জামান সাহেবের ধমক

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শুক্র, ১২/০৪/২০১৯ - ১২:২১পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


অধ্যাপক লতিফ সাহেব চায়ের দোকানে বসে আছেন। গলির সেলুনে সিরিয়াল দিয়ে এসে বেশ কিছুক্ষণ হল এখানে বসেছেন। শেভ করে বাসায় ফিরবেন। এরই মধ্যে পাশের বাসার জামান সাহেব এশার নামাজ শেষ করে এসে তার সাথে যোগ দিলেন। এক গলিতে থাকলেও তাদের মাঝে যে খুব কথা হয়, তেমন নয়। এটা-সেটা নিয়ে কথা বলতে বলতে একসময় ছেলেমেয়ে নিয়ে কথা উঠল।

জামান সাহেব নিজের পাকা গোঁফে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “লতিফ ভাই, আপনার তো দুই মেয়ে এক ছেলে। কি করছে তারা এখন?” লতিফ সাহেব চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, “বড় ছেলেটা তো লন্ডনে এমবিএ করলো, মেঝো মেয়েটা মাত্রই আমেরিকা থেকে পিএইচডি করে ওখানেই পোস্ট ডক ধরল...” এতটুকু বলে লতিফ সাহেব থামলেন। কৌতূহল আটকে রাখতে না পেরে জামান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “আর ছোটো মেয়ে? ও কি করছে এখন?” লতিফ সাহেব চায়ের কাপটি দোকানদারকে ফেরত দিয়ে জামান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ছোটো মেয়েটা একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকুরী করছে।” জামান সাহেব উত্তর শুনে খুশি হলেন নাকি হলেন না, বোঝা গেলো না। আবার জিজ্ঞেস করলেন, “বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন ছোটো মেয়েটার?” লতিফ সাহেব শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “না ভাই। মাত্র তো ক্যারিয়ার শুরু করলো। একটু নিজের পায়ে দাঁড়াক। আর আমরাও একটু কাছে পাই। বাসায় তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে এই মেয়েটাই তো শুধু দেশে আমাদের সাথে থাকে। বাকিরা তো বাবা-মা কে ভুলে দেশের বাইরে পড়ে আছে।”

জামান সাহেব একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। ছেলেমেয়েগুলোকে আজকাল দেশের বাহিরে পাঠালে আর দেশে ফিরে আসতে চায় না। দেশ-মাটির গন্ধ ভুলে অন্য দেশে পড়ে থাকে। লতিফ সাহেব ‘ভাই, উঠি আজকে’ বলে উঠে দাঁড়ালেন। জামান সাহেব নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে ‘আরেকটু বসতেন’ বলাতে লতিফ সাহেব জানালেন, মেঝো মেয়েটা দেশে ফিরেছে এক মাসের ছুটিতে। বোঝালেন, তাঁর যাওয়া জরুরি। সাথে সেলুনে কি অবস্থা তা একবার দেখে আসা দরকার। এরা সুযোগ পেলেই সিরিয়াল ভেঙ্গে আরেকজনকে বসিয়ে দেয়।

জামান সাহেব তাঁর টাক মাথায় ঘাম আর কপালে ছোট্ট একটা ভাঁজ নিয়ে বাসায় ফিরে আসলেন। এক গলিতে থাকার কারণে লতিফ সাহেবকে অনেক বছর ধরেই চেনেন তিনি। ভদ্রলোক অমায়িক এবং বিচক্ষণ লোক। বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞানের অধ্যাপক। সবসময় চেষ্টা করেন অযথা আপত্তিকর পরিস্থিতি থেকে এড়িয়ে চলার। যেখানে প্রয়োজন নেই, বাড়তি কথা বলে নিজেকে জাহির করেন না তিনি। তাঁর মত মানুষের সন্তানগুলো কেন দেশে ফিরে আসে না তা তিনি ভেবে পেলেন না। এরা দেশে না ফিরলে দেশ এগোবে কি করে?

জামান সাহেব নিজেও কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিনপ্রযুক্তির উপরে পিএইচডি আর আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড থেকে এক বছর পোস্ট-ডক করে দেশে ফিরেছেন ১০ বছর হল। এখন সিনিয়র বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত আছেন দেশেরই একটা এনজিওতে। গত ১০ বছরে তার গবেষণার জের ধরে দেশের জন্য অনেক সাফল্য নিয়ে এসেছেন তিনি। লতিফ সাহেবের মেঝো মেয়ে শিউলিকে জামান সাহেব বেশ ভালোভাবেই চেনেন। মেয়েটা যে দেশের একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অণুজীববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করেছে, তা জামান সাহেবের পরামর্শেই। তখন উনি মাত্র দেশে ফিরেছিলেন। যেহেতু উনি নিজে বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের মানুষ, শিউলিকেও তিনি তা নিয়েই পড়ার উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন মেয়েটা প্রবাসী। এটা যেন তাঁরই অপরাধ। জামান সাহেব ভাবলেন, যেহেতু দেশেই আছে, মেয়েটাকে ভালোমত একটা ধমক দিয়ে আসা দরকার। সিদ্ধান্ত নিলেন পরদিন অফিস থেকে আসার পথে একবার লতিফ সাহেবের বাসায় ঘুরে আসবেন।


জামান সাহেব কলিংবেল চাপার সাথে সাথেই লতিফ সাহেব দরজা খুলে দিলেন। জামান সাহেব একটু অবাকই হলেন। সন্ধ্যার সময়টায় লতিফ সাহেব কখনই বাসায় থাকেন না। মাগরিবের নামাজ পড়ে এশা পর্যন্ত মসজিদেই বসে থাকেন। এশার নামাজ পড়ে এক কাপ চা খেয়ে তবেই বাসায় ফেরেন ভদ্রলোক। কিন্তু আজ লতিফ সাহেব বাসায় আছেন। শরীরের সাদা ফতুয়া আর পায়জামা দেখে মনে হচ্ছে, লতিফ সাহেব আজকের নামাজটাও মসজিদে না পড়ে বাসায় পড়েছেন। বের হন নি ভদ্রলোক বাসা থেকে আজ। খুব সম্ভবত মেয়ে বাসায় আছে বলেই হয়ত। লতিফ সাহেব মুখে একটা হাসি দিয়ে জামান সাহেবকে ভেতরে ঢুকতে বললেন, যেন তিনি জানতেন আজকে জামান সাহেব আসবেন।

ড্রয়িং রুমটা বেশ সাজানো। বেশ চওড়া একটা রুম। ঘরের কোণায় একটা শো-কেস। একপাশে সুন্দর করে সোফাসেট সাজানো আর তার সামনের দেয়ালে অনেক বড় একটা এলইডি টিভি। সন্ধ্যার খবর হচ্ছে। সংবাদ পাঠিকা এক নাগাড়ে দেশের যাবতীয় সমস্যা স্ক্রিপ্ট দেখে পড়ে যাচ্ছেন। জামান সাহেব একটু বিরক্ত হয়ে ঘরের অন্যদিকে খেয়াল করলেন। রুমের বাকি দেয়ালগুলো সাজানো হয়েছে নানারকম ছবির ফ্রেম দিয়ে। একটি ফ্রেমে শিউলির ছবি দেখে কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। সন্তানদের সারাজীবনের অর্জনগুলো যেন এক দেয়ালে বাঁধাই করে রেখেছেন লতিফ সাহেব। ছবি আর শো-কেসে রাখা জিনিসপত্র দেখে জামান সাহেবের মেজাজ যেন আরও বিগড়ে গেল। এ যেন ঘর ভর্তি করে রাখা আলো। বড় ছেলে এমবিএ করেছে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে। বিজনেস স্কুলগুলো সম্বন্ধে যাদের সামান্যতম জ্ঞান আছে, তাদের কাছে এই স্কুলের নাম অজানা নয়। শিউলি প্রাণরসায়নে পিএইচডি করেছে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকো থেকে। এছাড়াও অনেক অনেক অর্জন। জামান সাহেবের যেন লতিফ সাহেবের জন্য মনটা খারাপ হল। বড় ছেলে, মেঝো মেয়ে পাশে নেই, কিন্তু তাদের অর্জন গুলো কত যত্নে সাজিয়ে রেখেছেন মানুষটা। শিউলিকে কত কঠিন করে কথা শোনাবেন ভেবে নিজেই একটু নড়েচড়ে সোফায় বসলেন।

শিউলি ঘরে ঢুকেই জামান সাহেবকে সালাম দিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখে একটা হাসি নিয়ে জামান সাহেব সালামের উত্তর দিলেন। অনেকদিন পরে মেয়েটাকে দেখলেন। দেশীয় সালোয়ার-কামিজে বেশ মানিয়েছে মেয়েটাকে। চোখের চশমাটা যেন বেশ একটা ভারীভাব এনে দিয়েছে চেহারায়। জামান সাহেব খেয়াল করলেন, মেয়েটা অনেক শুকিয়ে গিয়েছে। বিদেশের বে-খেয়ালি খাওয়া-দাওয়া এর জন্য দায়ী, জামান সাহেব ভাবতে লাগলেন। প্রথম দেখাতেই তো আর ধমক দেয়া যায় না। জামান সাহেব মুখের হাসিটা ধরে রেখে জানতে চাইলেন, ‘কেমন আছো, মা?’

- ভালো আছি চাচা, আপনি কেমন আছেন?
- ভালো আছি। তুমি কবে আসলে?
- গত সপ্তাহে এসেছি চাচা।
- আচ্ছা, বেশ ভালো। তোমার বাবার সাথে গতকাল দেখা হল। বলল, তুমি দেশে এসেছ। তাই ভাবলাম একবার দেখা করে আসি।
- ভালো করেছেন চাচা। দেশের বাহিরে থাকতে আমি আপনার ল্যানসেটে প্রকাশিত হওয়া একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম। অসাধারণ।

জামান সাহেব শিউলির কথা শুনে যেন একটু লজ্জাই পেলেন। জামান সাহেব মেনিনজাইটিসের জীবাণু নিয়ে গবেষণা করেন। মেনিনজাইটিসের কারণে বাংলাদেশের অনেক শিশু শুধু মারাই যায় না, বেশিরভাগ শিশুই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে বেঁচে থাকে। জামান সাহেব এই রোগের জীবাণু আবিষ্কারের জন্য একটি দল গঠন করেন এবং তাঁর এই গবেষণা ল্যানসেটে প্রকাশ করেন। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান জামান সাহেব। যে মানুষটাকে কিছুক্ষণ পরে কথার প্যাঁচে ফেলে রামধমক দেবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন, সেই তার মুখেই নিজের প্রশংসা শুনে একটু লজ্জাই পেলেন। লজ্জা প্রকাশ না করে বললেন,

- না, সে তেমন কিছু না। তোমার খবর বল, শুনি। তুমি কি নিয়ে কাজ করেছো পিএইচডি-তে?
- আমি চাচা গবেষণা করেছিলাম একটি ব্যাকটেরিয়ার উপরে। এই ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলার জন্য একটা নতুন এন্টিবায়োটিক ডিজাইন নিয়ে আমার কাজ ছিল।
- বাহ! চমৎকার। তা এখন কি করছ?
- একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছি।
- তারপর কি করবে বলে ঠিক করেছো?
- ভাবছি, শিক্ষক হিসেবে ওখানেই জয়েন করব।
- দেশে ফিরবে না?
- মনে হয় না, চাচা।

জামান সাহেব ভাবলেন, এখনি সময় ধরে বসার। সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না তিনি। প্রশ্ন করে বসলেন তিনি –

- দেশে কি সমস্যা? আমরা কি দেশে ফিরে আসি নাই? আর এসে তো আমরা বসে নাই। আমি নিজেই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

শিউলি শান্ত গলাতে উত্তর দিল-
- আমি যেই বড় বাজেটের গবেষণা করছি চাচা, তা এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সম্ভব নয়।

জামান সাহেব যেন মুহূর্তে এই কথা শুনে ক্ষেপে উঠলেন। বললেন –

- তুমি কি বলতে চাও? বড় বাজেট ছাড়া এদেশে বড় গবেষণা হয় না? বড় মাপের বিজ্ঞানী তৈরি হয় না? কতজন বাঙ্গালি বিজ্ঞানীর নাম জানো তুমি? বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, ডঃ কুদরাত-এ-খুদা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, পি সি রায়, মেঘনাদ সাহা, আব্দুস সাত্তার খান, ডঃ মাকসুদুল আলম, শুভ রায়, হরিপদ কাপালি এদের নাম শুনেছ?

জামান সাহেব এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন। এতোগুলো নাম না থেমে উনি ঠাস ঠাস করে বলতে পেরে নিজের ভেতরে একটা জয় অনুভব করলেন। কিন্তু শিউলিকে চুপ করে শান্তভাবে বসে থাকতে দেখে উনি বেশিক্ষণ সেই ভাবখানা ধরে রাখতে পারলেন না। শিউলি মুখ খুলল –

- আচ্ছা চাচা, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু তো বেতার আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু মার্কনিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল কেন জানেন নিশ্চয়ই? কারণ বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর আগেই মার্কনি এটাকে নিজের আবিষ্কার বলে দাবি করে বসেন। দুজন বিজ্ঞানী প্রায় একই সময় ধরে এই বিষয়টির উপরে গবেষণা করছিলেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বাঙ্গালি বিজ্ঞানী আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা থেকে ইতালিয়ান বিজ্ঞানীর থেকে পিছিয়ে ছিলেন। আপনার কি মনে হয় না, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু যদি কলকাতায় না বসে ইউরোপ অথবা আমেরিকায় বসে গবেষণা করতেন, তিনি আরও আগেই বেতার তরঙ্গ গ্রাহক যন্ত্রটা আবিষ্কার করে ফেলতে পারতেন যেটা দিয়ে মার্কনি সাহেব পরবর্তীতে দ্বিমুখী কার্যক্ষম বেতার আবিষ্কার করেছিলেন?

জামান সাহেব এইরকম উত্তর এই কম বয়েসি মেয়ের কাছ থেকে আশা করেন নি। কথা সত্য। তিনি নিজেও বাংলাদেশের অনেক বড় বিজ্ঞানী, কিন্তু গবেষণা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রিসোর্সের জায়গাটাতে এখনও অনেক দুর্বল। গবেষণার জন্য যেই যন্ত্রপাতি এবং যেরকম গবেষণাগার প্রয়োজন, বাংলাদেশের অনেকজায়গাতেই তা নেই। তিনি নিজেই দেশে ফেরার পর এই ব্যাপারটা নিয়ে ভুগেছেন। বাচ্চাদের রক্তে হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করার জন্য তিনি দেশের বাহিরে থেকে ‘হিমোকিউ’ নামক একটা যন্ত্র অর্ডার করেছিলেন। বাহিরে থেকে অর্ডার করার কারণে এর দাম পড়েছিল অনেক বেশি। পুরো গবেষণাটি যাচাই করার জন্য আমেরিকা থেকে দুইটি দল বাংলাদেশে এসেছিল। জামান সাহেব তাদের আসার আগেই যন্ত্রটি অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যন্ত্রটি বাংলাদেশের কাস্টমসের বাঁধা পেরিয়ে তিন মাস পরে এসে পৌঁছেছিল জামান সাহেবের গবেষণাগারে। ফলশ্রুতিতে জামান সাহেবের গবেষণা শুরু করতে হয় তিন মাস পরেই। টরেন্টো তে থাকলে নিশ্চয়ই এই সমস্যাটা হত না। কিন্তু এসব কথা এখানে বলা যাবে না। এখানে তো জামান সাহেব শিউলির পক্ষ নিতে আসেন নি, তাকে ধমক দিতে এসেছেন। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে সামনে বসে থাকা লতিফ সাহেব ঝামেলা পাকিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন।

- আমি যখন বুয়েটে পড়তাম, তখন এইরকম একটা সমস্যা আমারও হয়েছিল। মাস্টার্সের থিসিসের সময় সুপারভাইসর ডেকে এক গাদা জার্নাল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন এগুলো পরে একটা গবেষণা বের করে আনতে। তখন দেশে তো এখনকার মত ইন্টারনেট ছিল না যে গুগল করলেই সব বের হয়ে আসবে। চলে গেলাম লাইব্রেরীতে। একটা জার্নাল পরে রেফারেন্স খুঁজে আরেকটা বের করতে করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে গেল। নতুন নতুন বইগুলোও লাইব্রেরীতে আসতো অনেক পরে পরে। পরে যা হবার তাই হল, কোনওরকম একটা তাত্ত্বিক-টাইপ কাজ করেই থিসিস পেপার জমা করে দিলাম। পরে যখন বিদেশে পিএইচডি করতে এসে দ্রুতগতির ইন্টারনেট আর একটা কম্পিউটার পেলাম, আমাকে আর কে পায়। তখন দেশের কথা ভেবে খুব খারাপ লাগত।

লতিফ সাহেবের কথা শুনে জামান সাহেবের মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা একে তো নাচুনে বুড়ি, তার উপরে লতিফ সাহেব যেন ঢোলের বাড়ি দিলেন। কোথায় এই লোকটাকে একটু সাহায্য করতে এসেছেন, কিন্তু তিনি কোনও সুযোগই জামান সাহেবকে দিচ্ছেন না। এরই মধ্যে শিউলি যেন শেষ পেরেকটা গেঁথে দিল,

- বাবা কিন্তু পুরনো সময়ের কথা বললেন চাচা। আমি আপনাকে তিন বছর আগের কথা বলি। আপনাকে তো বলেছি, আমার পিএইচডি ছিল একটা বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার উপরে। আমি তখন বাংলাদেশে ছিলাম, কারণ এই ব্যাকটেরিয়াগুলো আমি পেয়েছিলাম আমাদের দেশেরই বাচ্চাগুলোর রক্ত থেকে। ব্যাকটেরিয়ার জন্য বিশেষ এক ধরনের খাদ্য (মিডিয়া) দরকার পড়ল। দেশের ভেতরে যারা এই খাবার যোগান দিত, তারা বলল তাদের কাছে এটা নেই। কারণ হিসেবে বলল, এটার বাংলাদেশে তেমন চাহিদা না থাকার কারণে তারা এটা যোগান দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অগত্যা আমার এক বন্ধু দেশের বাহিরে থাকে, দেশে আসার সময় খাবারটা নিয়ে আসতে বললাম। জানেন চাচা, আমি ১৬০০ বাচ্চার রক্ত হাতে নিয়ে সেই খাবারের জন্য ৫ মাসের বেশি সময় ধরে বসেছিলাম। যেটা আমি আমেরিকায় থাকলে একদিনের ব্যাপার ছিল। এছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে, যেটা আমি আমেরিকায় বসে একদিনে পাই। অন্যদিকে, বাংলাদেশে বসে অর্ডার করলে সবকিছু ঠিক থাকলেও অন্তত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় পরে হাতে এসে পৌঁছায়। একবার তো আমার অবস্থা বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর মত হয়েছিল। ৬ মাস পরে কাজ একটা জার্নালে প্রকাশ করতে গিয়ে দেখি, এ মাস আগেই একজন তা পাবলিশ করে ফেসবুকে লিঙ্ক দিয়ে দিয়েছে।

জামান সাহেব বুঝতে পারলেন এই রিসোর্স-নামক টপিকে এই দুষ্টু মেয়েটাকে আটকানো সহজ হবে না। উনি টপিক পরিবর্তন করলেন...

- সবই বুঝতে পারলাম। তাই বলে কি আমার কাজ আমি ল্যানসেট নামক শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ করে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনি নি?
- চাচা, আপনি যেটা করেছেন সেটা অবশ্যই খুব সম্মানের একটি ব্যাপার। কিন্তু ব্যতিক্রম কি কখনও উদাহরণ হতে পারে? বড় বড় একটা পত্রিকায় নিজের গবেষণা প্রকাশ করতে অনেক টাকা লাগে। অনেক সময় যারা গবেষণার জন্য টাকা সরবরাহ করে, তারাই এই খরচটা বহন করে। কিন্তু বাংলাদেশের কয়টা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই সুযোগটা পেয়ে থাকে, আপনিই বলেন? অনেক সময় প্রকাশনার অর্থ না থাকার কারণে বাংলাদেশের গবেষকগণ নিচু মানের পত্রিকায় তাদের গবেষণা প্রকাশ করে থাকেন, যা একজন নিবেদিত প্রাণ গবেষকের জন্য খুবই কষ্টের। আবার গবেষণা করার জন্য পত্রিকাগুলোর নিবন্ধন কিনতে হয়, যা কিনা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য খুবই সহজ। আর বাংলাদেশের জন্য কঠিন।

জামান সাহেবের মনে হল কেউ যেন তাঁর গলা আটকে ধরতে চাইছে। শিউলির কথা সত্য। এক বছর আগে জামান সাহেব সম্পূর্ণ নিজের গবেষণাগার থেকে অর্থ ব্যবস্থা করে টাইফয়েড সনাক্তকরণের নতুন একটা পদ্ধতি বের করেছিলেন। বাড়তি খরচ বাদ দিয়ে পুরো গবেষণায় খরচ হয়েছিল প্রায় চার হাজার ডলারের কাছাকাছি। গবেষণাটি যখন একটি পত্রিকায় প্রকাশের জন্য জমা দিলেন, পত্রিকার সম্মানিত লোকজন জামান সাহেবের হাতে প্রকাশের জন্য ১৭০০ ডলারের বেশি আর ইন্টারনেটে প্রকাশের জন্য (ওপেন এক্সেস) জন্য প্রায় আড়াই হাজার ডলারের একটা ফর্দ ধরিয়ে দিল। জামান সাহেব ভাবলেন, প্রকাশ করার চাইতে গবেষণার খরচ কম, এ কেমন বিচার? বাইরে থাকলে হয়ত এই টাকার সমস্যাটা অন্তত তাঁর আর তাঁর গবেষণাগারের উপর দিয়ে যেত না। তাঁর উপর পত্রিকার নিবন্ধন আরেকটা আপদ। বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় আর গবেষণাগারগুলোর জন্য নিবন্ধন দেয়া থাকে। আমাদের দেশে কোনও প্রতিষ্ঠানের এটা আছে কিনা, জামান সাহেব নিজেই জানেন না। কথাগুলো চিন্তা করে জামান সাহেব প্রমাদ গুনলেন। এই মেয়ের সাথে কোনভাবেই যেন তিনি পেরে উঠছেন না। কথার হারটাকে একটু প্রশমিত করার জন্যই হয়ত তিনি বললেন-

- গবেষণার জন্য অর্থায়ন একটি বিশাল ব্যাপার। এইদিক দিয়ে আমাদের কিছু ঘাটতি আছে, তা আমি স্বীকার করি হাসান। কিন্তু তাই বলে ইউরোপ/আমেরিকাতে তো কেউ এটা ফ্রি ফ্রি দিয়ে যাচ্ছে না, তাই না?

- চাচা, গবেষণার প্রাণ হচ্ছে খরচ। আমি যদি আমার পোস্ট-ডক শেষে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক-শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি, প্রাথমিকভাবে যেই টাকাটা লাগবে, সেটা কিন্তু আমার বিশ্ববিদ্যালয়-ই আমাকে দিবে। এই পুঁজি দিয়ে কাজ করে কয়েক বছর পর কিন্তু আমাকেই আমার অর্থ খুঁজে নিয়ে আসতে হবে। সেই পর্যন্ত কিন্তু টাকাটা আমি ফ্রি-তেই পাচ্ছি। বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু আমাকে এই পরিমাণ টাকা গবেষণার জন্য শুরুতে দিবে না। আমি কেন এখানে কাজ করব, বলেন?

- “তুমি জানো কিনা জানি না, থাক তো বিদেশে।” ক্ষোভ ঝাড়লেন জামান সাহেব, “বাংলাদেশ সরকার এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৩৭টি বিভাগের জন্য প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকা গবেষণার জন্য দিচ্ছে” বলে জামান সাহেব তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

- তার মানে চাচা, প্রতি বিভাগের জন্য ১ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা, তাই না? সেটা আবার একই বিভাগের কয়েকজন প্রফেসরের মধ্যে ভাগ হবে, তাই তো?

জামান সাহেব চুপসে গেলেন। এই মেয়ে দুষ্টু না, মহাদুষ্টু। এগুলো বিদেশে থাকাই ভালো। দেশে থাকার দরকার নাই। জামান সাহেব নিজেও জানেন এই মেয়ে বাইরে কাজ করলে বিলিয়ন ডলারে গবেষণায় হাবুডুবু খাবে। কি বলবেন ভেবে পেলেন না তিনি। চুপ করে রইলেন। অনেকক্ষণ পরে তাঁর মনে হল যেন তিনি অনন্ত কাল ধরে চুপ করে আছেন। নীরবতা ভাঙলেন লতিফ সাহেব।

- চা খান, জামান সাহেব।

জামান সাহেব লতিফ সাহেবের কথা ভাবতে শুরু করলেন। তিনি যেন বুঝতে পারলেন কেন এই লোক দরকার ছাড়া কথা বলেন না। আগে ভাবতেন, বুয়েটের একজন অধ্যাপক, যাকে কিনা ক্লাসে সবার সামনে সারাদিন পকপক করতে হয়, তিনি কিভাবে অন্যসময় এতো কম কথা বলেন। জামান সাহেব মনে করতেন, খুব সম্ভবত ছেলেমেয়েরা বাসায় থাকে না, তাই কথা কম বলতে বলতে স্বল্পভাষী হয়ে গিয়েছেন ভদ্রলোক। এখন চিন্তা করলেন, মনে হয় সন্তানদের সাথে কথায় না পেড়ে উঠতে পেড়ে কথা বলাই কমিয়ে দিয়েছেন।

জামান সাহেব চায়ে চুমুক দিলেন। লতিফ সাহেব বলতে শুরু করলেন,

- আপনারা তো অনেককিছুই বললেন। এবার আমি কিছু কথা বলি। কাউকে এগুলো বলিনি আগে। আজকে মনে হচ্ছে আমার বলার দরকার। আমি দেশে ফিরে এসে চেয়েছিলাম দেশে বিশ্বমানের গবেষণা করব। তাই পিএইচডি শেষ করে পোস্ট-ডকটাও করলাম। কিন্তু এসে দেখলাম, আমার কলিগদের একটা সিংহভাগ রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। অনেকের ন্যূনতম যোগ্যতা শুধুমাত্র স্নাতক পাশ, অনেকেরই পিএইচডি নেই। যাদের আছে, তাদের অনেকেই নামমাত্র পিএইচডি করে প্রমোশন বাগিয়ে নিয়েছেন। বাইরের দেশে দেখছিলাম, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবার পরে তাদের রাত-দিন এক হয়ে যায়। অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে পাঁচ বছর পরে তারা তাদের জায়গা পাকাপোক্ত করেন। এখানে এসে দেখলাম, নিয়োগ পাবার সাথেই সাথেই আমার চাকুরী স্থায়ী হয়ে গেল। চাকুরী যাবার ভয় না থাকার কারণে ধীরে ধীরে “অনেক গবেষণা করব” এই ইচ্ছেটাও মরে গেল। তাও যে চেষ্টা করি নি, তা নয়। গবেষণার জন্য অর্থ চেয়ে অনেক চিঠি লিখলাম, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আর আমার বলার মত কোনও রেপুটেশন না থাকার কারণে, সর্বোপরি একটা ভালো মানের গবেষণাগার না থাকার কারণে টাকার ব্যবস্থা করতে পারলাম না। সরকার আমার বিভাগকে কিছু টাকা দিল, তাও রাজনৈতিকভাবে শক্ত ছিলাম না বলে তার থেকে কিছুই পেলাম না।

লতিফ সাহেব এতোটুকু বলে থামলেন। শিউলি বাবার পাশে এসে বসলো। জামান সাহেব খেয়াল করলেন, লতিফ সাহেব চোখের পানি লুকোবার চেষ্টা করলেন। ঘরে যেন নীরবতার সাথে একটা জমাট আবহাওয়ার সৃষ্টি হল। জামান সাহেব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চেয়েই কিনা জানেন না, বোকার মত প্রশ্ন করে বসলেন, “তাহলে এখন কি হবে?” বলেই বাবা আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। শিউলি যেন প্রশ্নের জবাব দিতেই উঠে দাঁড়াল –

- পরিবর্তন আসবে। আমি ঠিক করেছি পোস্ট-ডকের পর দেশে ফিরে আসব।

জামান সাহেব যেন কথাটা ঠিকমত শুনতে পেলেন না। শিউলি কি দেশে ফিরে আসার কথা বলল? নাহ, তাই-তো। তিনি আবার বোকার মত প্রশ্ন করে বসলেন,

- তুমি দেশে ফিরে আসলে কি হবে? বাংলাদেশ কি আমেরিকা হয়ে যাবে মা?

কথাটা বলেই জামান সাহেব বুঝতে পারলেন তিনি একটা ছোট্ট বাচ্চা যেভাবে ক্লাসের শিক্ষককে না বুঝে আক্কেল গুড়ুম প্রশ্ন করে, সেভাবে তিনি প্রশ্নটা করেছেন। শিউলি জামান সাহেবের প্রশ্ন শুনতে পায় নি, এইরকম ভাবেই বলতে থাকল,

- বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘টিচিং-নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে ‘টিচিং এবং রিসার্চ-নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়’-এ পরিবর্তন করে আনতে হবে। আর এইজন্য উচ্চমানের গবেষণা কাঠামো আমাদেরকেই তৈরি করতে হবে। গবেষণার জন্য ভালো ছাত্র-ছাত্রী, বাবার মত একজন সুযোগ্য গবেষক আর আর্থিক অবকাঠামো দরকার, আর এই তিনের সমন্বয়ের মাধ্যমেই একটি চমৎকার গবেষণাগার তৈরি করা সম্ভব।

জামান সাহেব বাধ্যগত ছাত্রের মত সামনে ঝুঁকে বসলেন। শিউলি বলতে থাকল,

- এবার এক এক করে আসি। প্রথম কথা হল, মেধাবী শিক্ষার্থী দরকার। মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেন দেশেই উচ্চশিক্ষা নিতে পারে, সে জন্য চীন এবং ভারতের মত বাংলাদেশে ‘সুপার পিএইচডি প্রোগ্রাম’ করতে হবে। যেসব মেধাবী শিক্ষার্থীরা পাশ করার পরেই পিএইচডি করতে চাইবেন না, তাদের সাময়িকভাবে কয়েকবছরের জন্য ‘লেকচারার’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তারা যদি উচ্চশিক্ষা না নেয়, তাদের অন্য পেশা নির্বাচন করতে বলা হবে। যারা দেশে পিএইচডি করবেন, তাদের আর্থিক ভাতা উন্নত বিশ্বের মত করা হবে। একই রকম সুবিধা পেলে তারা দেশেই থেকে যাবে।

শিউলি একটু থেমে আবার বলা শুরু করলো,

- দ্বিতীয় কথা হল, ভালো গবেষক তৈরি করা। মেধাবী ছাত্ররাই শিক্ষক হতে পারবে, কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়। যারা নতুন নতুন আইডিয়া তৈরি করতে পারবে এবং ভালোভাবে পিএইচডি শেষ করবে, তারাই গবেষক হিসেবে প্রমোশন পাবে। পিএইচডি করেই প্রমোশন, এটা চলবে না। পিএইচডির বিষয় আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে, ভালো পত্রিকায় প্রকাশনা থাকবে, নিজের কাজের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পরে নিজের কাজের খরচ নিয়ে আসতে পারবেন, এমন গবেষক-ই বিভাগে স্থায়ী হতে পারবেন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সরকারকে নিজ উদ্যোগে বেশ কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একসাথে কাজ করবে।

- আর খরচ? না মানে, এতো গবেষণা হবে, টাকা আসবে কোথা থেকে?

- এক্ষেত্রে সরকারকে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে গবেষণার জন্য একটা ফান্ড করা হবে। ইউজিসি’র মাধ্যমে সেই টাকা বিতরণ করা যাবে। কিছু টাকা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়িয়ে করা যেতে পারে। সেদিক দিয়ে তাদেরই লাভ হবে। তাদের ভালভাবে বোঝালে তারা মেনে নিবে। আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের কাছে আমরা জবাবদিহিতা করি না। না বুঝিয়ে কিছু করলে তারা তো আন্দোলন করবেই। কম টাকায় পড়াশুনা করে স্নাতক শেষে জীবনে কিছু করতে না পারার মাঝে সফলতা নেই, এটা তাদের সুন্দরভাবে বোঝাতে হবে। অনেক দেশে যেমন টিউশন-ফি নেই, অনেক দেশেই কিন্তু আবার টিউশন-ফি অনেক বেশি। এটা তারা বুঝবে। পাঁচ বছর পরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজের গবেষণার খরচ নিজেরাই জোগাড় করতে পারবে।

- বাহ। তাহলে তো হয়েই গেল। আর শুরু দিকে তোমরা বাবা-মেয়ে মিলে আমাকে যে এতো এতো সমস্যার কথা বললে, তার কি হবে?

- দেশে গবেষণার মান উন্নত হলে ওইগুলো এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে চাচা।

লতিফ সাহেব উঠে এসে ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথায় একটা হাত রাখলেন। জামান সাহেব ও উঠে দাঁড়ালেন। মনে হল, ধমক দিতে এসে যেন অনেককিছু শিখে গেলেন। তবুও একদিক দিয়ে জামান সাহেব নিজেকে জয়ী ভাবতে লাগলেন। শিউলি তাহলে দেশে ফিরে আসছে। জামান সাহেব খেয়াল করেছেন, তিনি একদম ঘেমে গেছেন। এতোটা মানসিক পরিশ্রম হবে, তিনি ভাবেন নি। দুষ্ট ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের ধমক দিয়ে এর চাইতে কথা শোনানো অনেক সহজ। এইরকম মিশন তিনি আর কখনো হাতে নেবেন না বলে মনঃস্থির করে ফেললেন। তবুও আজকে যেহেতু তিনি এই ঘরে বিজয়ী, শেষবারের মত কথাটা প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,

- তাহলে মা তুমি দেশে ফিরে আসবে?

প্রশ্নটা বোধহয় জামান সাহেব একটু উচ্চস্বরেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন। শুনে লতিফ সাহেবের স্ত্রী ভেতরের ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন।

- মা, সোনামানিক আমার, তুই ফিরে আসবি?

শিউলি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। ভদ্রমহিলা এতক্ষণ ভেতরের ঘরে বড় ছেলের সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। এদিকের কথা শুনে এখন বের হয়ে এসেছেন। তিনি বেশ বুঝতে পারলেন, জামান সাহেবের কথা শুনেই তাঁর মেয়ে দেশে ফিরতে চাইছে। তিনি জামান সাহেবের কাছে এসে হাতের মুঠোফোনটি এগিয়ে দিয়ে অনুরোধ করেন,

- ভাই, আপনি মানুষ না, ফেরেশতা আপনি। ফোনের ওইপাশে আমার বড় ছেলে আছে, তাকে একটু বুঝিয়ে বলুন না ভাই যেন দেশে চলে আসে?

জামান সাহেব দ্রুতবেগে লতিফ সাহেবের বাসা ত্যাগ করলেন।

- অন্ত আফ্রাদ, কোভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য।

(এই গল্পের সবগুলো চরিত্রই কাল্পনিক। কারও সাথে মিলে গেলে লেখক হিসেবে আমাকে দোষ না দেবার অনুরোধ রইল। গল্পের ভেতরের অনেক ঘটনাই বাস্তব জীবন থেকে নেয়া। লেখার আগে এবং পরে নানারকম তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য ডঃ সেঁজুতি সাহাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এছাড়াও অনুপ্রেরণা পেয়েছি ডঃ রাগিব হাসান এবং ড. সাইফুল মাহমুদ চৌধুরী স্যারদের লেখা থেকে। লেখার ভেতরে গল্পের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্টুনটি এঁকে দিয়েছেন সুমাইয়া আফরিন মিষ্টি। যে কেউ যে কোনও জায়গায় অনুমতি ছাড়াই কার্টুনটি ব্যবহার করতে পারবেন।)


মন্তব্য

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

ছবি কোথায় দিতে চাও জানিও।

অন্ত আফ্রাদ এর ছবি

৩য় অনুচ্ছেদের একটু আগে হলে ভালো হয়।

মেঘলা মানুষ এর ছবি

ভালো লেগেছে লেখা।

সব অনুদানই যে ক্ষুদ্র তা নয়। বাংলাদেশে একাধিক প্রফেসর মিলে ল্যাব গড়ে তুলছেন, এমনটাও হচ্ছে। শুরুতে কিছু সিস্টেম লস হবে, এরপর গবেষণাখাতে বরাদ্দপ্রদান, ফলোআপ, প্রকাশনা -সবকিছুই একটা কাঠামো দাঁড়িয়ে যাবে আশা করি।

শুভেচ্ছা হাসি

অন্ত আফ্রাদ এর ছবি

আমরাও আপনার মত এইরকম ভালো কিছুর আশা করি। ধন্যবাদ সুন্দর কথাগুলো বলার জন্য।

এক লহমা এর ছবি

চলুক
লেখকের স্বপ্ন সফল হোক।

ছবি ভাল লেগেছে।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অন্ত আফ্রাদ এর ছবি

ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

খুব চমৎকৃত হলাম লেখাটি পড়ে। সেঁজুতি সাহার সাক্ষাতকারের সাথে এই লেখাটি যোগ করে পড়লে যে চিত্রটা বেরিয়ে আসে সেটা আমাদের সরকার, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, শিক্ষা বিষয়ক সকল শীর্ষ কর্তাদের চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখা উচিত। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কেন হয় না, কেন রাজনীতির নষ্ট চক্রে পড়ে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, কেন শিক্ষকেরা শিক্ষা বাদ দিয়ে রাজনীতির পেছনে ছুটবেন এই প্রশ্নগুলোও একসাথে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। লেখাটি কোন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে পারলে অনেক ভালো হতো।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

অতিথি লেখক এর ছবি

সামনে ঝুলিয়ে রেখে দিলে কোনও লাভ হবে বলে মনে হয় না যদি না সেটা বোঝার মতো কোনও সদিচ্ছা অথবা জ্ঞান তাদের না থেকে থাকে। জাতীয় দৈনিকের ব্যাপারটা মাথায় থাকলো। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ উৎসাহ দেবার জন্য।

রণদীপম বসু এর ছবি

আশাবাদ জাগানোর মতো লেখা। আমরা তো আশাবাদীই হতে চাই !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

অতিথি লেখক এর ছবি

আমরা সেই আশার সঠিক বাস্তবসম্মত প্রতিফলনও দেখতে চাই। ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

লেখা ভালো হয়েছে আফ্রাদ। লেখার আবেগ আর সততা টের পাওয়া যায়।
গবেষণার হাহাকার তো দেশে অসংখ্য ছেলেমেয়ের। দিন বদলাবে সেই আশা করি!

পরামর্শ: লেখার শিরোনামটা মানানসই নয়। গল্প ভেবে বসার সুযোগ বেশি। এটা গল্পের মতো করে লেখা সত্যি কথা। যাদের পড়া দরকার, তাদেরকে টানার মতো শিরোনাম হলে ভালো।

আরেকটা পরামর্শ: মিষ্টিকে বলো সচলায়তনে কিছু কার্টুন/ক্যারিকেচার প্রকাশ করতে। সচলের কার্টুনিস্টরা বহুদিন হলো বিলুপ্ত হয়েছেন।

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

অন্ত আফ্রাদ এর ছবি

সত্যি বলতে আমার মনে হয়েছে, যারা সচলায়তনে পড়তে আসে, তারা আর যাই হোক, সরকারের ওই উদাসীন মানুষগুলো অন্তত আসেন না। সেই চিন্তা থেকেই আসলে গল্প-প্রিয় মানুষগুলোকে নিয়ে চিন্তা করে তাদের জন্য শিরোনাম করা আর 'গবেষণা' বিষয়টাকে ট্যাগে বসিয়ে দেয়া। এতে আরেকটি লাভ হতে পারে। সারাদিন তো এমনিতেই এইসব নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের কাজে উদাসীন, অফিস শেষে এসে যদি ভুল করে গল্প ভেবে পড়িয়ে দেয়া যায়, মন্দ কি!

আর অবশ্যই মিষ্টিকে বলবো, সে তো কার্টুন আঁকতে পারলেই খুশি।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।