One day in the life of Ivan Denisovich (আইভান ডেনিসোভিচের জীবনের একদিন) - পর্ব - ৫ : A novel by Alexander Solzhensitsyn

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: মঙ্গল, ০৪/০৪/২০১৭ - ৭:২৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

পর্ব = ৫

(পূর্ববর্তী পর্বের লিঙ্ক গল্পের শেষে)

১০৪ নম্বর দলটা মেরামত কারখানার একটা বড় ঘরে গেল যেটার জানালাগুলো গত শরৎকালেই ঘসেমেজে চকচকে করা হয়েছে আর সেটাতে ৩৮ নম্বর দলটা কংক্রিটের স্ল্যাব ঢালাইয়ের কাজ করছে। কিছু স্ল্যাব কাঠের ছাঁচের ভেতরে রাখা আর অন্যগুলো তারের জাল দিয়ে পোক্ত করে বানিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা। ছাদটা অনেক উঁচু আর মেঝেটা শুধুই মাটির। জায়গাটা একেবারে হিমশীতল হয়ে থাকতো, যদি না কয়লা জ্বালিয়ে উষ্ণ করে না রাখা হতো, অবশ্য সেটা কর্মীদের জন্য নয়, স্ল্যাবগুলো যাতে তারাতারি জমাট বাধঁতে পারে সেজন্য। সেখানে একটা থার্মোমিটারও আছে। এমনকি রোববারগুলোতেও, কেও যদি কোন কারনে নাও আসে, একজন সিভিলিয়ানকে সেখানে রাখা হয় শুধু উনুনটা জ্বালিয়ে রাখার জন্য। ৩৮ নম্বর দলের লোকেরা স্বাভাবিকভাবেই বাইরের কাউকে উনুনের আশেপাশে বসতে দিতে আগ্রহী না। তাদের দলের লোকেরাই সেটার চারপাশে বসে পায়ে প্যাঁচানোর ন্যাকরাগুলো শুকোচ্ছে। কি আর করা, ওই কোনায় বসা যায়, ওই জায়গাটাও খারাপ না।

সূখোভ এককোনে তার দুমড়ানো প্যান্টটা নিয়ে বসার জায়গা খুঁজে পেল যেখানে ওরা বসে নি। একটা কাঠের ছাঁচের প্রান্তে, দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলো। সেটা করতে গিয়ে তার জ্যাকেট আর কোট একটু আঁটোসাটো ঠেকলো এবং সে অনুভব করলো কিছু একটা তার বুকে, হৃৎপিন্ডের কাছটায় খোঁচা দিচ্ছে। সেই সকালের খাবারের রেশনের অর্ধেকটা, তার জামার ভেতরের পকেটা রাখা, যেটা সে রাতের খাবারের সাথে খাওয়ার জন্য রেখে দিয়েছে। কাজে আসার সময় সে সবসময় একই পরিমান সাথে করে আনে এবং রাতের খাবারের আগ পর্যন্ত সেটা ছুঁয়েও দেখে না। কিন্তু সাধারনতঃ সে রুটির অর্ধেকটা সকালের খাবারের সাথেই খেয়ে নেয়। আজ তা করে নি। কিন্তু সে টের পেল, এই কৃচ্ছতা করে কোন লাভ হয় নি। এই উষ্ণতার মধ্যে বসে রুটির টুকরোটা তক্ষুনি খেয়ে ফেলার জন্য তার পেট চোঁচোঁ করছে। রাতের খাবারের আরো পাঁচ ঘন্টা বাকী, আর সময়ও যেন পা টেনে টেনে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে।

সেই বিরক্তিকর যন্ত্রনাটা এখন আগে থেকেই দূর্বল লাগতে থাকা পায়ের দিকে নামছে। ওহ্, এখন যদি শুধু একটা উনুন পাওয়া যেত!

সে মিটেন্স জোড়া খুলে হাঁটুর উপর রাখলো, কোটের বোতামগুলো খুললো, ঠান্ডায় জমে যাওয়া মুখ ঢাকার কাপরের টুকরোটার ফিতেটা খুললো, তারপর সেটাকে বেশ কয়েকটা ভাঁজে ভাঁজ করে হাঁটুর কাছে পকেটে ভরে রেখে দিলো। তারপর সে রুটির টুকরোটা বের করার জন্য হাত ঢোকালো। এক টুকরো পরিষ্কার কাপরে প্যাঁচানো রুটির টুকরোটা সে সাবধানে বুক বরাবর ধরলো যাতে একটা ছোট্ট কনাও মাটিতে না পড়ে, তারপর সেখান থেকে খুঁটে খুঁটে নিয়ে চিবোতে লাগলো। দুই পরত কাপরের নিচে থাকাতে রুটিটা শরীরের ছোঁয়ায় বেশ উষ্ণ হয়ে আছে, বাইরের হিম সেটাকে ছুঁতেও পারে নি।

ক্যাম্পের জীবনে বহুবার তার মনে পড়েছে, সেই গ্রামের জীবনে সে কিভাবে খাওয়াদাওয়া করতো। পুরো একটা সসপ্যান ভর্তি আলু, পট ভর্তি যবের জাউ আর, যৌবনে বড় বড় মাংসের টুকরো। আর এত বেশী দুধ খেত যেন একেবারে নাড়িভুঁড়ি ফেটে বেড়িয়ে যাবে। কিন্তু ক্যাম্পের জীবনে সে শিখেছে, খাওয়াদাওয়া করার সঠিক নিয়ম সেটা না। খাওয়াদাওয়া করতে হবে খুব মনোযোগ দিয়ে – ঠিক এখন যেভাবে খাচ্ছে সেভাবে, একটু একটু করে খুঁটে মুখে পুরে জিভ দিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে ক্বাথের মত করতে হবে, তারপর দু গালের সাহায্যে চুঁষে খেতে হবে। আর এভাবে এই স্যাঁতস্যাঁতে কালো রুটিটা খেতে কি যে দারুন লাগে! এই আট; না, না, আট বছরের বেশী সময়ে সে কিই বা তেমন খেতে পেয়েছে? বলতে গেলে কিছুই না। কিন্তু কি খাটনিটাই না খাটতে হয়েছে? আহ!

তো সে সেখানে বসেই সমস্ত মনোযোগ দিয়ে রুটির টুকরোটা সাবাড় করতে লাগলো, যখন তার ১০৪ নম্বরের বাকীরা রুমের একই পাশে তার কাছাকাছি বসে রয়েছে।

দুই এস্তনিয়, একেবারে দুই ভাইয়ের মত আপন, একটা সমতল কংক্রিটের প্যানেলের উপর বসে একটা আধখাওয়া সিগারেট একই হোল্ডার দিয়েই ভাগাভাগি করে টানছে। এই দুই এস্তনিয়ের গায়ের রঙ একই রকম ফর্সা, একই রকম লম্বা, একই রকম হ্যাংলা-পাতলা, দুজনের নাকও একই রকম খাড়া আর একই রকম বড়বড় চোখ। দুজন একসাথে এমন ঘনিষ্টভভাবে ঘোরাফেরা করে যেন ঠিক একই রকম বাতাসে দুজন শ্বাস না নিলে যেন মারা যাবে। তিউরিনও কখনো ওদের আলাদা করার চেষ্টা করে না। ওরা তাদের খাবার ভাগাভাগি করে খায়। দুটো পাশাপাশি বাংকের সবচেয়ে উপরের সারিতে ঘুমায়। সকালে যখন কাজের অপেক্ষায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়, রাতে যখন কাজ শেষে ফিরতে থাকে, তখনো দুজনে তাদের নিচু, সতর্ক ভঙ্গিতে গুজগুজ করে গল্প করতে থাকে। সত্যি বলতে কি, তারা দুজন আপন ভাই না। এখানে এই ১০৪ নম্বর দলেই তাদের প্রথম পরিচয়। তারা বলেছিল, তাদের একজন ছিল উপকূলের জেলে, আর আরেকজন ছোটবেলাতেই, যখন এস্তোনিয়ায় সোভিয়েতরা রাজত্ব করতো, তখন বাবা-মায়ের সাথে চলে গিয়েছিল সুইডেনে। কিন্তু সেখানে সে নিজস্ব মন-মানসিকতা নিয়েই বড় হয়েছিল এবং পড়াশূনা শেশ করার জন্য এস্তোনিয়াতেই ফিরে এসেছিল।

যাইহোক, যদিও সবাই বলে যে জাতপাতের ভেদ আসলে বড় কিছু না, এবং সব জাতের মধ্যেই খারাপ লোক থাকে, এস্তোনিয়দের মধ্যে সূখোভ একজনও খারাপ লোক দেখে নি।

বন্দীরা সবাই গোল হয়ে বসে আছে। কেউ বা প্যানেলের উপর, কেউ ছাঁচের উপর আবার কেউ সরাসরি মাটিতে। কিন্তু এই সাতসকালে কারোরই জিভ নড়ছে না। সবাই যার যার নিজস্ব চিন্তায় মগ্ন হয়ে চুপচাপ বসে আছে। ফেতিউকভ শেয়ালটা অন্যের ফেলে দেয়া সিগারেটের শেষাংশগুলো জোগাড় করে নিয়েছে (এমনকি পিকদানির মধ্যে থেকেও সে তুলে নিয়েছে, তার মধ্যে কোন তাড়াহুড়ো নেই)। এখন সে সেগুলো থেকে রয়ে যাওয়া তামাকগুলো এক টুকরো কাগজের উপর জড়ো করতে ব্যাস্ত। ফেতিউকোভের তিনটে বাচ্চা ছিল। কিন্তু সে সাজা পাওয়ার পর ওরা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার বউ আবার বিয়ে করেছে। তাই তাকে সাহায্য পাঠানোর কেউ নেই।

বুইনোভ্‌স্কি এতক্ষন তার উপর চোরা চোখে নজর রাখছিল। শেষতক হাঁক দিয়ে উঠলো, “এই ব্যাটা করছিস কি, এ্যাঁ? যত্তোসব ময়লা-আবর্জনা কুড়িয়ে বেড়াচ্ছিস? এসব করলে তোর ঠোঁটে সিফিলিস হবে, জানিস? বন্ধ কর!”। ক্যাপ্টেনের অবশ্য অন্যের উপর একটু হুকুমদারী করার অভ্যাস আছে।

ফেতিউকোভের তাতে বয়েই গেল। ক্যাপ্টেনের জন্যেও বাইরে থেকে কেউ কিছু পাঠায় না। এবং লালা ঝরা ঠোঁটে সে একটা কুটিল হাসি দিয়ে বললো, “অপেক্ষা কর, ক্যাপ্টেন। যখন আট বছর ধরে এখানে কাটাবে, তখন তুমি নিজেই এরকম করে কুড়িয়ে খাবে। তোমার চেয়ে অনেক বড় বড় তালেবড় দেখা হয়ে গেছে আমাদের”।

তুলনাটা ফেতিউকোভ নিজের অবস্থান থেকে করছে। হয়তো ক্যাপ্টেন তার ক্যাম্পের জীবনটা সম্মানের সাথেই কাটিয়ে দিতে পারবে।

তর্কের বিষয়টা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে সেনকা ক্লেভশিন “কি? কি?” বলে প্রশ্ন করে উঠলো। সেনকা কানে খাটো এবং মনে করেছিল আলোচনাটা আসলে তল্লাশির সময় বুয়নভোস্কির দূর্ভাগ্যের বিষয়ে হচ্ছে। “এত দেমাগ দেখানোটা একেবারেই উচিত নয়” সমবেদনার সাথে মাথা দোলাতে দোলাতে সে বললো “এটা এমনিতেই সমাধান করা যেত”।

সেনকা এক মৃদুভাষী দুর্ভাগা মানুষ। তার এককানের পর্দা ফেটে গিয়েছিল সেই ’৪১ সালে। তারপর তাকে আটক করা হলো, সে পালালো, আবার ধরা খেল, এবং তারপর তাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো বুকেনভল্ডে (Bouchenwald, ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সেন্ট্রাল জার্মানীর বুকেনভল্ড গ্রামের কাছে এক নাৎসি কন্সেনট্রেশান ক্যাম্প)। সেখানে সে একেবারে অলৌকিকভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে প্রান নিয়ে ফিরে এসেছিল আর এখন সে এখানে তার বন্দী জীবন কাটাচ্ছে, নীরবে। “যদি তুমি বেশী গোঁয়ার্তুমি কর,” সে বললো, “তাহলে তুমি শেষ”।

তার কথার সত্যতা আছে। একটু গাঁইগুঁই করে আত্নসমর্পন করে ফেলাটাই ভালো। বেশী গোঁয়ার্তুমি করলে ওরা তোমাকে একেবারে সিধে করে ছেড়ে দেবে।

আলয়োশা চুপচাপ বসে আছে। দুহাতের মাঝে মুখ ডুবিয়ে। প্রার্থনারত।

সূখোভ তার রুটিটা একেবারে আঙ্গুল পর্যন্ত চেটেপুটে খেলো। শুধু বাকী রাখলো রুটির খোলশটা, আধখানা চাঁদের মত উপরের অংশটা। কারন এটা দিয়ে যেভাবে জাউয়ের বাটি চেঁছেপুঁছে খাওয়া যায়, পৃথিবীর কোন চামুচ দিয়েই সেভাবে করা সম্ভব না। সে খোলশটা আবার কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রাতের খাবারের জন্য ভেতরের পকেটে রেখে দিলো, বোতামগুলো ঠান্ডা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য লাগিয়ে কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে নিল। এবার পাঠাক তাকে কাজ করতে! অবশ্য, আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হলে ভালোই হয়।

৩৮ নম্বর দলটা উঠে দাঁড়ালো এবং ছড়িয়ে পরলো, কেউ কংক্রিট মেশানোর যন্ত্রের দিকে, কেউবা পানি আনতে, কেউবা কংক্রিট পোক্ত করার জালিগুলোর দিকে।

কিন্তু তাদের দলের পাভলো কংবা তিউরিনের তখনো দেখা নেই। এবং যদিও ১০৪ নম্বর মাত্র কুড়ি মিনিট মত হয় ওখানে বসে আছে, এবং শীতকালের কারনে দৈনিক কাজের সময় কমালেও সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়, তাদের অনেকেরই মনে হচ্ছে বিরল সৌভাগ্যের একটা ছোঁয়া তারা পাচ্ছে, আর সন্ধ্যাটাও মনে হচ্ছে বেশী দূরে নয়।

“এহ, বহুদিন তুষারঝড় হয় না” হাত নাড়িয়ে বলে উঠলো কিল্গাস, ঠোঁটকাটা লাল-মুখো লাটভিয়। “সারাটা শীত জুড়ে একটাও তুষারঝড় হলো না। এটা কি ধরনের শীতকাল ভাই?”

“হ্যাঁ... তুষারঝড়... তুষারঝড়” ওর কথার উত্তরে দলের অন্যান্যরাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুঞ্জন করে উঠলো।

এ অঞ্চলে তুষারপাত হলে অবশ্য ওরাও কয়েদীদের ব্যারাকের বাইরে বের হতে দিতে অনাগ্রহী থাকে। ব্যারাক-রুম আর মেস-হলের মাঝখানে একটা পথ-নির্দেশক দড়ি টেনে না দিলে মাঝপথেই কয়েদীদের হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। না, কয়েদিরা ঠান্ডায় মারা পড়লে ওদের কিছুই যায় আসে না, কিন্তু কেউ যদি পালিয়ে যেতে চায়? এরকম ঘটনা ঘটেছেও আগে। তুষার ধূলোর কনার মত মিহি হলেও ঝড়ের সময় জমা তুষার বরফের মত শক্ত। অনেকে এগুলোর উপর ভর করে কাঁটাতারের বেড়া টপকে অনেকে পালিয়ে গিয়েছিল। সত্য হচ্ছে তারা বেশীদূর পালিয়ে পারে নি।

ভালোভাবে চিন্তা করে দেখলে, এই তুষারঝড় কারো কোন উপকারেই আসে না। কয়েদীদের তালাবদ্ধ হয়ে বসে থাকতে হয়, কয়লার সরবরাহ আসতে দেরী হয়ে যায় আর ব্যারাকের সমস্ত উষ্ণতা বেরিয়ে যায়। ক্যাম্পের ময়দার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তারমানে কোন রুটির ব্যাবস্থা নেই, এবং প্রায়শঃই কোন গরম খাবারের ব্যাবস্থা থাকে না। এবং যতদিন ঝড় চলতে থাকে, তিনদিন, চারদিন, কিংবা এক সপ্তাহ, সেই দিনগুলি ছুটির দিন হিসেবে ধরা হয়, এবং অবশ্যই রোববারদিনগুলোতে কাজ করে পুশিয়ে দিতে হয়।

তারপরেও কয়েদীরা তুষারঝড় ভালোবাসে আর ঝর আসার জন্য প্রার্থনা করে। একটু বাতাস বইতে শুরু করলেই সবাই আকাশের দিকে তাকায়, নেমে আয়, নেমে আয়। যত বেশী তত ভালো।

তুষারই তারা চায়। জমিনের উপর হাওয়ার ছুটোছুটিতে আসলে কিছুই হয় না।

কেউ একজন ৩৮ নম্বরের স্টোভের কিনারার কাছাকাছি এগিয়ে গেল, তবে শুধুই বিতাড়িত হওয়ার জন্যই।

ঠিক তক্ষুনি তিউরিন সেখানে হেঁটে উপস্থিত হলো। তার চেহারা গম্ভীর। তার দলের সবাই বুঝে গেল যে কিছু একটা করতে হবে এবং দ্রুত।

“হুম”, চারদিকে চোখ বুলিয়ে তিউরিন বললো, “সবাই উপস্থিত, ১০৪?”।

সে আর গুনে বা মিলিয়ে দেখার কষ্ট করলো না কারন তার দলের কারো কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। আর সময় নষ্ট না করে সে তার দলের সবাইকে যার যার কাজ বুঝিয়ে দিল। দুই এস্তোনিয়, সেনকা আর গপচিক, এদেরকে পাঠানো হলো বালি-সিমেন্টের মশলা মেশানোর জন্য হাতের কাছের বড় কাঠের বাক্সটা পাওয়ার স্টেশনে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা সবাই তক্ষুনি বঝতে পারলো যে তাদেরকে পাঠানো হচ্ছে অর্ধনির্মিত বিল্ডিংটাতে যেটার কাজ গত হেমন্ত পর্যন্ত করে ফেলে রাখা হয়েছিল।অন্যদের পাভলোর সাথে পাঠানো হলো যন্ত্রপাতি আনতে। চারজনকে আদেশ দেয়া হলে বেলচা দিয়ে পাওয়ার স্টেশন আর মেশিন-রুমে ঢোকার পথ, র্যা ম্পের ভেতরটা আর উপরের অংশ থেকে তুষার পরিষ্কার করে ফেলতে। কয়েকজনকে পাঠানো হল কয়লা বা টুকরো করা যায় এমন কাঠের তক্তা দিয়ে মেশিন-রুমের ভেতরের স্টোভটা জ্বালাতে। আরেক দলকে পাঠানো হলো একটা স্লেজে চাপিয়ে সিমেন্ট বয়ে আনতে। দুজনকে পানি, দুজনকে বালি আনতে, এবং আরো একজনকে মাটির উপর থেকে তুষার সরিয়ে শাবল দিয়ে ভাংতে বলা হলো।

কাজ পাওয়ার জন্য আর বাকী থাকলো কেবল সূখোভ এবং কিল্গাস, দলের প্রধান দুই কর্মী। তাদের ডেকে তিউরিন বললো, “আচ্ছা, ছেলেরা শোন (যদিও তার বয়স ওদের চেয়ে বেশী না, তবুও সে এভাবেই সম্বোধন করে অভ্যস্ত)। ৬ নম্বর দল গত হেমন্তে যতটুকু কাজ করে গেছে, রাতের খাবারের পর তোমরা সেখান থেকে দোতালার দেয়ালের গাঁথনি দেয়া শুরু করবে এখন আমাদেরকে চিন্তা করে বের করতে হবে কিভাবে মেশিন-রুমটাকে উষ্ণ রাখা যায়। এটার তিনটা বড় জানালা আছে, আর প্রথম কাজ হচ্ছে এদের কপাটগুলোকে যেকোন ভাবে উপরে তুলে জায়গামত লাগানো। আমি তোমাদের সাহায্য করার জন্য লোকজন দেব, কিন্তু তোমাদের চিন্তা করে বের করতে হবে কিভাবে কপাটগুলোকে তুলে লাগাবে। আমরা মেশিন-রুমটাকে মর্টার মেশানোর জন্য, সেই সাথে নিজেদের উষ্ণ রাখার জন্যেও ব্যাবহার করবো। নিজেদের উষ্ণ না রাখতে পারলে একেবারে কুকুরের মত ঠান্ডায় জমে যেতে হবে, বুঝতে পেরেছ?”

সে হয়তো আরো কিছু বলতো, কিন্তু তখনি গপছিক এসে হাজির, সে ষোল বছরের এক ইউক্রেনিয় বালক একেবারে দুগ্ধপোষ্য শুকরছানার মতই গোলাপী। তার অভিযোগ, অন্য দলের লোকেরা তাকে বাক্স দিতে চাচ্ছে না। এ নিয়ে একটা ঝগড়াঝাটিও বেঁধে গেছে। তো তিউরিন সেদিকে হাঁটা ধরলো।

এরকম একটা কনকনে ঠান্ডা দিনে কাজ শুরু করা যেমন কঠিন, তেমনি গুরুত্বপুর্ণ হচ্ছে কাজ চালিয়ে যাওয়া।

সূখোভ আর কিল্গাস দৃষ্টি বিনিময় করলো। বহুবার তারা জুটি হিসেবে কাঠমিস্ত্রি আর রাজমিস্ত্রির কাজ করেছে, এবং দুজনের পরস্পরের প্রতি তৈরী হয়েছে শ্রদ্ধাবোধ।

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী

পর্ব ৪ = http://www.sachalayatan.com/guest_writer/56453
পর্ব ৩ = http://www.sachalayatan.com/guest_writer/56431
পর্ব ২ = http://www.sachalayatan.com/guest_writer/56426
পর্ব ১ = http://www.sachalayatan.com/guest_writer/56419


মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

সময়ের টানাটানিতে প্রথম পর্বের পরে আর পড়া হয়ে ওঠেনি। সে পর্বটি ভালো লেগেছিল, তাই তাড়াহুড়ো করতে চাইনি। সব কটা পর্ব পড়ে নিয়ে ফিরে আসব।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য এবং পরবর্তী পর্বগুলো পড়ার প্রতিশ্রুতির জন্য অনেক ধন্যবাদ। পড়ার পর মূল্যবান মতামত জানালে উপকৃত হব।

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA