রেনেলের দেখা বাংলা বদলে গেছে অনেকটাই

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি
লিখেছেন আব্দুল্লাহ এ.এম. [অতিথি] (তারিখ: সোম, ১৫/০৭/২০১৩ - ১:১৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


জেমস রেনেল, বাংলার গ্রহনযোগ্য একটি মানচিত্র তিনিই প্রথম অঙ্কন করেন

রেনেল কাজটি যখন শুরু করেছিলেন, বাংলায় তখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অবস্থান অনেকটাই সুসংহত। সিরাজের পরাজয়ের পর মীরজাফর ও মীরকাসেম নামের দুই "কাবাব মে হাড্ডি" কে নিয়ে সাপ লুডু খেলা সমাপ্তির পথে। কোম্পানী এখন "মজাসে বানিজ্য করিয়া যাইবে", এই উদ্দেশ্যে ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ভ্যান সিট্টার্ট রেনেলকে দিলেন কলকাতা থেকে মূল গঙ্গা(অর্থাৎ পদ্মা) হয়ে সমুদ্র অবধি শুকনা মৌসুমে চলাচলের উপযোগী একটি সহজ নৌরুট আবিস্কারের দায়িত্ব। কাজটি দক্ষতা এবং দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হলো। ইত্যবসরে বাংলার দেওয়ানী সনদ লাভের মধ্য দিয়ে বাংলার প্রকৃত ভাগ্য বিধাতা হয়ে ওঠার পর ক্লাইভ তাঁকে সমগ্র বাংলার একটি ম্যাপ প্রস্ততের নির্দেশ দিলেন। এরই ফলস্রুতিতে ১৭৬৫ সালের অক্টোবরে তিনি বাংলার বিস্তীর্ন অঞ্চলের জরিপ সম্পন্ন করে একটি ম্যাপ অংকনের কাজ শুরু করেন। কাজের সফলতার পুরস্কার স্বরুপ প্রথমে তিনি বাংলার এবং পরে সমগ্র ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল হিসেবে অভিসিক্ত হন। তাঁর আগেও বিক্ষিপ্তভাবে বাংলা বা ভারতের কিছু মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছে, কিন্তু গুনমানে সেগুলো রেনেলের কাজের ধারেকাছেও নেই। সে কারনে এই ম্যাপটি আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।


রেনেলের ম্যাপের উৎসর্গ পত্র

জেমস রেনেলের জন্ম ১৭৪২ সালের ডিসেম্বরে ইংল্যান্ডের ডেভনশায়ারে। ১৪ বছর বয়সেই তিনি সমুদ্রগামী জাহাজের মিডশিপম্যান হিসেবে যোগ দেন এবং বিভিন্ন জাহাজে কর্মরত অবস্থায় ধীরে ধীরে নৌ-জরিপ কাজে হাত পাকান। ১৭৬৩ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে যোগ দিয়ে সার্ভেয়ার হিসেবে ফিলিপিন্সে গমন করেন। ১৭৬৪ সালের শুরুর দিকে রেনেল বাংলায় আগমন করে ফোর্ট উইলিয়ামে শিক্ষানবিশ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, পদবি হলো মেজর। রেনেল বাংলায় ১১ বছর অবস্থানকালে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পার করেছেন। একটা কঠিণ অবস্থার মধ্যে তিনি বাংলার ম্যাপটি অঙ্কনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পাদন করছিলেন। বাঘ, কুমির, সাপ, মশা, উষ্ণতা ও আর্দ্রতা এবং ফকির-সন্যাসী বিদ্রোহীদের ভয়ে সর্বদা তাকে শংকাগ্রস্থ থাকতে হয়েছে। কুচবিহার অঞ্চলে কাজ করার সময় তিনি ফকির বিদ্রোহের সদস্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গুরুতর আহত হন, তবে কোনক্রমে প্রানে রক্ষা পান। পরে ফকির বিদ্রোহের অবিসম্বাদিত নেতা ফকির মজনু শাহ এর বিরুদ্ধে চুরান্ত অভিযানে তিনিও অংশ গ্রহন করেন। বাহারবন্দ অঞ্চল জরিপের সময় মালামাল বহন করার জন্য তাঁর কুলির প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু অনেক বেশী মজুরীর প্রলোভনেও কোন কুলি যোগার করতে ব্যর্থ হন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন উলিপুরের দেওয়ান রামশঙ্করের নিষেধাজ্ঞার কারনে এমনটা হচ্ছে। তিনি রামশঙ্করকে একটা কড়া চিঠি লিখে এর কারন জানতে চান। রামশঙ্কর অবশ্য উত্তরে জানান- যে কেউ ইচ্ছা করলে তার কুলিগিরি করতে পারে, তিনি কাউকে নিষেধ করেন নি। রেনেল তখন রামশঙ্করকে আদেশ দেন, অবিলম্বে যেন প্রয়োজনীয় সংখ্যক কুলি তার বরাবর প্রেরন করা হয়, নইলে তাকে বিশেষভাবে শিক্ষা দেয়া হবে। রামশঙ্কর অবহেলা ভরে সে আদেশ উপেক্ষা করলে তিনি অগত্যা রংপুরে চিঠি লিখে কুলি এবং বাড়তি সেপাই আনিয়ে নেন, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ কুলি ভেগে যায়। এবার তিনি রামশঙ্করকে বিশেষ শিক্ষা দেওয়ার জন্য উলিপুরে উপস্থিত হয়ে তাকে এত্তেলা দেন, কিন্তু রামশঙ্কর সে আদেশ উপেক্ষা করেন। তখন রামশঙ্করের বাড়ীতে চড়াও হয়ে দেখেন চিড়িয়া আগেই সটকে পড়েছে। শাস্তিস্বরূপ তার বাড়ীঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। রেনেলের জন্য এর ফলাফল খুব একটা সুখকর হয় নি, রামশঙ্করের পাইক বরকন্দাজ এবং কয়েকশো গ্রামবাসী রেনেলের দলকে ধাওয়া করে, ফলে তাঁরা পালিয়ে এক গভীর জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন। কয়েকদিন অবরোধ করে রেখে রামশঙ্কর অবশেষে চলে গেলে রেনেল কোনক্রমে রংপুরে চলে আসেন।

তাঁর সময়ে জরিপের জন্য বিজ্ঞানসম্মত যন্ত্রপাতি তেমন একটা আবিস্কৃত হয় নি। অক্ষাংশ নির্ধারনের জন্য তিনি চেইন, কম্পাস এবং হ্যাডলীর কোয়াড্রান্ট ব্যাবহার করেছেন। তবুও নিষ্ঠা সহকারে তিনি মোটামুটি একটি নিখুঁত ম্যাপই প্রনয়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কাজের সুবিধার জন্য প্রথমে তিনি ছোট পরিসরে বিভিন্ন অঞ্চলের ম্যাপ প্রস্তত করেন, পরে বাংলা তথা ভারত থেকে একেবারে দেশে ফিরে যাওয়ার পর সে সব ম্যাপ একত্র্রে সন্নিবেশিত করে ১৭৭৯ সালে তিনি প্রকাশ করেন সুবিখ্যাত এ্যাটলাস অব বেঙ্গল, সংগে একটি স্মৃতিকথা। নামে এ্যাটলাস অব বেঙ্গল হলেও এর পরিধি ছিল বাংলা বিহার উড়িষ্যা ছাড়িয়ে উত্তর ভারতের প্রায় সমগ্র অঞ্চল। মেমোয়ারের পরিশিষ্টাংশে তিনি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর খুটিনাটি বিস্তারিত বিবরন দিয়েছেন। সরকারী নির্দেশ অনুযায়ী তিনি জরিপের বিস্তারিত বর্ননা করে নিয়মিত রিপোর্ট প্রদান করেছেন, সে সব নিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙল ১৯১০ সালে জার্নালস অব জেমস রেনেল নামে একটি বই প্রকাশ করে। যদিও এটি প্রকাশকালে রেনেলের দেখা বাংলা ও ভারতের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ভৌগলিক ক্ষেত্রে আমুল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তবু এর অপরিসীম ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এটা প্রকাশ করা হয়। এতে তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন স্থান, সড়কপথ, নদী ও নদীপথের বিবরনর উঠে এসেছে। সে সময়ের দৈনন্দিন আবহাওয়া, ঝড়-বৃষ্টি এবং বায়ুপ্রবাহেরও তিনি বর্ননা করেছেন দিন তারিখ উল্লেখ করে। এই আড়াইশো বছরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তো বটেই, তৎকালীন বাংলার ভৌগলিক কাঠামো ও বিন্যাসে আমূল পরিবর্তন হয়ে বাংলার অনেক স্থানের এখন আর কোন হদিশ পাওয়া যাবে না। তখনকার অনেক গুরুত্বপূর্ন স্থান এখন গুরুত্ব হারিয়ে গন্ডগ্রামে পরিনত হয়েছে, আবার অভ্যূদয় ঘটেছে নতুন নতুন গুরুত্বপূর্ন স্থানের।


এ্যটলাস অব বেঙ্গলের বাংলাদেশ অংশ

পরবর্তীতে আধুনিক ও মানসম্পন্ন মানচিত্রের অভ্যুদয়ের আগে পর্যন্ত অনেকদিন ধরে রেনেলের মানচিত্রটি ছিল বৃটিশদের প্রধানতম নির্দেশিকা। বাংলার আধুনিক ভৌগলিক ম্যাপ এর সাথে রেনেলের ম্যাপটি মিলিয়ে দেখলে নদীমাতৃক বাংলার বিবর্তনের ব্যাপারটি পরিস্কারভাবে ফুটে ওঠে। বাংলার প্রধান প্রধান নদীসমূহ যেমন- পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, মেঘনা, তিস্তা, করতোয়া, গড়াই ইত্যাদি নদীগুলোর গতিপথে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন, যা বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তখন ব্রহ্মপুত্র নদীটি এর পুরাতন খাত ধরে, অর্থাৎ এখনকার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র খাত ধরে ময়মনসিংহের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দুলালপুর ঘাট(এখনকার ভৈরবের কাছাকাছি) নামক একটি স্থানে মেঘনার সাথে মিলিত হত এবং মেঘনা নামেই সাগর অবধি প্রবাহিত হতো। এখন পদ্মা নদী দৌলদিয়ার কাছে যমুনার সাথে মিলিত হয়, তবে সে সময় এখনকার যমুনা নদীর কোন অস্তিত্ব ছিল না, ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী যবুনা নামে প্রবাহিত হয়ে নুলশীর কাছে করতোয়া নদীর সাথে মিশতো, ব্রহ্মপুত্রের অন্য একটি শাখা নদী ছিল ঝিনাই। ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্প এবং প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর যবুনা নামের সেই ছোট্ট শাখা নদীটিই ঝিনাই এর সাথে যুক্ত হয়ে ব্রহ্মপুত্রের প্রধান প্রবাহে পরিনত হয় এবং গোয়ালন্দে এসে পদ্মার সাথে মিলিত হয়। তিস্তা এখন চিলমারীর সামান্য ভাটিতে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয়, কিন্তু সে সময়ে বাংলায় তিস্তা নামে বড় কোন নদী ছিল না। হিমালয়ে উৎপন্ন তিস্তা সিকিম হয়ে বাংলায় এসে বহু ধারায় বিভক্ত হয়ে বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, মালদা, বগুড়া, পাবনা, ঢাকা জেলাসমূহের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো, প্রধান খাতগুলো ছিল পূর্নভবা, মানস, ঘাঘট, আত্রাই আর করতোয়া নদী। তিস্তা নামেও একটা ক্ষীণ ধারা প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হত, কালক্রমে এখন সেটাই বাংলাদেশের একমাত্র তিস্তা নদী। তখন তিস্তার একক অস্তিত্ব না থাকলেও পৌরানিক সূত্রে এ নামটির একটি পরোক্ষ অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তিনটি প্রধান ধারায় প্রবাহিত বলে এর নাম ছিল ত্রিস্রোতা, সেই থেকে পরবর্তীতে তিস্তা। পূর্নভবা, আত্রাই ও করতোয়া এবং ছোট ছোট আরও বহু শাখা প্রশাখা যখন তিস্তার আকস্মিক ব্রহ্মপুত্রে গমনের কারনে জলপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়া জেলার বিস্তীর্ন অঞ্চলের ছোট ছোট নদীগুলোর নানা অংশ মজে গিয়ে সৃষ্টি করে বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলন বিল। অবশ্য নাটোর ও পাবনা জেলায় আলাদা আলাদা ভাবে বেশ কিছু বিলের অস্তিত্ব অনেক আগে থেকেই ছিল, চলন নামেও একটি বড় বিলের অস্তিত্ব ছিল।
করতোয়া এখন হুরাসাগরের সাথে মিলিত হয়ে যমুনায় গিয়ে মিশেছে, কিন্তু তখন জাফরগঞ্জের কাছে ধলেশ্বরী নদীতে পানি সরবরাহ করতো। এখনকার গড়াই নদী তখন ছিল একটি ছোট খাল মাত্র, রেনেলের ভাষায় কুস্তি(কুষ্টিয়া) নামক একটি বৃহৎ গ্রামের নামে সে খালের নাম কুস্তি খাল। ব্রহ্মপুত্র এসে পদ্মার সংগে মিশে যাবার পর উজানে পদ্মার একটি ছোট্ট শাখা কুস্তি খাল ধীরে ধীরে বৃহৎ গড়াই নদীতে পরিনত হয়ে উঠে। এখন চাঁদপুরের কাছে পদ্মা-যমুনার মিলিত ধারা মেঘনার সাথে মিলিত হয়, কিন্তু তখন লক্ষীপুরের ভাটিতে পদ্মার সংগে ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার মিলিত ধারা কয়েকটি শাখার মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল, কিন্তু নদী দুটির মূল ধারা আলাদা আলাদাভাবেই সমুদ্র পড়তো। এখনকার টাঙ্গাইল, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ জেলাগুলো যমুনা তীরবর্তী অঞ্চল, কিন্তু তখন এ জেলাগুলোর আশেপাশে বৃহৎ নদী যমুনার চিহ্ন মাত্র ছিল না, অনেক দূরে ছিল ব্রহ্মপুত্র। জামালপুর এবং টাঙ্গাইল জেলার সমুদয় অংশ এখন যমুনার পূর্ব পারে অবস্থিত, কিন্তু তখন ছিল ব্রহ্মপুত্রের অনেকটা পশ্চিমে। ভাওয়াল ও মধুপুর গড় এখন যমুনা থেকে বহু পূর্বে, কিন্তু তখন ছিল ব্রহ্মপুত্রের সামান্য পশ্চিমে।

মুর্শিদ কুলি খাঁ প্রবর্তিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সুবা বাংলা বিহার ও উড়িষ্যা তেরটি চাকলায় বিভক্ত ছিল, এর মধ্যে ভুষণা, যশোর, মুর্শিদাবাদ, ঘোড়াঘাট, কুড়িবাড়ী, জাহাঙ্গীরনগর, সিলেট ও ইসলামাবাদ চাকলাগুলো সম্পূর্ন বা আংশিকভাবে বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত ছিল। চাকলাগুলো বিভক্ত ছিল পরগনায়। জমিদারেরা এক বা একাধীক পরগনা ইজারা নিয়ে প্রজাদের কাছ থেকে কর আদায় করতো এবং তা থেকে নিদ্রিষ্ট অংশ সরকারকে প্রদান করতো। বড় বড় জমিদারদের একাধিক চাকলায় ছড়িয়ে থাকতো বহু পরগনার জমিদারী। নবাবী আমলেও এ অঞ্চল চাকলা ও পরগনায় বিভক্ত ছিল। রেনেলের ম্যাপ যখন প্রকাশিত হয়, তখন বৃটিশরা সবে নতুন করে প্রশাসনিক বিন্যাসের কাজ শুরু করেছে, তাই ম্যাপে চাকলা ও পরগনার যেমন উল্লেখ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বৃহৎ জমিদারী অঞ্চল, যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল অনেকগুলো পরগনা। আবার নতুনভাবে স্থাপিত ব্রিটিশ প্রশাসনিক দপ্তর অর্থাৎ ডিষ্ট্রিক্ট সমূহও চিহ্নিত হয়েছে। উত্তরে নবগঠিত রংপুর এবং দিনাজপুর ডিষ্ট্রিক্ট দুটি চিহ্নিত। রংপুরে গুরুত্বপূর্ন স্থান তিনটি, একটি রংপুর, অন্য দুটি উলিপুর এবং চিলমারী। রেনেল যখন ভূমি মানচিত্রটি অঙ্কন করেন, তখন ম্যাপে চিহ্নিত রংপুর অঞ্চলে সবে মাত্র বৃটিশ কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবে এখনকার কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের অনেক অংশ তখন ভিতরবন্দ এবং বাহিরবন্দ নামক দুটি পরগনার অন্তর্গত, যেগুলো আবার কামরুপ রাজ্যের অধীন। সে ম্যাপে এখনকার নীলফামারী, লালমনিরহাট এবং গাইবান্ধার অস্তিত্ব নেই, কুড়িগ্রাম সাধারনভাবে কিঞ্চিত ভিন্নভাবে নাম কুড়িগঞ্জ হিসেবে আছে। ম্যাপে রংপুরের অন্যান্য স্থানগুলো-যেমন কালপানি, ফারি, পাহাড়গঞ্জ, তিলবাড়ী, বাঘদুয়ার ইত্যাদি এখন একেবারেই অপরিচিত। দিনাজপুরে গুরুত্বপূর্ন স্থান দুটি- দিনাজপুর এবং বুড়াউল। ঠাকুরগাঁও কিংবা পঞ্চগড়ের নাম নেই, তবে গুড়গাঁ, তাড়াবাড়ী, রুপগঞ্জ, জারবাড়ী ইত্যাদি কিছু নাম আছে, এখনকার আধুনিক ম্যাপে সে স্থানগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই। রংপুর এবং দিনাজপুর ডিষ্ট্রিক্ট দুটি পূর্বে যে ঘোড়াঘাট চাকলার অন্তর্গত ছিল, ম্যাপে সে ঘোড়াঘাটও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। কুড়িবাড়ী চাকলার অন্তর্গত ছিল আসাম ও কুচবিহার। রংপুর ও ময়মনসিংহের বেশ কিছু পরগনা তখন ছিল কুড়িবাড়ী চাকলার অন্তর্গত। রংপুর-দিনাজপুরের দক্ষিনে রয়েছে চাকলা ঘোড়াঘাটের অবস্থান, বর্তমানে দিনাজপুর জেলাধীন তখনকার ঘোড়াঘাট ছিল বাংলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন নগর, ম্যাপেও তা সেভাবেই নির্দেশিত হয়েছে। ঘোড়াঘাট চাকলায় চারটি স্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ন- ঘোড়াঘাট, গোবিন্দগঞ্জ, শিবগঞ্জ এবং শেরপুর, এ চারটি স্থান এখন দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও বগুরা জেলার ৪ টি উপজেলা। ম্যাপে বগুড়া আছে, তবে তুলনামূলকভাবে একটি সাধারন স্থান। ম্যাপে এর দক্ষিনে চিহ্নিত হয়েছে ভাতুরিয়া অঞ্চল। ভাতুরিয়া নামে আলাদা কোন স্থান ম্যাপে নেই, এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ন স্থানগুলো হলো নবাবগঞ্জ, বোয়ালিয়া, পুঠিয়া, নাটোর, পাবনা, হান্ডিয়াল, বেলকুচি এবং নুলশি। নবাবগঞ্জ হলো এখনকার চাঁপাই নবাবগঞ্জ, হান্ডিয়ালে মোগল আমল থেকে অবস্থিত ছিল গুরুত্তপূর্ন সেনা ছাউনি, এখন পাবনার চাটমোহরের একটি গন্ডগ্রাম, নুলশির এখন আর কোন অস্তিত্ব নেই, সম্ভবতঃ যমুনায় বিলিন হয়ে গেছে। ম্যাপে শাহজাদপুর সাধারনভাবে আছে, তবে নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জ নেই।। বর্তমান রাজশাহী শহর তখন বোয়ালিয়া নামে চিহ্নিত, তবে রাজশাহী নামে একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ন অঞ্চল ম্যাপে আছে, যার অন্তর্ভূক্ত ছিল মুর্শিদাবাদ, বহরমপুর, কাশিমবাজার, জালঙ্গি ইত্যাদি স্থান। বস্তুতপক্ষে ভাতুরিয়ায় ছিল বাংলার বহু পুরাতন একটি রাজবংশ ভাদুরীদের বৃহৎ জমিদারী, রাজা গনেশ এই বংশেরই একজন নৃপতি। মুর্শিদকুলি খাঁর সময় ছল করে ভাতুরিয়ার জমিদারী রঘুনন্দন-রামজীবনেরা আত্মসাৎ করলে ভাতুরিয়া পরগনা সহ ভাদুরীদের সমুদয় ভূমি নাটোর রাজবংশের অধীনস্ত হয়ে যায়। ভাতুরিয়া ছাড়াও ম্যাপে রাজশাহী অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত সমস্ত অঞ্চল এবং মাহমুদশাহী পরগনা সে সময় ছিল নাটোরের রানী ভবানীর সম্পত্তি।

ঢাকা মোগল আমল থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন স্থান ছিল, নবাবী আমলেও সে ধারা অক্ষুন্ন ছিল। বৃটিশ আমলে নতুন প্রশাসনিক বিন্যাস অনুযায়ী ঢাকার অন্তর্ভূক্ত ছিল উত্তরে ময়মনসিংহ থেকে শুরু করে দক্ষিনে বরিশাল ও নোয়াখালীর সমুদ্রতট পর্যন্ত এবং ফরিদপুর অঞ্চল নিয়ে এর আয়তন ছিল আক্ষরিক অর্থেই বিশাল। নবাবী আমলে বর্তমান ফরিদপুরের রাজবাড়ী অঞ্চল ভূষনা পরগনার অন্তর্ভূক্ত ছিল, ম্যাপেও ভূষনা পরগনা স্থান পেয়েছে, তবে ফরিদপুর, শরিয়তপুর, মাদারিপুর বা রাজবাড়ী নামে কোন স্থান নেই, এ পরগনার গুরুত্বপূর্ন স্থান হিসেবে ম্যাপে রয়েছে ভূষনা এবং মাহমুদপুর। ঢাকা ছাড়া এ অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন স্থানগুলো হচ্ছে বেগুনবাড়ী, জঙ্গলবাড়ী, ধামরাই, ফিরিঙ্গিবাজার, সুতালুরি, বাকেরগঞ্জ, চাঁদপুর ও লক্ষীপুর। এখন বেগুনবাড়ীর কোন অস্তিত্ব না থাকলেও পরবর্তীতে এর পাশেই গড়ে উঠেছে ময়মনসিংহ শহর, জঙ্গলবাড়ী ছিল বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার একটি দুর্গনগর, এখন প্রায় অপরিচিত ফিরিঙ্গিবাজার ছিল পর্তুজীজদের আবাসস্থল ও গুরুত্বপূর্ন নগর। ঢাকা শহরের আশেপাশে উত্তর দিকে তেজগাঁও, সাভার এবং দক্ষিনে নারায়নগঞ্জ সহ পাথরঘাটা, রাজানগর, লরিকূল সহ আরও বেশ কিছু স্থানের নাম আছে যেগুলো এখন একেবারেই অপরিচিত। রাজানগর ছিল রাজা রাজবল্লভ প্রতিষ্ঠিত একটি অনুপম নগর, লরিকূল ছিল পর্তুগীজদের প্রতিষ্ঠিত একটি বানিজ্য নগর, এ দুটি কীর্তিই নাশ করেছে কীর্তিনাশা পদ্মা। ঢাকার উত্তরে এখনকার টাঙ্গাইল অঞ্চলে আতিয়া ও পুকুরিয়া নামক দুটি পরগনা নির্দেশিত আছে, আতিয়ার গুরুত্বপূর্ন স্থান কাগমারী আর পুকুরিয়ার মধুপুর, ম্যাপে টাঙ্গাইলের নাম নেই। ম্যাপে বরিশালের নাম সাধারনভাবে আছে, সেটি নাকি দুর্গাপুর খালের পারে অবস্থিত, কিন্তু নেই ঝালকাঠি, পটুয়াখালি, বরগুনা বা ভোলার নাম। নোয়াখালি বা চৌমহনি বলে কোন নামও নাই, তবে বেশ গুরুত্ব সহকারে আছে দক্ষিন শাহবাজপুর দ্বীপ।

নবাবী আমলের যশোর চাকলা বৃটিশ শাসনে এসে যশোর জেলা হিসেবে গঠিত হয় বৃহত্তর যশোর খুলনা অঞ্চল এবং মাহমুদশাহী পরগনা নিয়ে। মাহমুদশাহী পরগনার নলডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং কুমারখালি গুরুত্বপূর্ন স্থান হিসেবে ম্যাপে চিহ্নিত, কুষ্টিয়া সাধারনভাবে চিহ্নিত একটি বড় গ্রাম। যশোরের গুরুত্বপূর্ন স্থান হিসেবে ম্যাপে স্থান পেয়েছে মুরলী এবং রায়নাবাদ, তবে খুব সাধারনভাবে আছে খুলনার নাম। যশোর নামে কোন স্থানের উল্লেখ ম্যাপে নাই, তখন মুরলীই ছিল যশোর অঞ্চলের প্রশাসনিক সদর। মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা- এসব নাম ম্যাপে নেই।

সিলেট অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ন স্থান তিনটি- সিলেট, আজমিরিগঞ্জ ও জৈন্তাপুর। এ ছাড়া গোলাপগঞ্জ, লাতু, জুড়ি, বানিয়াচঙ্গ, আওরঙ্গপুর, ডালিমপুর, চাঁদপুর, বৈরাগীহাট সহ আরো যে সকল স্থান চিহ্নিত আছে তার অধিকাংশই এখন অপরিচিত নাম।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ন স্থান হলো- ইসলামাবাদ অর্থাৎ চট্টগ্রাম আর মাসকালি। মাসকালি মহেশখালীর অপভ্রংশ, ম্যাপে কক্সবাজারের অন্তর্ভূক্তি নেই, রামু এবং বড়পালং হল দক্ষিনের শেষ সীমা। ম্যাপে কুমিল্লা বেশ গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপিত, তবে এটি বাংলার সীমার বাইরে, ত্রিপুরায়।

নৌপথঃ বলাই বাহুল্য যে তখন নৌপথই ছিল বাংলার যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন। প্রধানতঃ নৌপথের তত্ব তালাশ করতে যেয়েই রেনেল বাংলার তৎকালীন ম্যাপ অংকনের প্রয়োজনীয়তা এবং অপরিহার্যতা উপলদ্ধি করেন। দেশের প্রধান প্রধান অঞ্চলগুলিতে যাতায়াতের জন্য একাধিক নৌরুটের বর্ননা তার লেখায় রয়েছে। কলকাতা থেকে ঢাকা চারটি নৌরুটের বিবরন রয়েছে, একটি জালঙ্গী থেকে গঙ্গা ধরে কুষ্টিয়া, পাবনা, ইছামতি নদী হয়ে বুড়িগংগা দিয়ে ঢাকা ৩৭০ মাইল। অন্য রুট দক্ষিনে বরিশাল হয়ে একটি এবং খুলনা অঞ্চল হয়ে আর একটি। বর্ষা মৌসুমে গঙ্গা নদী ব্যবহার না করে বিল ঝিলের মধ্য দিয়ে শর্টকাট আরেকটি রুটের বর্ননা দিয়েছেন এরকম- ঢাকা ফ্যাক্টরী ঘাট থেকে গড়ালটুলি, কলাতিয়া, শাপুর, সোনাপুর, পিয়ালপুর, গোয়ালপাড়া, চাউক, বক্সিটিয়া, সিংহাসন, বেরা হাট, পতিদহ, নারায়নপুর, মন্দাতুর, চাটমোহর, সেখান থেকে বড়াল নদী ধরে নাগরখালী, বনপাড়া, আড়ালি, নন্দনগাছি, সারদা হয়ে গঙ্গায়, অতঃপর জালঙ্গী হয়ে কলকাতা। বড়াল নদীর নাম বলেছেন সারদা খাল। চট্টগ্রামের জন্য রয়েছে পাঁচটি রুট- একটি ঢাকা হয়ে, অন্যটি সুন্দরবন হয়ে, একটি বরিশাল হয়ে, অন্য আর একটি খুলনা অঞ্চল হয়ে ইত্যাদি। সিলেটের জন্যও রয়েছে একাধিক রুট, এমনকি রংপুর দিনাজপুরের জন্যও রয়েছে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন নৌ রুট। আবার বর্ষা মৌসুম এবং শুকনা মৌসুমের জন্য আলাদা আলাদা রুট।

সড়ক পথ: প্রাচীনকাল থেকে ভারত তথা বাংলায় স্থলপথের দুরত্ব পরিমাপের জন্য একক হিসেবে ক্রোশ ব্যবহৃত হতো, রেনেলের সময়ও সারা বাংলায় এই পরিমাপই প্রচলিত ছিল, যদিও বিভিন্ন স্থানে এক ক্রোশ দৈর্ঘের পরিমান ছিল বিভিন্ন রকম। এক ক্রোশ ছিল কম বেশী দুই বৃটিশ মাইলের সমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সে সময় ইউরোপের রাস্তা সমূহে প্রচুর ব্রীজ কালভার্ট কালভার্ট ছিল, যেমনটা বাংলা বা ভারতে ছিল না। সারা বাংলায় বহুল ব্যবহৃত অসংখ্য সড়কের অস্তিত্ব ছিল, তবে সে সবই ছিল কাঁচা রাস্তা। এ্যাটলাস অব বেঙ্গল প্রকাশেরও আগে, ১৭৭৮ সালে রেনেল প্রকাশ করেন "Description of the Roads in Bengal and Bahar". এটা মূলতঃ বাংলা ও বিহারের প্রধান সড়কগুলোর বিবরন। কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা ও ঢাকা থেকে এ অঞ্চলের সকল গুরুত্বপূর্ন স্থানে গমনের জন্য স্থলপথের বিবরন রয়েছে এতে। ম্যাপে শুধু কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা, ঢাকা, সিলেট, ইসলামাবাদের সংযোগ সড়ক অর্থাৎ প্রধান সড়কগুলি চিহ্নিত। তবে এই বই এবং ম্যাপের সমন্বয়ে পরবর্তীতে এ্যান্ড্রু ডুরী অন্য একটি ম্যাপ প্রস্তুত করেন, যেখানে দেখা যায় বাংলায় জালের মত ছড়িয়ে রয়েছে অগনিত সড়কপথ।
কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত সড়কপথে বিভিন্ন স্থানের নাম এবং দুরত্ব বর্ননা করেছেন এইভাবে- দমদম, বারাসত, দত্তপুকুর, ঝাউবাড়ী, জানাপুল, মল্লিকপুর, চাঁদপাড়া, পোড়াবাড়ী, যাদুপুর, মুরলী, নীলগঞ্জ, রাজাপুর, মাহমুদপুর, জয়নগর, গোপালপুর, ফরিদপুর, হাজিগঞ্জ, ময়নাহাট, নবাবগঞ্জ, পাথরঘাটা হয়ে ঢাকা- মোট ১৭৯ মাইল, এর প্রতিটি স্থানের দুরত্বও আলাদাভাবে বলা আছে। পথে পদ্মা, ভৈরব, ইছামতি সহ বিভিন্ন নদীর কোনটি কোথায় কিসে পার হতে হবে তার উল্লেখ আছে। অন্য একটি রুটে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম তথা ইসলামাবাদ যাওয়ার স্থলপথের রুট দেখিয়েছেন কলকাতা-ঢাকা রুটের জয়নগর থেকে গর্দী, তামালাহ, রাজাপুর, পল্লীকূল, নূরপুর, রাজাবাড়ী, চাঁদপুর, বক্সীহাট, লক্ষীপুর, বিবিবাজার, হাজীপারা, চান্দেরগঞ্জ, করিমপুর, মিরাজপুর, ফেনী, জুড়িলগঞ্জ, মীরসরাই, সীতাকুন্ডু, কুমিরা, কদমরসুল, জাফরাবাদ হয়ে চট্টগ্রাম- মোট ৩১৬ মাইল। পথে মেঘনা সহ ছোট বড় নদীর কোনটি কোথায় কিসে পার হতে হবে তারও উল্লেখ আছে। এই সড়করুটের বর্ননায় বেশ কিছু স্থানের নাম আছে, যেগুলো ম্যাপে নেই। যেমন ঢাকা থেকে নাটোর রুটটি এইরকম- ঢাকা, শিবদিহাট, শ্যামপুর, সাভার, ধামরাই, কান্দাপুতুল, মির্জাহাট, পুকুলি, আটিয়া, সন্তোষ, গুন্ড্রুকপুর, বেলকুচি, দৌলতপুর, ব্রহ্ম-কপালিয়া, তারাস, বিয়াস, কুলাম, গোবিন্দপুর, নাটোর। এর মধ্যে দৌলতপুর এবং ব্রহ্ম-কপালিয়া এখন সিরাজগঞ্জ জেলার অখ্যাত গ্রাম, এ জেলারই অধিকাংশ মানুষ সহজে চিনবেন না। ঢাকা-সিলেট সড়কে উল্লখযোগ্য স্থানগুলো হলো- মুড়াপাড়া, বালিয়া, সাতগাঁও, নরসিংদি, নবীনগর, গাজীপুর, সোনারামপুর, কচুয়া হাট, লখাই, সুজাতপুর, বানিয়াচঙ, কন্নিপুর, আগনা, বনবাগ, সিলেট।

ম্যাপ সংক্রান্ত বিষয়াদি ছাড়া সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজিক বা অর্থনৈতিক বিষয়াদি তিনি তার কোন লেখায় উল্লেখ করেন নি। তবু ছিটেফোঁটা কিছু বিষয় চলে এসেছে, যেমন তিনি বলেছেন- ধারনা করা হয় বাংলার জলপথে নৌকা চালানোর জন্য ৩০০০০ মাঝি মাল্লার স্থায়ীভাবে চাকুরির সংস্থান হয়। এ দেশের এক কোটি অধিবাসীর জন্য প্রয়োজনীয় লবন ও অন্যান্য সকল দ্রব্যাদির প্রায় সমুদয় অংশ এই জলপথেই পরিবাহিত হয়। এর মধ্যে আন্তদেশীয় আমাদানী রফতানী যেমন ছিল, তেমনি ছিল দেশীয় কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যাদি, এ ছাড়া বিভিন্ন কারনে ভ্রমনও এতে অন্তর্ভূক্ত। ১৭৬৩ সালে সংঘটিত এক প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছাসের কথা তিনি বেদনাদায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যখন সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চল প্রানী ও বৃক্ষ সমেত পানির তোড়ে সম্পূর্ন ভেসে গিয়েছিল। গঙ্গার জলপ্রবাহ সম্পর্কে তিনি বলেছেন শুকনা মৌসুমে আশি হাজার কিউসেক এবং বর্ষায় চার থেকে লক্ষ পাঁচ লক্ষ কিউসেক পানি গঙ্গা দিয়ে প্রবাহিত হয়। শুকনো মৌসুমেরটি ঠিক হলেও বর্ষার পানিপ্রবাহ তার অনুমানের চেয়ে প্রায় চারগুন। এখনকার গড়াই নদী রেনেলের সার্ভের সময় ছিল সিকি মাইল চওড়া একটি খাল মাত্র, তবুও সেই খালের পাশেই তিনি বৃহৎ গ্রাম কুস্তিকে (বর্তমানের কুষ্টিয়া) রক্ষার জন্য ১২ ফুট উঁচু এবং ১৪ গজ চওড়া পাঁচ মাইল দীর্ঘ বাঁধ দেখতে পান। নিকটেই পাবনা নামে আরও একটি গ্রাম এবং পাবনা খাল নামে আরও একটি খালের কথা তিনি বলেছেন। এই অঞ্চল থেকে পদ্মার পূর্ব পার্শ্বে তিনি বহুদূর বিস্তৃত মনুষ্য নির্মিত একটি বড় বাঁধের উল্লেখ করেছেন। কুস্তি থেকে কলকাতা স্থলপথে ৬ দিনের পথ, কুস্তি থেকে খুলনা নৌকায় ১০ দিনের পথ। কুমার নদীপথে সার্ভের সময় তিনি নদীতে প্রচুর কুমীর আর কচ্ছপ দেখেছেন, এমনটা সুন্দরবনের কাছাকাছি অন্যান্য অঞ্চলেও দেখেছেন। বাংলার অনেক স্থানে, বিশেষতঃ দক্ষিনাঞ্চলে তিনি নতুন কিংবা পুরাতন প্যাগোডা দেখেছেন বলেছেন। সম্ভবত বাংলার মন্দির গুলোকেই প্যাগোডা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কারন কোন মন্দিরের উল্লেখ তিনি করেন নি, অবশ্য মসজিদেরও উল্লেখ করেন নি। সব অঞ্চলেই প্রচুর ধানের ক্ষেত এবং পানের বরজ দেখেছেন, প্রচুর সুপারী গাছও দেখেছেন, রংপুর অঞ্চলে প্রচুর তামাক চাষের কথা বলেছেন। পানের কথা এত বেশীবার বলেছেন যে এটা পড়ে অনেকের ধারনা হতে পারে বাংলার মানুষ বোধ হয় পান খেয়ে জীবন ধারন করতো। এর কারন সম্ভবত এই যে, পান-সুপারির কারবার থেকে সরকারের শুল্ক আদায় হতে পারে বিবেচনা করেই তিনি গুরুত্ব সহকারে এর উল্লেখ করেছেন।
যশোরের ঝিকরগাছা অঞ্চলের প্রসংগে তিনি বলেছেন এ অঞ্চলে এক ধরনের গাছ জন্মে যার নাম Cazir Gatch(খেজুর গাছ), এ থেকে এক ধরনের নিকৃষ্ট চিনি প্রস্তত হয়। বাংলার অন্য ফসলাদি, ফলাদি, বৃক্ষ বা পশু-পাখির কথা তিনি উল্লেখ করেন নি। বাকেরগঞ্জ সম্পর্কে বলেছেন এটা সদ্য মগ উপদ্রবমুক্ত একটা বড় ব্যাবসাকেন্দ্র। চাঁদপুর একটি ছোট কিন্তু প্রশিদ্ধ গ্রাম, ব্রম্মপুত্রের শাখা নয়াগঙ্গার তীরে অবস্থিত।

ইছামতি নদীর উপর তালতলায় তিনি একটি দীর্ঘ সেতু দেখেছেন, জানিয়েছেন যে সেতুটি বল্লাল সেন কতৃক নির্মিত বলে কথিত। পরে ইংরেজরা কলকাতা থেকে ঢাকায় বড় নৌকার চলাচলের সুবিধার্থে বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়। ১৭৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকার চতুর্দিকের অঞ্চল তিনি ৬-৭ ফুট জলমগ্ন অবস্থায় দেখেছেন। সে সময়ে ঢাকা থেকে ৩১ মাইল দূরে হাজীগঞ্জে যাওয়ার পথে গোটা পঞ্চাশেক গ্রাম দেখেছেন, যার সবই জলমগ্ন। রাজানগরের কাছে পদ্মা এবং ব্রম্মপুত্র ৮-১০ মাইল ব্যাবধানে প্রবাহিত হয়ে সাগরে পড়তো। অক্টোবর মাসে ঢাকায় বেশ শীত দেখেছেন, সকাল আট টা পর্যন্ত আবহাওয়া কুয়াশাচ্ছন্ন। তিনি নারিন্দা খালের উল্লেখ করেছেন, ঢাকা থেকে বের হয়ে এ খাল ধরেই তিনি ডেমরায় শীতলক্ষ্যার দিকে অগ্রসর হন, অধুনাবিলুপ্ত এ খালটি পরে ধোলাই খাল নামে পরিচিত হয়। দয়াগঞ্জ সেতুর কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন, ধোলাই খালের উপর এই সেতুটি ১৬৬৪ সালে নির্মিত হয়, পরে বৃটিশ আমলে এখানে অন্য একটি পুল নির্মান করা হয় যা লোহারপুর নামে পরিচিতি পেয়েছিল। শীতলক্ষ্যার নাম তখন শুধুই লক্ষ্যা, এ নদীর অত্যন্ত পরিস্কার জল দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। ঢাকার একটি বড় কামানকে দি গ্রেট গান উল্লেখ করে তার কিঞ্চিত বর্ননা দিয়েছেন, এর দৈর্ঘ ২২ফুট, ওজন ৬৪৮১৪ পাউন্ড, এর গোলার ওজন ৪৬৫ পাউন্ড(এটা আমাদের পরিচিত মীরজুমলার কামান নয়)।

নদীপথে চলাচলের জন্য তিনি যে বাহনটি সচরাচর ব্যবহার করতেন সেটা বাংলাদেশের অতি পরিচিত বজরা নৌকা, তিনি অবশ্য এর নাম বলেছেন Budgarow. এরকম শব্দবিভ্রাট আরো অনেক ক্ষেত্রে ঘটেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে মূল শব্দটি বুঝে ওঠাই মুশকিল। যেমন- রাজশাহী(Raujeshy), দিনাজপুর(Denagepour), ঘোড়াঘাট(Goragot), এগারসিন্দুর(Akarasonda), কুমারখালী(Comercalli), খুলনা(Culna), লক্ষীপুর(Luckipour), মহেশখালী(Mascalli), আড়িয়াল খাঁ(Arika), সুন্দরবন(Sunderbunds)।

রেনেল প্রাথমিকভাবে মানচিত্রটি খন্ড খন্ড ভাবে প্রস্তুত করেছিলেন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর স্বার্থের প্রয়োজনে। পরে অখণ্ড ম্যাপ এবং মেমোয়ার বানিজ্যিক ভাবে প্রকাশ করেন ভারতে গমনেচ্ছু ব্রিটিশ নাগরিকদের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু ঘটনাক্রমে সেটাই বাংলার প্রথম নির্ভরযোগ্য কোন মানচিত্র। এবং এটা শুধুই একটা মানচিত্র নয়, বাংলার এক যুগসন্ধিকালের এটি জীবন্ত দলিলও বটে।

আব্দুল্লাহ এ এম

বিঃ দ্রঃ রেনেলের ম্যাপটি বড় আকৃতিতে দেখা যেতে পারে এখানে-

তথ্যসূত্রঃ
১. A Description of the Roads in Bengal and Bahar ..... James Rennel
২. Memoir of a Map of Hindoostan ..... James Rennel
৩. A Bengal Atlas containing Maps.........James Rennel
4. The Journal of Major James Rennel
5. The surveys of Bengal by James Rennel........F.C. Hirst
6. Dynamic environmantal changes in Bengal.........Pat Saunders and Graham Chapman
7. বিভিন্ন জেলার গেজেটিয়ার ও ইতিহাস
৮. অন্যান্য অন্তর্জালিক নিবন্ধ।

ছবিসূত্রঃ ইন্টারনেট


মন্তব্য

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

বাহ, চমৎকার... হাসি

[সব জায়গায় বদলে যাও, বদলে দাও... শান্তির মায়ে আসলেই মরছে মন খারাপ ]

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

হিমু এর ছবি

চলুক

খুবই ইন্টারেস্টিং।

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনার ভাল লেগেছে জেনে খুশী হলাম।

আব্দুল্লাহ এ এম

অতিথি লেখক এর ছবি

চলুক
চমৎকার লেখা। কত কি জানলাম। খুব ভাল লাগল।
- একলহমা

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনার ভাল লেগেছে জেনে ভাল লাগলো, ধন্যবাদ!

সত্যপীর এর ছবি

মারাত্মক হাততালি

এখন প্রায় অপরিচিত ফিরিঙ্গিবাজার ছিল পর্তুজীজদের আবাসস্থল ও গুরুত্বপূর্ন নগর।

বিবিধ ফিরিঙ্গিপট্টি নিয়া আমি একটা জিনিস ভাবি, ঢাকায় (বা সন্দ্বীপ/চিটাগং বা সুন্দরবন এলাকায়) এদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা কি ছিল? এরা (পর্তুগীজ আর্মানি ইত্যাদি আগন্তুক, লোকাল ফিরিঙ্গি নয়) কি কাজ চালানোর মত বাংলা জানত, নাকি এলাকার লোকে কিছু ইয়োরোপীয় ভাষা শিখেছিল, নাকি মাঝামঝি কিছু একটা চলত? দেশের ফিরিঙ্গিদের ভাষাবিষয়ক কিছু কি চোখে পড়েছে আব্দুল্লাহ ভাই?

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

সাধারনভাবে স্মৃতি থেকে(মানে বইপত্র পাঠের স্মৃতি আর কি) আপাততঃ বলতে পারি প্রথম দিকে তাদেরকেই এদেশের ভাষা কাজ চালানোর মত করে শিখে নিতে হয়েছিল। পরে তাদের সংস্পর্শে আসা এ দেশের কিছু মানুষ তাদের ভাষাও শিখে ফেলে, বিশেষতঃ পর্তুগিজরা দাস হিসেবে যাদের আটক করেছিল তাদের মধ্যে কিছু মানুষকে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত এবং পর্তুগীজ ভাষায় পারদর্শী করে তুলেছিল। আবার ইংরেজ আমলে পেশাগত সুবিধার কথা চিন্তা করে এ দেশীয় কেউ কেউ যেমন ইংরেজী শিক্ষায় আগ্রহী হয়ে উঠেছিল, পর্তুগীজদের রমরমা সময়ে একই উদ্দেশ্যে কেউ কেউ পর্তুগীজ ভাষা রপ্ত করতো, এ দেশীয় কিছু মানুষের পেশা ছিল পর্তুগীজ দোভাষী হিসেবে কাজ করা।
জানি এ বিষয়ে আপনার আগ্রহ আছে, পরে আরো কিছু জানাতে পারবো বলে আশা রাখি।

আব্দুল্লাহ এ এম

বুড়া এর ছবি

খুব মূল্যবান লেখা, শুধু যোগ করতে চাই রেনেল দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন, তাঁর এক শিশুকন্যার কবরও আছে ঢাকায়।
রেনেলের কৃতিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণী হচ্ছে C.R.Markham লিখিত Major James Rennell and the Rise of Modern English Geography, 1895.
একটি অনুরোধ, আব্দুল্লাহ সাহেব যোগাযোগ করলে খুশি হবো

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনার মূল্যবান মন্তব্যে কৃতার্থ হলাম। ইনপুটের জন্য ধন্যবাদ! আপনাকে একটা মেল পাঠিয়েছি।

আব্দুল্লাহ এ এম

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

বাহ! দারুন তো !
অনেক কিছুই জানলাম। ধন্যবাদ।

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

Guest এর ছবি

বাহ। অনেক কিছু জানতে পারলাম। ঝকঝকে বর্ণনার জন্য লেখক কে ধন্যবাদ।

ইয়াসির আরাফাত এর ছবি

গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত আগ্রহ জাগানিয়া। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আব্দুল্লাহ এ এম

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আপনাকেও ধন্যবাদ!

তারেক অণু এর ছবি

চমৎকার পোষ্ট! আরও লিখুন --

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ! ঠিক আছে, লিখবো।

আব্দুল্লাহ এ এম

পথিক পরাণ এর ছবি

পাঁচ তারা।

আমাদের ভূমি জরীপের শুরুর দিকের (সি এস) কোন ইতিহাস আপনার কাছে আছে কি?

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

ওহ্, দারুণ, দারুণ একটা পোস্ট। অত্র এলাকার মিথ-ধর্ম-দর্শন-ইতিহাস-ভুগোল বিষয়ে আমার আগ্রহ অত্যন্ত প্রবল। আপনার পোস্ট থেকে অনেক কিছু জানা হলো।
আরও লিখুন, অনেক অনেক লিখুন। চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

শুভকামনা আব্দুল্লাহ ভাই।

এক কথায় অভিভূত!
অনেক অনেক ভালো একটি লেখা!
শ্রদ্ধাবোধ কী শুধু বাড়াবেন এভাবে?

ভালো থাকবেন। অনিঃশেষ। সবসময়।

দীপংকর চন্দ

রানা মেহের এর ছবি

চমৎকার একটা লেখা পড়া হলো।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।