শ্যামল জনপ্রিয় নয় হয়তো, হয়তো আলোচিতও নয় সেরকম, কিন্তু বেশ ভালো ভাবেই পঠিত সম্ভবত। নয়তো আমার মতো নিম্ন শ্রেণীর পাঠক কেমন করে পড়লো।

আলাোচনাটা চমৎকার সুখপাঠ্য। কিন্তু সমস্যা করে ফেল্লেন, এখন পড়ার ইচ্ছা হচ্ছে...

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপনার ভাষ্য অনুযায়ী আপনাকে যদি তথাকথিত 'নিম্ন শ্রেণীর পাঠক' ধরি তাহলে শ্যামল আপনার পাঠের তালিকায় এসেছেন আপনার বয়সের কারণে। কারণ, আপনার কৈশোরে, সদ্য যৌবনে শ্যামল সপাটে ব্যাটিং করে গেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আপনি তো আর ঐ গোত্রের না, তাই শ্যামল আপনার পাঠ তালিকায় থাকাটা স্বাভাবিক। এখনকার বইয়ের বাজারে শ্যামলের খুব কম কিছু বই পাওয়া যায়, সাহিত্য বা অন্য আলোচনায় শ্যামলের নাম উঠেই আসে না। তাই এখনকার পাঠকেরা শ্যামলকে চেনেন না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নজমুল আলবাব এর ছবি

শ্যামল পাঠের জন্য আবু হাসান শাহরিয়ার ধন্যবাদ পাবেন। খোলা জানালার মাধ্যমে এই নাম এবং লেখার সাথে পরিচয়।

কইলকাত্তায় সম্ভবত উনারে বুলগার শ্রেণীর লেখক মনে করে, তাই আলোচনার বাইরে রাখে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

উনি যে কলকাতার ঐসময়কার লেখক-শিল্পীকূলের আড্ডার লোক ছিলেন না তা নয়। তবে উনার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিষয়কর্ম, উনার লেখাতে পরকীয়া, বস্তবাদ, ভোগবাদের প্রাবল্য অনেকের পছন্দ ছিলো না। তাছাড়া আবাপ গোষ্ঠীর নেকনজরে না থাকলে কলকাতাভিত্তিক সাহিত্য আলোচনায় দৃশ্যমান থাকা মুশকিল।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

এক লহমা এর ছবি

এমনিতেই বিস্মৃতি আমার আবাল্য সঙ্গী। এখন তো তার সাথে আরো কত ভূত-প্রেত! ভুলেছি প্রায় সব পুরাতন পাঠ। শুধু মনে আছে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়-এর লেখা পড়ে যে আশ্চর্য মুগ্ধতায় মন ভরে থাকত, সেটা একেবারেই অন্য রকমের ছিল। শহরের বাইরে আধা-গ্রাম আধা-শহরের একটা যেমনতেমন-করে-কিন্তু-আয়েস-ভরে-জড়িয়ে-নেওয়া-চাদর-গায়ে মানুষের সকালের বাজারে মাছ কেনার জীবন। যে জীবন মাছ দেখে, মেছুনীকেও, তার আঁশবটিকেও। তারপর অনায়াসে সে সব ভুলে আবর্জনা-কুকুর-সব্জি-টেনে-নেওয়া-গরু-ইত্যাদির পাশ দিয়ে আপন মনে হাঁটতে থাকে - সাইকেলটা আবার আজকাল বাজারের মধ্যে আনতে দেয়না।

আনন্দবাজার দাম না দিক, আমরা দিতাম। ওনার লেখা থাকত বলে প্রতিদ্বন্দ্বী বা অনামা পত্রিকা কিনে নিতাম। ভালবাসতাম।

রিভিউ যথার্থ। এই সাথে হিমুর কল্যাণে জুবায়ের ভাইয়ের লেখাটাও পড়ার সৌভাগ্য হয়ে গেল।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আহা! শ্যামলকে যে আপনি আকণ্ঠ পান করেছেন, আত্মস্থ করেছেন সেটা বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। আমার পোস্টটা এমন একজন শ্যামলভক্ত পাঠক পড়েছেন সেটা ভাবতেও ভালো লাগে। মেন্ডেল মারা যাবার সাড়ে তিন দশক পরে তাঁর কাজ স্বীকৃতি পেয়েছিল, কে জানে শ্যামল মারা যাবার সাড়ে ছয় দশক পরে হয়তো পাঠককূল তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করবে।

আবাপ কতজনের সাহিত্যিক পরিচয় তো নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু যার প্রতিভা আছে তাঁকে ঠেকাবে কী করে!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA