রাজপুত্র-কোটালপুত্র সিনড্রোম

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি
লিখেছেন ষষ্ঠ পাণ্ডব (তারিখ: শনি, ১৫/০৭/২০১৭ - ১:৪৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এই গল্পটার মূল উৎস আমার জানা নেই। গল্পটি প্রথম পড়েছিলাম ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ নামের একটা রূপকথার গল্প সংকলনে। বইটি মোটেও দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের বিখ্যাত সংকলনটি নয়, বরং দেশ-বিদেশের খান পঞ্চাশেক রূপকথাকে স্থানীয় পটভূমিতে পুনর্লিখন করে অজ্ঞাত কোন সংকলকের করা একটি বই। পরবর্তীতে গল্পটির একটু ঊনিশ-বিশ ভার্সান আরও কয়েক জায়গায় পড়েছি, কিন্তু কোথাও এর মূল উৎস উল্লেখ করা ছিল না। শৈশবে একই প্রকার গল্প এক বয়োজ্যেষ্ঠর মুখেও শুনেছিলাম। সুতরাং গল্পটি আমাদের দেশীয় রূপকথা বলে আঁচ করছি। তাছাড়া গল্পে এমন কোন উপাদান পাওয়া যায়নি যেখান থেকে ধারণা করা যাবে যে গল্পটি ভীনদেশী। প্রথমে সংক্ষেপে গল্পটি জানা যাক।

***********************************************************

তিন বন্ধু — রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র আর কোটালপুত্র। রাজপুত্রের অভিষেকের এক বছর আগে এই তিন জন একসাথে দেশভ্রমণে বের হয়। ভ্রমণকালীন সময়ে কোন অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হতে পারে ভেবে একটা মহামূল্য রত্ম সাথে নেয়া হয়। রত্মটি রাজপুত্র তার শরীরের কোথাও লুকিয়ে রাখে। কয়েক মাস ভ্রমণের পর এক সকালে রাজপুত্র টের পায় রত্মটি চুরি হয়েছে, যা আগের রাতেও যথাস্থানে ছিল। যেহেতু রত্মটি পড়ে যাবার বা হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ ছিল তাই প্রথমেই ধারণা করা হয় এটি তাদের তিন জনের মধ্যে কেউ সরিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিন জনই অস্বীকার করলে বিষয়টি গুরুতর হয়ে পড়ে। বিপদের সম্বল রত্মটি উদ্ধার যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তারচে’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই তিন জনের কার মধ্যে অসততা, মিথ্যাচার, বিশ্বাসভঙ্গের অসদ্‌গুণ বিদ্যমান আছে তা বের করা। ভবিষ্যতে এদের একজন দেশের কর্ণধার, একজন প্রধান মন্ত্রণাদাতা, এবং একজন প্রধান শৃঙ্খলারক্ষাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে; সুতরাং দুরাচারকে চিহ্নিত করা দেশের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলকর। কিন্তু তিন জনই চায় কে আসল ‘চোর’ সেটি যেন অজ্ঞাত থাকে। কারণ, এতে তাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব ও আস্থা বিনষ্ট হবে। চোরকে অপ্রকাশিত রেখে রত্মটি উদ্ধারের আশায় তারা নানা দেশ ঘুরে বেড়ানোর কালে একবার এক বনে গাছের নিচে রাত্রিযাপনের সময় তারা গাছের উপরে বাস করা ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর কথোপকথন শুনতে পায়। সেখানে তারা জানতে পারে প্রকৃত ‘রাজচক্রবর্ত্তী’ পরিবারের কোন সন্তান স্বেচ্ছায় নিজের রক্তে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সন্তানের চোখ না রাঙালে তাদের সন্তান চির-অন্ধ থেকে যাবে। রাজপুত্র স্বেচ্ছায় কাজটি করলে সন্তানটি দৃষ্টিশক্তি লাভ করে। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী উপকারের প্রতিদান দিতে চাইলে রাজপুত্র তাদের সমস্যাটির কথা বলে। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী জানায় সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে যেতে হয় এমন এক দেশের এক জ্ঞানী শুক পাখী পৃথিবীর তাবৎ সমস্যার সমাধান জানাতে সক্ষম। রাজপুত্র আর তার বন্ধুরা ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সহায়তায় সেই দেশে পৌঁছায়।

জ্ঞানী শুক পাখী তাদের সমস্যা শুনে প্রথমে তাদের তিনজনকে একটা গল্প বলে। গল্পটা হচ্ছে —

++++++++++++++++++++++++++++++

এক ধার্মিক রাজকন্যা প্রতি দিন সকালে নদীতে স্নান করে সিক্ত বস্ত্রে মন্দিরে পূজো না দিয়ে দিনের অন্য কোন কাজ করতো না। মন্দিরে যাবার প্রাক্কালে কেউ তার কাছে কোন কিছু ভিক্ষা চাইলে সে তা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করতো। একদিন অমন মুহূর্তে এক সন্ন্যাসী রাজকন্যার কাছে নববধূবেশে এক রাতের সেবা (অর্থাৎ দেহ) চেয়ে বসে। রাজকন্যা তাকে জানায় যে, তার দেহের অধিকারী তার ভবিষ্যত স্বামী। সুতরাং তার বিয়ের পর তার স্বামীর অনুমতি নিয়ে সন্ন্যাসীর আকাঙ্খা পূরণ করবে। যথা সময়ে রাজকন্যার বিয়ে হবার পর বাসর ঘরে সে তার স্বামীকে বিষয়টি জানায়। স্বামীটি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তার দৃঢ়তা দেখে তাকে সন্ন্যাসীর কাছে যেতে অনুমতি দেয়। সন্ন্যাসীর কাছে যাবার পথে রাজকন্যা প্রথমে এক ক্ষুধার্ত বাঘের কবলে পড়ে। রাজকন্যা বাঘকে বলে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে সে বাঘের কাছে ফিরে আসবে, তখন বাঘ তাকে খেতে পারে। বাঘ তার কথায় আস্থা এনে তাকে ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। এরপর রাজকন্যা এক তস্করের কবলে পড়ে যে তার অলঙ্কারাদি ছিনিয়ে নিতে চায়। রাজকন্যা তস্করকেও তার প্রতিজ্ঞার কথা জানায়, এবং বলে সে ফিরতি পথে তার কাছে এসে তাকে সব অলঙ্কার দিয়ে যাবে। তস্করও তার কথায় আস্থা এনে তাকে ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। রাজকন্যা সন্ন্যাসীর কুটিরে হাজির হয়ে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথা জানালে সালঙ্কারা নববধূবেশী রাজকন্যাকে দেখে সন্ন্যাসীর মাথা ঘুরে যায়। তার আর রাজকন্যার ‘সেবা’ গ্রহনের সাহস হয় না। সে রাজকন্যার কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে বিদায় করে। ফিরতি পথে রাজকন্যা যথাক্রমে তস্কর ও বাঘের কাছে যায়। কিন্তু রাজকন্যার প্রতিশ্রুতি পালনের দৃঢ়তা দেখে হোক অথবা ভয় পেয়ে হোক তস্কর রাজকন্যার অলঙ্কারাদি নিতে অস্বীকার করে এবং বাঘ রাজকন্যাকে খেতে অস্বীকার করে। রাজকন্যা তার বাসর ঘরে ফিরে যায় অক্ষত দেহে, সালঙ্কারা নববধূবেশে, অনাঘ্রাতা অবস্থায়। তার স্বামী তাকে গ্রহন করে।

++++++++++++++++++++++++++++++

গল্প বলার পর জ্ঞানী শুকপাখী রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র আর কোটালপুত্রকে আলাদা আলাদাভাবে আড়ালে ডেকে নিয়ে প্রশ্ন করে এই গল্পে সবচে’ মহৎ কে?

রাজপুত্র উত্তর দেয় — রাজকন্যার স্বামী। তার ব্যাখ্যা, রাজকন্যার স্বামী প্রতিজ্ঞা তথা ধর্ম রক্ষার্থে নিজের স্ত্রীকে অন্যের ‘সেবা’য় পাঠিয়েছে এবং তাকে পুনরায় গ্রহন করেছে। সুতরাং সে ধার্মিক, ন্যায়নিষ্ঠ ও উদার। জ্ঞানী শুকপাখী রাজপুত্রকে যথার্থ রাজা হবার উপযুক্ত বলে অভিহিত করে।

মন্ত্রীপুত্র উত্তর দেয় — বাঘ। তার ব্যাখ্যা, এই জগতে ক্ষুধানিবৃত্তিই অগ্রাধিকারযোগ্য, নচেৎ প্রাণ বাঁচে না। সুতরাং বাঘ সবচে’ উদারতা দেখিয়ে নিজের মহত্ত্ব প্রমাণ করেছে। জ্ঞানী শুকপাখী মন্ত্রীপুত্রকে একজন ‘পেটুকশ্রেষ্ঠ’ বলে অভিহিত করে ভবিষ্যতে নিজের নোলা সামলানোর উপদেশ দেয়।

কোটালপুত্র উত্তর দেয় — তস্কর। তার ব্যাখ্যা, এই পৃথিবীর সবকিছু অর্থের বশ। অর্থলাভের জন্যই সবার সব কর্মকাণ্ড। সুতরাং নির্দ্বিধায় অলঙ্কারাদি ত্যাগ করে তস্করই সবচে’ বেশি মহত্ত্ব দেখিয়েছে। জ্ঞানী শুকপাখী কোটালপুত্রকে রত্মচোর হিসেবে সাব্যস্ত করে এবং তা ফিরিয়ে দিতে আদেশ দেয়। ধরা পড়ে গিয়ে কোটালপুত্র নিজের উরু চিরে রত্মটি বের করে দেয়।

জ্ঞানী শুকপাখী সর্বসমক্ষে রত্মটি রাজপুত্রের কাছে ফিরিয়ে দেয় কিন্তু এটা প্রকাশ করে না যে সেটা কার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে। রাজপুত্র-মন্ত্রীপুত্র-কোটালপুত্র সন্তুষ্ট হয়ে দেশে ফিরে যায়, তাদের মিত্রতা অক্ষুণ্ন থাকে।

***********************************************************

এই গল্পের প্রধান তিন চরিত্র — রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র আর কোটালপুত্র। বেশিরভাগ রূপকথার মতো এখানে তাদের কোন নাম নেই। তাদের জন্মপরিচয় শুধুমাত্র তাদের নামই না, তাদের শ্রেণী-অবস্থান ও চরিত্রও নির্ধারণ করে। এই বিবেচনায় তিন জনের মধ্যে রাজপুত্র সর্বশ্রেষ্ঠ এবং কোটালপুত্র সর্বনিকৃষ্ট। গল্পের শুরু থেকে এই সত্য খুব স্পষ্ট না হলেও ‘বাই কনভেনশন’ এটা পাঠকদের জানা থাকার কথা। এই জন্য প্রবাসে রত্ম রক্ষার ভার রাজপুত্রের ওপর পড়ে। রাজপুত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ব্যাঙ্গমা শাবকের চোখ ফোটানোর গল্প ফাঁদা হয় যেখানে দেখানো হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব বংশগত ব্যাপার যা রক্তে বিদ্যমান। এমন জাতবাদী কুৎসিত মতবাদ খুব কৌশলে গল্পে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। বস্তুত এটা একমাত্র উদাহরণ নয়। একই বিবেচনায় গল্পের শেষে তিন জনের মধ্যে নিকৃষ্ট জন, অর্থাৎ কোটালপুত্রই চোর বলে সাব্যস্ত হয়।

রূপকথার গল্পে রাজা বা রাজপুত্র হীন কর্মে লিপ্ত হয়েছিল, অথবা হীন কর্মে লিপ্ত হবার দরুণ রাজা বা রাজপুত্রের শাস্তি হয়েছে এমনটা আমরা খুব একটা দেখতে পাই না। কারণ, রাজা-রাণী-রাজপুত্র-রাজকন্যারা জাত বিচারে, শ্রেণী বিচারে, বর্ণ বিচারে সর্ব দোষত্রুটির ঊর্ধ্বে। তাই বিনা অপরাধে রাজা দুয়োরাণীর সাথে অন্যায় আচরণ করলেও শেষে শাস্তি হয় সুয়োরাণীর, যে কিনা আসলে নীচ জাতের কন্যা। রাজা গোঁফে তা দিয়ে দুয়োরাণীকে নিয়ে ঘর করে আর সুয়োরাণীর নির্বন্ধ — ‘হেঁটোয় কণ্টক দাও উপরে কণ্টক, ডালকুত্তাদের মাঝে করহ বণ্টক’।

এই গল্পের আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে যখন তিনজনই জানে তাদের একজন চোর, তখনও তারা চায় চোরের পরিচয় অপ্রকাশিত থাক; যদিও এতে ভবিষ্যতে দেশ একজন চোর রাজা অথবা চোর মন্ত্রী অথবা চোর কোটাল পেতে পারে। পরিহাসের বিষয়, কোটালের কাজ চোর ধরা। এই অপ্রকাশের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে ক্ষমতাকাঠামোসংশ্লিষ্টরা সচরাচর নিজেদের গোত্রের কারো ক্ষতি করে না বা এমন কিছু করে না যা ক্ষমতাকাঠামোতে বিভেদ তৈরি করে। এতে বিদ্যমান শোষণপ্রক্রিয়াটি অব্যাহত ও অক্ষত থাকে। এই পর্যটকদের দলে একটা রাখাল বা কৃষকপুত্র ধরনের কেউ থাকলে সে শুধু চোর সাব্যস্তই হতো না, সাথে সাথে জল্লাদ তার মুণ্ডুটাও কেটে নিত।

মন্ত্রীপুত্র বা কোটালপুত্রের দৈহিক বর্ণনা না থাকলেও গল্পের এক জায়গায় রাজপুত্রের দুধে-আলতা গায়ের রঙ, শ্রাবণের মেঘের মতো কালো, রেশমের মতো মসৃণ চুলের কথা আছে। আমরা জানি, রাজা-রাণী-রাজপুত্র-রাজকন্যারা সবাই ফর্সা হয়, কদাপি কালো নয়। সুতরাং এই রাজপুত্রের গায়ের রঙ দুধে-আলতা হবে এ আর বিচিত্র কী! সূক্ষ্ম নয়, খুব স্থূলভাবে আমাদের শিল্পে-সাহিত্যে-শিক্ষায়-আচরণে পদে পদে এভাবে বর্ণবাদের পাঠ দেয়া হয়। আমাদের বাক্য-আচরণ-কর্ম-সৃষ্টিতে তার প্রতিফলন পড়ে। একজন আলোকপ্রাপ্ত লেখকের লেখা থেকে উদাহরণ দেয়া যাক —

সুন্দর রাজার কালো মন্ত্রী। মন্ত্রীর সাত ছেলে — তারা কালো বান্দোর, আর এক মেয়ে — সে নিখুঁত সোন্দর। মন্ত্রী মেয়ের নাম দিলেন — কনকলতা। কালো ছেলেদের কারো নাম দিলেন — রামু, কারো সামু, কারো ধামু! যার যেমন মুখ তার তেমনি নাম — যেন সব কেলে হাঁড়ি আর কেলে হাতা।

(অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্র রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড, প্রকাশ ভবন, ১৯৫৪, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৪১৩)

ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। যারা অবন ঠাকুরের লেখাটির বাকি অংশ না জেনে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না, তারা সেটুকু পড়ে দেখতে পারেন। তাতেও কিছু পাল্টাবে না।

++++++++++++++++++++++++++++++

এখানে গল্পের ভেতরে যে আরেকটা গল্প আছে সেটা খুবই লক্ষ্যণীয় আখ্যান। গল্পটিতে পাঁচটি চরিত্র — রাজকন্যা, সন্ন্যাসী, রাজকন্যার স্বামী, বাঘ ও তস্কর। এই পাঁচ জনের চরিত্র বিচার করে দেখা যাক এদের মধ্যে আসলে মহৎ কে।

তস্করঃ একজন তস্কর চুরি বা ছিনতাইয়ের জন্য কারও অনুমতি চায় না। প্রথম সুযোগেই সে লক্ষ্য বস্তু নিয়ে কেটে পড়ে। এই তস্কর তার ব্যতিক্রম। তার অনুমতি চাইবার ধরন থেকে বোঝা যায় সে তস্কর পদবাচ্য নয়। রাজকন্যা ফিরে আসবে এবং তার হাতে অলঙ্কারাদি তুলে দেবে — এমনটা বিশ্বাস করা মূর্খতা। কার্যত রাজকন্যা সেটা করলেও এতে কারও মহত্ত্ব প্রমাণিত হয় না, বরং তস্কর ও রাজকন্যা উভয়ের মূঢ়তা প্রমাণিত হয়।

বাঘঃ একটি ক্ষুধার্ত বাঘ খাদ্যের কাছে কখনো অনুমতি প্রার্থণা করে না। নিমিষেই সে খাদ্যের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ভবলীলা সাঙ্গ করে। খেতে অনুমতি চাওয়া, রাজকন্যার ফিরে আসাতে আস্থা আনা, ফিরে আসা রাজকন্যাকে খেতে অস্বীকৃতি জানানো বাঘ ও রাজকন্যার নির্বুদ্ধিতা প্রমাণ করে, মহত্ত্ব নয়।

সন্ন্যাসীঃ এই গল্পের সন্ন্যাসী স্পষ্টতই একজন দুরাচার যে রাজকন্যার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ভোগ করার চেষ্টা করেছে। রাজকন্যার স্তোক বাক্য সে মেনে নিয়েছিল, কেননা এটা ভিন্ন অন্য কোন কিছু করার ক্ষমতা তার ছিল না। সে হয়তো অভিসম্পাত দিতে পারতো কিন্তু তাতে তার মনস্কামনা পূর্ণ হতো না। শেষ পর্যায়ে রাজকন্যা নিজেই তার কুটিরে হাজির হলে সে তাকে ভোগ করার সাহস করে উঠতে পারে না। এখানে সন্ন্যাসী বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। কারণ, রাজকন্যাকে ভোগ করলে পরবর্তীতে রাজকন্যা বা তার স্বামীর রোষে সে পতিত হবে। তাতে তার প্রাণ যাবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। কোন বিচারেই এই সন্ন্যাসীর মধ্যে কোন মহত্ত্ব নেই।

রাজকন্যার স্বামীঃ এই লোকটি একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সীমাবদ্ধ চিন্তার, দায়িত্ববোধহীন মানুষ। রাজকন্যার কাছে গল্পটি শোনার পর তার উচিত ছিল সন্ন্যাসীর রিরংসা ও কপটতা সম্পর্কে তাকে সচেতন করার এবং প্রতিশ্রুতিটির অসারত্ব বোঝানো। কিন্তু সেটি সে করেনি। কারণ তার মনে হয়েছে এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ধর্মীয় কর্তব্য। গোটা ব্যাপারটিকে যুক্তির আলোকে দেখার মতো সক্ষমতা তার ছিল না। রাজকন্যাকে যেতে অনুমতি দিলেও তার উচিত ছিল সাথে যাওয়া। রাত ও পথের বিপদের মধ্যে স্ত্রীকে ঠেলে দিয়ে সে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। ফিরে আসা স্ত্রীকে গ্রহন করার মধ্যে তার কোন মহত্ত্ব নেই, কারণ সে নিজেই স্ত্রীকে অন্যের কাছে পাঠিয়েছিল। রাজকন্যার স্বামী, ধারণা করা যায় কোন রাজপুত্র (যেহেতু রূপকথায় এর ব্যতয় হয় না)। এমন লোকের হাতে ভবিষ্যতে কোন রাজ্যের ভার অর্পণ করা বিপদজনক। অমন লোককে যে মহৎ বলে চিহ্নিত করে সেও তার মতো অপদার্থ এবং রাজ্যভার গ্রহনের অনুপযুক্ত।

রাজকন্যাঃ রাজকন্যা আপাদমস্তক কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও যুক্তিবোধহীন। সন্ন্যাসীর দাবী শোনার পর সে যে দুরাচার এটা বুঝতে না পারার কোন কারণ নেই। এই ধৃষ্টতা ও হীনতার জন্য ঐ মুহূর্তে সন্ন্যাসীকে শাস্তি দেয়াই তার উচিত ছিল। বরং তাতে তার ধর্মরক্ষা হতো। কিন্তু সে তা না করে অহেতুক প্রতিশ্রুতির জালে নিজেকে আবদ্ধ করে। এটা শিক্ষার অভাব। রাজকন্যা নিজেকে বাঁচানোর একটা উপায় হাতে রেখেছিল তার স্বামীর অনুমতির দোহাই দিয়ে; কিন্তু তার স্বামী মেরুণ্ডহীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দায়িত্ববোধহীন হওয়ায় তার শেষ রক্ষা হয় না। রাজকন্যা এটা বুঝতে অক্ষম যে বাঘ ক্ষুধার্ত হলেও তাকে খাবার অধিকারী নয় বা তস্কর অভাবগ্রস্থ হলেও তাকে সে অলঙ্কারাদি দিতে বাধ্য নয়। এই উভয় ক্ষেত্রেও সে নিজেকে অহেতুক প্রতিশ্রুতির জালে আবদ্ধ করেছে। এটা নির্বোধের কর্ম। এই রাজকন্যা হয়তো তার স্বামীকে ধার্মিক, বিবেচনাবোধসম্পন্ন মনে করে মাথায় তুলবে; কিন্তু এমন স্বামীকে তার পরিত্যাগ করাই উচিত ছিল। এই রাজকন্যা এমন কিছু করেনি যার দরুণ তাকে মহৎ বলে চিহ্নিত করা যাবে।

পূর্বোল্লেখিত রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র বা কোটালপুত্রের কেউ রাজকন্যাকে মহত্ত্বের উপযুক্ত বিবেচনা করেনি। এমনকি আখ্যান রচয়িতা বা কথকও রাজকন্যার মধ্যে কোন মহত্ত্ব খুঁজে পায় না, তার জন্য দুটো বাক্য ব্যয় করে না। সত্যিই তো, রাজকন্যা হলেও সে তো আসলে ‘মেয়েমানুষ’! সে মহৎ কি মহৎ না সেটা কি একটা বিবেচ্য বিষয় হলো! আমাদের লোকগাঁথার পরতে পরতে নারীবিদ্বেষের বা নারীকে হেয় করার চেষ্টা দেখা যায়।

বস্তুত জ্ঞানী শুকপাখীর গল্পে কোন মহৎ চরিত্র নেই। সেখানে রাজকন্যা, বাঘ আর তস্করের মতো তিনটি করুণাকর চরিত্র এবং সন্ন্যাসী আর রাজকন্যার স্বামীর মতো দুটি হীন চরিত্র আছে। আমরা বরং ভাবতে পারি জ্ঞানী শুকপাখী চোর ধরতে এই গল্পটা কেন বলল!

++++++++++++++++++++++++++++++

মূল গল্পতে ফেরা যাক।

যেহেতু রাজপুত্র নিজে নিঃসন্দেহ ছিল যে সে নিজে চোর না, তাই তার মধ্যে একটা সংশয়ই কাজ করবে — বন্ধুদের কেউ যেন চোর বলে সাব্যস্ত না হয়, কিন্তু রত্মটা যেন উদ্ধার হয়। একই কথা মন্ত্রীপুত্রের জন্যও সত্য। ব্যতিক্রম শুধু কোটালপুত্র। সে নিজে চোর বলে তার আকাঙ্খা থাকবে একটাই — সে যেন ধরা না পড়ে। সে হয়তো এটা ভেবে থাকতে পারে — ধরা না পড়ে কী করে রত্মটা ফেরত দেয়া যায়। অথবা এটাও ভেবে থাকতে পারে কী করে ধরা না পড়ে রত্মটা আত্মসাৎ করা যায়। তাদের তিন জনের আলাদা আলাদা ভাবনার প্রতিফলন তাদের আচরণ ও অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট হবার কথা। কিন্তু যেহেতু তারা প্রথমেই ঠিক করে নিয়েছিল তারা নিজেদের ভেতরে চোর ধরবে না, তাই তারা একে অন্যের আচরণ বা অভিব্যক্তিতে চোর খোঁজার চেষ্টা করেনি।

‘রাজপুত্র-কোটালপুত্র’ অথবা ‘রাজপুত্র ও তার অধস্থনরা’ সিনড্রোমের এটা হচ্ছে প্রথম বৈশিষ্ট্য যেখানে শোষকশ্রেণী নিজেদের শোষণপ্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার জন্য শ্রেণীমধ্যস্থ দুর্নীতিগুলোকে প্রশ্রয় দেয়। এই কারণে, আবুলদের হারিয়ে মফিজরা যখন ক্ষমতায় আসে, তখন মফিজরা আবুলদের নামে নানা রকম হয়রানীর মামলা দেয় বটে কিন্তু আবুলরা সুইস ব্যাংকে যে বিপুল টাকা সরিয়েছে সেটা উদ্ধারের চেষ্টা করে না। মফিজরা জানে আগামী কাল আবুলরা আবার ক্ষমতায় আসতে পারে তখন নিজেরা যে টাকা সুইস ব্যাংকে সরিয়েছে সেটা বাঁচানোর জন্য আজকে আবুলদের টাকাপয়সা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা যাবে না। তাছাড়া এসব ঘাঁটাঘাঁটি করলে টাকা সরানোর প্রক্রিয়াটা যেমন ফাঁস হয়ে যাবে তেমন যেসব পাইক-বরকন্দাজ সব আমলে এইসব ‘সার্ভিস’ দিয়ে থাকে তাদের পরিচয়ও প্রকাশ হয়ে যাবে। সুতরাং কী দরকার বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো-শোষণকাঠামোকে বিপদে ফেলার!

‘রাজপুত্র-কোটালপুত্র’ সিনড্রোমের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিতান্ত নিরূপায় অবস্থায় ক্ষমতাকাঠামো-শোষণকাঠামোর অধস্থন জনকে বলি দেয়া। এই কারণে হীন সব হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি, অপকর্মের ঘটনায় শান্ত্রী-পেয়াদাদের কালেভদ্রে শাস্তি হলেও ষড়যন্ত্রী বা ষড়যন্ত্রের হোতা, অপকর্মের অর্থের যোগানদাতা, অপরাধ সংঘটনকালে নিষ্ক্রিয় থেকে অপরাধ ঘটতে দেয়া রাজ পরিবারের সদস্যকূল-মন্ত্রীকূল-সেনাপতিকূলদের কখনো বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। বরং তারা নিরাপদ আশ্রয়, পদোন্নতি, বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, বিদেশে চাকুরী ইত্যাদি পেয়ে থাকে।

‘রাজপুত্র-কোটালপুত্র’ সিনড্রোমের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অভিজাততন্ত্রে শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখা। এখানে যে অধিকতর ক্ষমতাবান সে অধিকতর অভিজাত, অধিকতর সুন্দর, অধিকতর জ্ঞানী, অধিকতর মহৎ, অধিকতর সমঝদার, অধিকতর গুণী। তাই বৈধ-অবৈধ যে কোন উপায়ে কেউ ক্ষমতাশীর্ষে আরোহন করতে পারলে সে সর্বদোষমুক্ত ও সর্বগুণেগুণান্বিত হয়ে যায়। তার এই শ্রেষ্ঠত্ব বাকিরা বিনা প্রশ্নে মেনে নেয় এবং তদানুরূপ তোষামোদ করে। ক্ষমতাশীর্ষে পরিবর্তন আসলে বাকিরা ক্ষমতাচ্যুতের পক্ষাবলম্বন করে না, বরং সে বিস্মৃতিতে চলে যায়। ক্ষমতাচ্যুত জন কাঠামোর তলানীতে চলে যাওয়ায় শৃঙ্খলা রক্ষার্থে তার জন্য কেউ ওকালতী করে না। শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে কাঠামোর নিচের দিকে থাকা কোটালপুত্রকে কখনো কখনো চোর সাজতে হবে বা চোরের অপবাদ সইতে হবে। কোটালপুত্র হাসিমুখেই এটা মেনে নেয়, কারণ জানে এই অপবাদ সাময়িক। অচিরেই যখন চারদিক ঠাণ্ডা হয়ে যাবে তখন সে ক্ষতিপূরণসহ স্বপদে ফিরে যাবে। এভাবে শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখলে অভিজাততন্ত্র টিকে থাকবে, শোষণ টিকে থাকবে।

***********************************************************

আগ্রহী পাঠকের জন্য লিঙ্কঃ

০১. কাজলরেখা সিনড্রোম
০২. মধুমালা সিনড্রোম


মন্তব্য

নীড় সন্ধানী এর ছবি

রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র, কোটালপুত্র এই তিনজনের জায়গায় আপনি বর্তমান ব্যবস্থার তিনটে শ্রেনীকে বসিয়ে দেখুন ফলাফল কী আসে।
রাজপুত্র= রাজনীতিবিদ, মন্ত্রীপুত্র =আমলাতন্ত্র, কোটালপুত্র=সশস্ত্রবাহিনী
প্রত্যেকে প্রত্যেকের রক্ষাকবচ। প্রত্যেকে প্রত্যেকের স্বার্থের সাথে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত।

আমার ধারণা ফলাফল যুগে যুগে একইরকম আসবে।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

গল্প যদি চিরায়ত হয় তাহলে তার উপযোগিতাও চিরায়ত হবে। তাছাড়া একই সময়ে স্কেল ছোট বড় করলেও উপযোগিতায় পার্থক্য হবে না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

গায়ের চামড়া ফর্সা হলে খাতির মেলার ব্যাপারটাকে "বর্ণবাদ" বলা কি ঠিক? বর্ণবাদে বর্ণ যতো না গায়ের রঙের ওপর ভিত্তি করে, তারচে বেশি সমাজকাঠামোয় গোষ্ঠীগত অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। পটুয়াখালির রাখাইন সম্প্রদায় বা রাঙামাটির চাকমারা বাঙালির চেয়ে কয়েক দাগ বেশি ফর্সা, কিন্তু বর্ণবাদী আচরণের শিকার তারা হচ্ছে। কুর্দিদের ওপর আরব ও তুর্কিদের অত্যাচারের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।

ফর্সা ত্বকের ওপর জোর দেওয়ার ব্যাপারটাকে নতুন কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা উচিত; আমি একে "শুক্লগূঢ়ৈষা" বলার পক্ষপাতী।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপনার ব্যাখ্যা সঠিক। সত্যি বলতে কি আমি জুতসই এমন একটা শব্দ পাইনি যেটা দিয়ে এই ব্যাপারটাকে বোঝানো যায়, তাই বর্ণবাদ বলেছি। বর্ণবাদ, জাতিবিদ্বেষ ইত্যাদি কাছাকাছি বিষয়ের তুলনায় এই 'গৌরপ্রীতি' ব্যাপারটা আরেকটু দূরের।

'গূঢ়ৈষা' শব্দটার মানে হচ্ছে complex। যেমন Oedipus complex = ইদিপাস গূঢ়ৈষা। কিন্তু এখানকার এই গৌরপ্রীতি'র ব্যাপারটিকে কি ঠিক গূঢ়ৈষা বলা যায়? এটা যতটা না মনোজাগতিক ব্যাপার তারচেয়ে ঢেড় বেশি সামাজিক সংস্কার যা ব্যক্তির চিন্তার প্যাটার্নকে প্রভাবিত করে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

১। এই প্রশ্নটা আপনি আমাকেও করেছিলেন একবার - অন্য এক লেখকের একটি পোস্টের মন্তব্যঘরে আমার মন্তব্যের প্রেক্ষিতে (এখানে ৭ নং বা ১১/০৮/২০১৫ - ৬:০২পূর্বাহ্ন-চিহ্ণিত মন্তব্যটি দেখুন)।
তখন আমার মাথায় কোন উত্তর আসেনি, তবে এখন আমি "গাত্রবর্ণ-গূঢ়ৈষা" বা আরও সহজবোধ্য ও সরাসরি কিছু চাইলে "গাত্রবর্ণবাদ" - এই দুইয়ের কোন বিকল্প এই মুহূর্তে অন্তত দেখছি না।

২। আপনার একটা লাইন যদি সঠিক বুঝে থাকি তাহলে একটুখানি দ্বিমত করি। এটা "মনোজাগতিক" ব্যাপার তো বটেই! তবে এই "মনোজাগতিক ব্যাপারটা" বাস্তব বা ফিজিকাল জগতে প্রকাশিত হয় এবং তাকে এফেক্ট করে, প্রভাবিত করে। সামাজিক সংস্কার এবং ঘোষিত ও অঘোষিত বা স্বীকৃত ও আনুষ্ঠানিকভাবে অনস্বীকৃত মূল্যবোধগুলি এবং ব্যক্তির মনোজগত - এই দুইয়ের মধ্যে সার্বক্ষণিকভাবেই একটা মিথস্ক্রিয়া চলে - এরা সবসময়ই পরস্পর পরস্পরকে প্রভাবিত করে, ফীড করে, নির্মান ও পূণর্নির্মান করে। সোজা কথায় এরা একে অপরকে যেমন শেপ দেয়, তেমনি একে অপরকে তৈরিও করে। একটি ছাড়া অপরটি সম্ভব নয়। কোনটা বেশি কোনটা কম সেই আলোচনা বোধহয় খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে হ্যাঁ, পরিস্থিতি বদলাতে হলে বাস্তব দুনিয়াতে অর্থাৎ ব্যবহারিক দিকটাতেই মনোযোগ দিতে হবে আগে (বেশি অর্থে না)।

৩। উপরে হিমুর মন্তব্যের জবাবেই যেমন বলেছি, ইংরেজিতে কোন নির্দিষ্ট এবং শুধুমাত্র গাত্রবর্ণের প্রতি এই ধরণের পক্ষপাত বা বিপক্ষপাতকে 'কালারিজম' বলে। আর এর বাংলা হিসেবে আমি শুক্ল/সাদা/শ্বেত/গৌর/কৃষ্ণ/কালো/শ্যামলা ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট রংসূচক বা রংনির্দেশক শব্দসমৃদ্ধ পরিভাষার পক্ষপাতী না। কারন বৈষম্য বা পক্ষপাতটা আপাতদৃষ্টিতে যতই একমুখী মনে হোক বা বাস্তবেই ওভারহোয়েল্মিং হোক না কেন, আসলে কিন্তু তা ১০০% বা সম্পুর্ণ ইউনিভার্সাল না! বায়াস বা নেগেটিভিটিটা উল্টোমুখীও কিন্তু আছে প্রচুর ক্ষেত্রে। সুতরাং আমার মনে হয়, শুক্ল/সাদা/স্বেত/গৌর/কৃষ্ণ/কালো ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট রংসূচক শব্দের বদলে ইংরেজি Colorism-এ "কালার"-এর মতোই কোন নিরপেক্ষ বা নিউট্রাল শব্দ ব্যবহার করা উচিত বাংলা পরিভাষায়। তা না হলে খোদ পরিভাষাটাই "Colorist" হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে! দেঁতো হাসি

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

১। আপনার ঐ মন্তব্যের উত্তরে আমি বলেছিলাম -

একটা খটকা কিন্তু আমার মনে থেকেই যাচ্ছে। ভারতবর্ষে (জাতি নির্বিশেষে) পার্টিকুলারলি গায়ের রঙের গাঢ়ত্বের পার্থক্যের দরুণ যে বৈষম্যমূলক আচরণ সেটাকে একটা জুতসই শব্দে কীভাবে প্রকাশ করা যায়?

-এর সমাধানটা আমাদেরকেই করতে হবে। আপনি যেহেতু এই বিষয়ে আগে আরও লিখেছেন সুতরাং আপনি কষ্ট করে একটা পোস্ট দিন যেখানে শুধুমাত্র শব্দ/টার্মগুলোর জুতসই ও সঠিক অর্থবোধক বাংলা প্রতিশব্দ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হবে।

২। আপনার বক্তব্যের সাথে আমার দ্বিমত আছে। তবে বিষয়টি এই পোস্টের সাথে খুব একটা প্রাসঙ্গিক না বলে এখানে আর এই আলোচনাটা বাড়াতে চাচ্ছি না। পরে কোথাও এটা নিয়ে আবার বলা যাবে। ক্ষমা করবেন।

৩। সহমত। এটা নিয়ে অন্যত্র বলেছি।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

ইংরেজিতে একে মনে হয় "কালারিজম" বলে। আর হ্যাঁ, "শুক্লগূঢ়ৈষা" মনে হয় ঠিক হবে না, কারন বৈষম্য বা পক্ষপাতটা আপাতদৃষ্টিতে যতই একমুখী মনে হোক বা বাস্তবেই ওভারহোয়েল্মিং হোক না কেন, আসলে কিন্তু তা ১০০% বা সম্পুর্ণ ইউনিভার্সাল না! বায়াস বা নেগেটিভিটিটা উল্টোমুখীও কিন্তু আছে প্রচুর ক্ষেত্রে। সুতরাং আমার মনে হয়, শুক্ল/সাদা/স্বেত/গৌর/কৃষ্ণ/কালো ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট রংসূচক শব্দের বদলে ইংরেজি Colorism-এর কালার-এর মতোই কোন নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা উচিত।

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

কালারিজমকে সোজাসুজি বাংলা করলে সেটা হয় বর্ণবাদ (color = বর্ণ, ism = বাদ)। তো লেগে গেল ঝামেলা! এখন আমাদের উচিত racism, colorism, apartheid প্রভৃতি শব্দগুলোর সঠিক অর্থবোধক ও পার্থক্যপূর্ণ বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে বের করা বা তৈরী করা। তাহলে সঠিক শব্দ ব্যবহার না করার দরুণ সৃষ্ট বিভ্রান্তি ও বিতর্ক থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

আমি colorism-এর বাংলা -

গাত্রবর্ণবাদ

-প্রস্তাব করলাম।

আমার মতে এটা এখানে উপরে আপনার-আমার-হিমুর আলোচিত মন্তব্যগুলিতে সবগুলি ক্রাইটেরিয়াই ফুলফিল করে, প্লাস আরও কিছুঃ--
১। এটা সরাসরি ও সহজবোধ্য - চট করেই বুঝে ফেলা যায় ঠিক কি বোঝানো হচ্ছে।
২। সহজে উচ্চারণযোগ্য - ফলে সহজে লেখা বা ফর্মাল পরিবেশে ব্যবহারের পাশাপাশি দৈনন্দিন ঘরোয়া ভঙ্গির সহ যেকোন ধরণের বিতর্ক বা আলাপচারিতাতেও সহজেই ব্যবহারযোগ্য - কোনরকম অস্বস্তি, দ্বিধা বা ইতস্তত না করেই।
৩। সহজে স্মরণযোগ্য। এটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।
৪। এটা সঠিক ও সুনির্দিষ্ট অর্থবোধক ও পার্থক্যপূর্ণ বাংলা প্রতিশব্দ - এটাকে racism বা apartheid -এর কোন বাংলার সাথে গুলিয়ে ফেলার অবকাশ নেই। শব্দটা এতই আত্নব্যাখ্যামূলক, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীণ যে, বলামাত্র এর সুনির্দিষ্ট ও একমাত্র অর্থ নিঃসংশয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়।
৫। এটা ইংরেজি colorism-এর মতোই নির্দিষ্ট রঙ বা গাত্রবর্ণের উল্লেখবিহীণ নিরপেক্ষ একটা শব্দ। এর মধ্যে শুক্ল/সাদা/শ্বেত/গৌর/কৃষ্ণ/কালো/শ্যামলা ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট রংসূচক বা রংনির্দেশক কোন শব্দ বা শব্দাংশ নেই। সোজা কথায় "গাত্রবর্ণবাদ" শব্দটির নিজেরই গাত্রবর্ণবাদী হয়ে ওঠার কোন সুযোগ নেই।

এবারে আপনার (এবং অন্যদেরও) যদি কোন দ্বিমত থাকে, তাহলে সেটা উল্লেখ করে আমার বক্তব্য ও যুক্তি রিফিউট করুন এবং মতামত দিন। তাহলে আমার প্রস্তাব ও যুক্তির কোন দুর্বলতা থাকলে - এই শব্দটি শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য কিনা তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এভাবেই - এই প্রক্রিয়াতেই হয়তো - আমাদের পরিভাষার সন্ধান এগুতে পারে।

আপনি যেহেতু এই বিষয়ে আগে আরও লিখেছেন সুতরাং আপনি কষ্ট করে একটা পোস্ট দিন

আপত্তি ছিল না, কিন্তু নানা ঝামেলায় আস্ত পোস্ট দেয়ার মতো শক্তি জমায়েত করতে পারছি না। তবে, এভাবেই তো সুনির্দিষ্ট ইস্যু বা শব্দভিত্তিক মন্তব্যে-মন্তব্যে বিষয়টা এগুতে পারে? পারে না? পরে নাহয় সবগুলি মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য একত্র করে ঝেড়েপিটে একটা উইনিফাইড পোস্ট দিয়ে দিব? সেটাই বরং অনেক সলিড হবে, সব দৃষ্টিভঙ্গির ফিল্টারে আগে থেকেই পরিশ্রুত হয়ে আসার ফলে।

****************************************

হিমু এর ছবি

গাত্রবর্ণবাদ শব্দটা খারাপ না।

একই স্পৃহায় বলীয়ান হয়ে "শিক্ষিত" মানুষ আপন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কৌলীন্য নিয়ে যখন অপরকে খাটো করে সুখ পেতে চেষ্টা করেন, তখন এর পেছনে কাজ করা অপভেদপ্রবণতাকে "ছাত্রবর্ণবাদ", আর সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা যখন নিরস্ত্র অপ্রশিক্ষিত জনগণকে ব্লাডি সিভিলিয়ান ডেকে ম্যাগাজিন খালি করার সুখ পান, তার পেছনের বৈষম্যবাদকে "ক্ষাত্রবর্ণবাদ" বলা যেতে পারে।

এ ছাড়া কলাবাগানকে "উত্তর ধানমণ্ডি" বলে শুক্রাবাদকে করুণার চোখে দেখা, কবিতার নামে হাবিজাবি লিখে "অমুক দশকের কবি" কোটায় ঠাঁই নেওয়ার চেষ্টা করা, কমারস্যান্ট উইকেন্ড নামের পুরস্কার পেয়ে কমারস্যান্ট জুরি পুরস্কার পাওয়ার গুজব রটিয়ে অপরাপর সিনেমানির্মাতাকে ভারি ভারি উপদেশ দেওয়া, ইত্যাদি চৌধুরীবাদিতার ফাতরামিকে সামগ্রিকভাবে "ফাত্রবর্ণবাদ" বলার জোর দাবি তুললাম।

মন মাঝি এর ছবি

চলুক
আপনার জোর দাবীতে আমার পূর্ণ সমর্থন জানালাম! দেঁতো হাসি

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

গাত্রবর্ণবাদ, ছাত্রবর্ণবাদ, ক্ষাত্রবর্ণবাদ (মতান্তরে হাঁটুবর্ণবাদ), ফাত্রবর্ণবাদ ইত্যাদিতে সমর্থন!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ইউনিফায়েড পোস্টের জন্য অপেক্ষায় নাজির!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

উঁহু, এইভাবে পিছলায়ে গিয়ে দর্শকসারিতে অবস্থান নিলে চলবে না তো। সব ইন্টারেস্টেড পার্টিদের পার্টি-সিপেট করতে হবে বৈকি। আমি একা পারব না। আমি "কালারিজম" তথা শুধুমাত্র ত্বকের রঙের ভিত্তিতে বৈষম্যের বাংলা করলাম (ওহ্‌হো, এ ব্যাপারে আপনার মত দেননি এখনো), রেইসিজমের বাংলা 'বর্ণবাদ' আগে থেকেই আছে। বাকি রইলো এপার্টহেইড। এটা আপনি, হিমু বা অন্য কেউ করুন। এছাড়াও একই ধারার আরও অনেকগুলি শব্দ বা কন্সেপ্ট আছে। সবাই মিলে সেগুলি করতে হবে - আপনাকেও হাত লাগাতে হবে বৈকি। সেসব হলে পরেই একটা ইউনিফায়েড পোস্ট বাস্তবসম্মত হবে। ঐ পোস্টটা সব পার্টিসিপেন্ট মিলে দিতে পারি বা সবার হয়ে আমিও দিতে পারি। আমি আপাতত এখানে আরও কিছু শব্দ আর একটা মানদণ্ড প্রস্তাব করছিঃ--

এ্যাসপিরেশনাল মানদণ্ডঃ বহুল-ব্যবহৃত বা বহুল-ব্যবহার্যতার প্রত্যাশী পরিভাষার অনুবাদ / ভাবানুবাদ বা নতুন কয়েনিংগুলিতে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য থাকলে ভালো হয়। এগুলি সর্বক্ষেত্রে থাকতেই হবে এমন কথা নেই - কারন সবক্ষেত্রে এসবের বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে। তবে যেখানে সম্ভব সেখানে থাকলে ভালো হয় এবং সেগুলিকেই অগ্রাধিকার দেয়া উচিতঃ--

১। সহজবোধ্যতা। উদ্দিষ্ট অর্থটা যত সহজে বোঝা যাবে, পরিভাষাটির পাব্লিক এ্যক্সেপ্টিবিলিটি বা গ্রহণযোগ্যতা এবং সেহেতু বহুল ব্যবহারের সম্ভাবণা তত বাড়বে, সমানুপাতিক হারে ইংরেজিটা ব্যবহারের সম্ভাবণাও ততই কমবে।
২। সহজে উচ্চারণযোগ্যতা। সহজে উচ্চারণ করতে না পারলে মানুষ প্রায়ই সেসব শব্দ এড়িয়ে যায়, এমনকি মনেও রাখতে পারে না। বরং ইংরেজিটা দিয়েই বা অন্য কোন ভুল শব্দ দিয়ে কাজ চালিয়ে দেয়। এসব ক্ষেত্রে তাই অতিদীর্ঘ, যুক্তাক্ষরবহুল ভারি বা টাং-টুইস্টার শব্দ বর্জনীয়। শব্দটা এমন হওয়া উচিত যাতে সহজে লেখা বা ফর্মাল পরিবেশে ব্যবহারের পাশাপাশি দৈনন্দিন ঘরোয়া বা অন্য যেকোন ধরণের বিতর্ক বা আলাপচারিতাতেও সহজেই ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে - কোনরকম অস্বস্তি, দ্বিধা বা ইতস্তত না করেই। ১নং-এ বলা জনগ্রহণযোগ্যতা ও তার ফলাফল সংক্রান্ত কারনটিও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
৩। সহজে স্মরণযোগ্য। এটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। মনে না থাকলে মানুষ এটা বারবার ভুলে গিয়ে ইংরেজি বা অন্যকিছু ব্যবহার করবে। মনে রাখাতে হলে প্রথম দু'টি শর্ত পূরণ করতে হবে।
৪। এটা সঠিক ও যথাসম্ভব সুনির্দিষ্ট অর্থবোধক ও পার্থক্যপূর্ণ বাংলা প্রতিশব্দ বা শব্দবন্ধ হতে হবে। পার্থক্যপূর্ণের মানে হচ্ছে যাতে এটাকে কাছাকাছি অর্থের অন্য কোন বাংলা শব্দের সাথে গুলিয়ে ফেলা না যায়।
৫। এটাকে যথাসম্ভব একটা নিরপেক্ষ ও নন-ডিস্ক্রিমিনেটরি বা বৈষম্যহীণ শব্দ হতে হবে। পরিভাষাটির বিরুদ্ধে যেন বৈষম্য, আনফেয়ারনেস বা অন্য যে কোন ধরণেরই অগ্রহণযোগ্য মনোভাব বা মূল্যবোধ ধারণের অভিযোগ আসার আশঙ্কা না থাকে।

ব্যস্‌, আমার তরফ থেকে আপাতত এটুকুই ক্রাইটেরিয়া সংক্রান্ত প্রস্তাব।

এবারে রেসিজম, বৈষম্য ইত্যাদির কাছাকাছি আরও কিছু শব্দের প্রসঙ্গে আসা যাক। এপার্টহেইডের কথা আপনি আগেই বলেছেন। বৈষম্য অনেক রকম আছে, কিন্তু আমি নীচে আমাদের সমাজে যেগুলির প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায় সেগুলির কথাই উল্লেখ করলাম (এপার্টহেইড বাদে)। তাই এগুলি নিয়েও হয়তো ভাবা যেতে পারেঃ--
Apartheid, Xenophobia, Ethnocentrism,
Ageism, Ableism, Transphobia, Discrimination against intersex people, Heightism, linguicism, Lookism, [url=https://en.wikipedia.org/wiki/Mentalism_(discrimination)]Mentalism or sanism[/url], Rankism, Sexual orientation discrimination, Anti-intellectualism, Genderism, atheophobia, ইত্যাদি।

এর মধ্যে সবগুলিই অনুবাদ বা ভাবানুবাদের প্রয়োজন আছে কিনা, সেটাও অবশ্য বিবেচ্য বিষয়। তবে সবাইকেই হাত লাগাতে হবে। হিমু প্রায়ই দারুন-দারুন নতুন শব্দ উপহার দেন, এবারে ফাঁকতালে আমি বোধহয় একটা দিলাম। এবার আপনার পালা! দেঁতো হাসি

****************************************

হিমু এর ছবি

এই মানদণ্ডগুলো বাপমায়ের আদুরে ওবিজ মুখে-তুলে-খাইয়ে-দেওয়া সোনামণিদের জন্যে মনে হচ্ছে।

পরিভাষাকে "শিং-নেই-নোখ-নেই-করেনাকো-ফোঁসফাঁস-মারেনাকো-ঢুঁশঢাঁশ" হতে হবে কেন? "সহজবোধ্যতা" কার বোধের মাপে? রেসপনসিবিলিটির বাংলা "দায়িত্ব" (সবাই এখন দ এর নিচে একটা ব ফলা গুঁজে দ্বায়িত্ব/দ্বায়ীত্ব লেখে, মনে হয় দায়িত্বের নিচে একটা কীলক গুঁজে দিলে দায়বহনে ওনাদের সুবিধা হয়), এটা তো দুর্বোধ্য বা দুরুচ্চার্য কিছু না, কয়জন ব্যবহার করে?

আমরা যখন ইংরেজি শিখি, কই, কেউ তো আবদার করে না, ইংরেজি শব্দগুলোকে সহজবোধ্য, সুরুচ্চার্য, সুগম, সুবোধ্য, সুজলাসুফলাশস্যশ্যামলা হতে হবে? আপনি যে ইংরেজি শব্দগুলোর পরিভাষা প্রস্তাব করছেন, ওখানে কয়টা আপনার উল্লেখ করা মানদণ্ডমালায় উৎরে আসবে?

বাংলা পরিভাষার দায় একটাই, অর্থের সফলতম প্রকাশ। তার জন্যে যদি কখনোসখনো একটু খটমটে হয়েও যায়, তো তা-ই সই।

মন মাঝি এর ছবি

এই মানদণ্ডগুলো বাপমায়ের আদুরে ওবিজ মুখে-তুলে-খাইয়ে-দেওয়া সোনামণিদের জন্যে মনে হচ্ছে।

হা হা হা! একদম ঠিক ধরেছেন!!! এটা ওনাদের জন্যই। সোনামনিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে আমার ধারণা, আর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক সোনামনিদের কেটার করা বা সর্বোচ্চ সাবস্কৃপশনই আমার লক্ষ্য, নয়তো আমার আশঙ্কা উল্টো কিছু করলে আমি বা আমরা যে পরিভাষাই কয়েন করি না কেন তা অব্যবহৃতই পড়ে থাকবে - যা আমাদের দিক থেকে কাঙ্ক্ষিত হওয়া উচিত নয় - যদি না আমরা স্রেফ পরিভাষা প্রণয়নের আনন্দেই সেটা করতে চাই, আদৌ তা চললো কি চললো না তার কোনরকম প্রত্যাশা না রেখেই। যাহোক, এটা আমার একটা ব্যক্তিগত চিন্তা বা ধারণামাত্র - বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। এতে ভুলও থাকতে পারে। তাইতো এটা "প্রস্তাব" আকারে সম্মানিত সচল সদস্যদের চিন্তার খোরাক যোগানোর জন্য শেয়ার বা পেশ করেছি মাত্র, পুরোটা বা কোনটাই মেনে নিতে হবে এমন কোন অদ্ভূত আবদার করিনি। প্রত্যেকেই নিজ নিজ লক্ষ্য নিজের মতো করে স্থির করবেন। সেই প্রক্রিয়াতে আমার "প্রস্তাব"টা যদি কোন চিন্তার খোরাক যোগায় তো ভালই, না যোগালেও কোন অসুবিধা নাই। দিস ইজ জাস্ট ফর অফ ইওর কাইন্ড কনসিডারেশন অনলি।

"সহজবোধ্যতা" কার বোধের মাপে?

ব্যক্তি অনুবাদক / ভাবানুবাদক / প্রণয়নকারী যেটা বেশির ভাগ মানুষের জন্য "সহজবোধ্য" মনে করবেন। এই "বেশির ভাগ" মানুষের সংজ্ঞা, পরিধি বা কোন লেভেল বা স্তরের ব্যাপ্তির মধ্যে এই "বেশির ভাগ"-এর বিস্তৃতি - তা তিনিই নির্ধারণ করবেন। এখানে "সহজবোধ্যতা" একটা চাবিশব্দ মাত্র, যার পূর্ণরূপ ব্যক্তি অনুবাদক / ভাবানুবাদক / প্রণয়নকারী নিজের মতো করে ঠিক করবেন।

এটা তো দুর্বোধ্য বা দুরুচ্চার্য কিছু না

সহজ জিনিসকেও অনর্থক জটিল করে ফেলা অনেকের একটা পুরনো রোগ। এজন্য শুধু "দায়িত্ব" "দ্বায়িত্ব/দ্বায়ীত্ব" হয়ে যায় না, সার্থক হয়ে যায় "স্বার্থক", "সাক্ষ্য" হয়ে যায় স্বাক্ষ্য, ইত্যাদি। এই ব-ফলাটা অপ্রয়োজনেই যত্রতত্র দেখা যায়। অনেকে মনে হয় অবচেতনে বানানকে জটিল করে তুলতে পারলে অন্যের চোখে নিজের ওজন বাড়ে বা শিক্ষার স্তর উঁচু হয়ে যায় বলে মনে করেন। হয়তো স্কুলের শিক্ষায় কোন গন্ডগোল আছে। এগুলি আমার অনুমান মাত্র। সঠিক জানি না। তবে এতে করে লাগসই ক্ষেত্রে সহজতার চর্চা ভুল হয়ে যায় না।

আমরা যখন ইংরেজি শিখি, কই, কেউ তো আবদার করে না, ইংরেজি শব্দগুলোকে সহজবোধ্য, সুরুচ্চার্য, সুগম, সুবোধ্য, সুজলাসুফলাশস্যশ্যামলা হতে হবে?

হা হা হা! না, তা করে না। করে না, কারন ইংরেজি বিদেশী ভাষা এবং এটা বদলানোর বা এখানে নিজেদের সুবিধা মতো নতুন নতুন শব্দ প্রণয়নের বা ঢোকানোর আমাদের তেমন কোন সুযোগ নেই। যেভাবে এটা ইতিমধ্যেই আছে সেভাবেই শিখতে আমরা প্রায় বাধ্য!

আপনি যে ইংরেজি শব্দগুলোর পরিভাষা প্রস্তাব করছেন, ওখানে কয়টা আপনার উল্লেখ করা মানদণ্ডমালায় উৎরে আসবে?

কি জানি! কি এসে যায় তাতে? উৎরালে উৎরাবে, না উৎরালে না উৎরাবে! এটা তো কোন পরীক্ষা নয় যে পাশ-ফেলের কোন প্রশ্ন আছে বা সার্টিফিকেট পাবেন না বলে ভয় আছে। এটা কোন বেদবাক্য নয়, নয় কোন সামরিক সরকার বা সেনানির্ভর তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফরমান, যে মানতে বা উৎরাতেই হবে! যদি কারও প্রস্তাবিত পরিভাষাই ঐ মানদণ্ডমালায় উৎরাতে না পারে, তাহলে না-উৎরানোগুলির মধ্য থেকেই গণতান্ত্রিক বা ব্যক্তিতান্ত্রিক যেকোন একটা প্রক্রিয়ায় আমরা সেরাটা বেছে নিব। কাহিনি শেষ। মানদণ্ডমালার হেডিং-টা লক্ষ্য করুন। আমি লিখেছি এটা একটা "এ্যাসপিরেশনাল" মানদণ্ড মাত্র। অর্থাৎ একটা উচ্চাকাংখী লক্ষ্যনির্ভর মানদন্ড (অর্থাৎ, হয়তো পুরোপুরি বাস্তব লক্ষ্যনির্ভর নয়)। লক্ষ্যটা গোড়াতেই উপরের দিকে নির্ধারণ না করে আগেই হাল ছেড়ে দিলে বাস্তব অর্জনটা আসলে যতটা হতে পারতো হয়তো নিরর্থক তার থেকে অনেক কম হবে। অন্যভাবে বললে, পারা যাবে - এই আশা নিয়ে শুরু করলে পারার একটা সম্ভাবণা হয়তো থাকে। পারা যাবে না - গোড়াতেই এই ধারণা নিয়ে শুরু করলে, যেটা পারা যেত সেটাও তথন আর কিছুতেই পারা যাবে না। এটা একটা জেনারেল রুল। এই কথাটাই আমি বলতে চেয়েছি শুরুতেই "এ্যাসপিরেশনাল" বলে দেয়ার মাধ্যমে। তারপরও, হেডিং-এর পরে ২য় বাক্যেই অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছিঃ--

এগুলি সর্বক্ষেত্রে থাকতেই হবে এমন কথা নেই - কারন সবক্ষেত্রে এসবের বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে। তবে যেখানে সম্ভব সেখানে থাকলে ভালো হয় এবং সেগুলিকেই [তখন] অগ্রাধিকার দেয়া উচিত

বাংলা পরিভাষার দায় একটাই, অর্থের সফলতম প্রকাশ। তার জন্যে যদি কখনোসখনো একটু খটমটে হয়ে যায়, তো তা-ই সই।

অর্থাৎ, খটমটে না হয়েই যদি অর্থের সফল প্রকাশ সম্ভব হয়, তাহলে ঠিক আছে তো? এখন বলুন তো, দুটো পরিভাষা পাওয়া গেল যার দুটোতেই অর্থের সফল প্রকাশ ঘটছে সমভাবে, কিন্তু একটা "সহজবোধ্য" আর অন্যটা "খটমটে"। আপনি কোনটা বেছে নিবেন? যদি এই ক্ষেত্রে আপনি প্রথমটা বাছেন, তাহলে বলবো আপনি খামাকাই আমাকে দিয়ে এত লম্বা একটা জবাব লেখালেন!!!! মন খারাপ

****************************************

হিমু এর ছবি

সোনামনিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে আমার ধারণা, আর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক সোনামনিদের কেটার করা বা সর্বোচ্চ সাবস্কৃপশনই আমার লক্ষ্য, নয়তো আমার আশঙ্কা উল্টো কিছু করলে আমি বা আমরা যে পরিভাষাই কয়েন করি না কেন তা অব্যবহৃতই পড়ে থাকবে - যা আমাদের দিক থেকে কাঙ্ক্ষিত হওয়া উচিত নয় - যদি না আমরা স্রেফ পরিভাষা প্রণয়নের আনন্দেই সেটা করতে চাই, আদৌ তা চললো কি চললো না তার কোনরকম প্রত্যাশা না রেখেই।

পরিভাষাপ্রণেতার কাজ সোনামণিদের মুখে চামচ দিয়ে সহজপাচ্য শব্দ খাইয়ে দেওয়া নয় বলেই আমি মনে করি। পরিভাষার কাজ যে শব্দটার অভাবে কোনো ধারণা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যাচ্ছে না, সেটাকে শব্দ যুগিয়ে দেওয়া। আর সোনামণিদের কাজ সে শব্দ ব্যবহারের, উচ্চারণের, প্রয়োগের যোগ্যতা অর্জন করা। আর পরিভাষা প্রণয়ন করার অর্থ এটা নয় যে পরদিন থেকেই জলেস্থলেঅন্তরীক্ষে শব্দটা ছড়িয়ে যাবে। একটা শব্দ লিখিত আর উচ্চারিত ভাষায় নিয়মিত হতে লম্বা সময় লাগে, লেখকদের অংশগ্রহও লাগে, সাংবাদিকদের মনোযোগ-আগ্রহ লাগে। সোনামণিবান্ধব ভাষা প্রণয়ন করা আমরণ ডায়াপার পরিয়ে যাওয়ার মতো ইন্দ্রিয়বৈরী কাজ।

যেভাবে এটা ইতিমধ্যেই আছে সেভাবেই শিখতে আমরা প্রায় বাধ্য!

এটা অনেকটা স্কুলে পিশু চেপে রেখে রাস্তার পাশে দেয়ালে হিসি করার আবদারের মতো হয়ে যায়। আমরা যদি দুরুচ্চার্য ইংরেজি ঠেসে রপ্ত করতে পারি, তাহলে দুরুচ্চার্যতার দোহাই দেওয়ার সুযোগই তো আর থাকে না। রদ্দা মেরে ইঁট ভেঙে এসে যদি কেউ বলে "কলাটা ছিলে দ্যাও", তাহলে কেমন শোনায়?

এখন বলুন তো, দুটো পরিভাষা পাওয়া গেল যার দুটোতেই অর্থের সফল প্রকাশ ঘটছে সমভাবে, কিন্তু একটা "সহজবোধ্য" আর অন্যটা "খটমটে"। আপনি কোনটা বেছে নিবেন?

পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। "সংখ্যাগরিষ্ঠ" আর "দলেভারি" থেকে আপনি দেখুন এ মন্তব্যের শুরুতেই কোনটা বেছে নিয়েছেন। লেখক হিসেবে কখনো প্রয়োজন হলে আমি দলেভারির চেয়েও হালকা একটা সংস্করণ প্রণয়নের পক্ষপাতী, একই সাথে প্রয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠের চেয়ে ভারি আরেকটার। কিন্তু যেটা করাকে পরিভাষাপ্রণেতার করণীয় বলে মনে করি না, সেটা হচ্ছে সোনামণিদের জন্য সারাক্ষণ কলা ছিলে দেওয়া।

মন মাঝি এর ছবি

১। ও হ্যাঁ, আমার প্রস্তাবিত মানদণ্ডমালায় আপনার "সফলতম প্রকাশ" শব্দদ্বয় নেই বটে, তবে ৪নং পয়েন্টে "সঠিক' শব্দটা আছে। আপাতত এটাকেই যথেষ্ট মনে হচ্ছে। কারও যদি তারপরও তা মনে না হয়, তবে এটা যোগ করে দেয়া যায় যে - অন্য সব পয়েন্টগুলি ৪নং পয়েন্টের সাবোর্ডিনেট বা সাপেক্ষে হবে। ব্যস্‌।
২। মানদন্ডমালা না বলে এটাকে সাজেশনমালা বা লুজ গাইডলাইন বললে কি চলবে?

যাজ্ঞে, এই মালা-টালা বিষয়ে এটাই আমার শেষ মন্তব্য হবে বলে আশা করছি!

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

না, আমি দর্শকের সারিতে না। আমার কথা হচ্ছে, যে শব্দ/টার্মগুলো ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছে সেগুলো এবং এর বাইরে আরও কিছু থেকে থাকলে সেগুলোকে একসাথ করে আপনি পোস্টটা দেবেন। আমিসহ অন্য সবাই সেখানে যা করবেনঃ
১। কোন শব্দ/টার্ম তালিকার বাইরে থাকলে সেটা/সেগুলো তালিকাতে যোগ করা
২। তালিকায় থাকা শব্দ/টার্মগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ যা দেবেন সেটার ব্যাপারে কারও ভিন্নমত থাকলে যৌক্তিক আলোচনা করা
৩। তালিকায় থাকা শব্দ/টার্মগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ যা দেবেন সেটার ব্যাপারে কারও বিকল্প প্রস্তাব থাকলে তা দেয়া

আপনার প্রদত্ত ক্রাইটেরিয়াগুলোর ব্যাপারে আমি মোটামুটি একমত, তবে আমি এটা কারও উপর চাপিয়ে দিতে চাই না। বস্তুত আমরা কোন কিছু চাপিয়ে দেবার অধিকারীও না। তবে এমন কিছু ক্রাইটেরিয়া থাকলে পরিভাষা আবিষ্কারে আগ্রহীদের কাজে কিছু সুবিধা হয়। যে কোন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই, তবে সেটা যা খুশি তাই-ও না। নিয়মনীতি তার জায়গায় থাকুক, আগ্রহীরা নতুন নতুন শব্দ আবিষ্কার-পুনরাবিষ্কার করে যাক।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

কৃসা এর ছবি

যতদূর মনে পড়ে রাজকন্যার গল্পের কাছাকাছি একটা ভার্শন বেতাল পঞ্চবিংশতিতে পড়েছিলাম। যেখানে বেতাল বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞেস করে কে বেশী মহৎ। বিক্রমাদিত্যের উত্তর ছিলো মেয়েটার স্বামী।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

বেতালের কথা মনে করিয়ে দেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ কৃসা! আপনার বক্তব্য আংশিক ঠিক। এই গল্পের ভেতরের গল্পটা বেতালের নবম গল্পের সাথে মিল আছে। বেতালের গল্পে বাঘ নেই, রাজকন্যার পরিবর্তে বণিক হিরণ্যদত্তের কন্যা মদনসেনা ছিল, সন্ন্যাসীর বদলে বণিক ধর্ম্মদত্তের পুত্র সোমদত্ত ছিল। মদনসেনা কোন প্রাত্যুষিক শপথে আবদ্ধ ছিল না, বরং সোমদত্তের প্রণয়প্রার্থনার উত্তরে অমন শপথ করেছিল। মদনসেনা যখন ফিরে আসে তখন তার স্বামী অসন্তুষ্ট চিত্তে তার সাথে বাক্যবিনিময় বন্ধ করে দেয়। গল্পটি শুনে বিক্রমাদিত্য মদনসেনার স্বামীকে নয় বরং এই গল্পের কোটালপুত্রের মতো তস্করকে ভোট দিয়েছিল। বেতালও সেটিকে সঠিক উত্তর বলে গ্রহন করে আবার শ্মশানে গিয়ে গাছে ঝুলে থাকে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সোহেল ইমাম এর ছবি

মনে হয় নব্বইয়ের দশকের দিকে আমাদের আড্ডায় এরকমই একটা গল্প খুব মাতিয়েছিলো আমাদের। সেখানে অবশ্য রাজকন্যা ছিলোনা ছিলো একটা নববধু। তো সেই নববধু বিয়ের রাতেই তার নতুন বরকে জানায় যে সে আরেকজনকে ভালোবাসে এবং তার কাছেই চলে যেতে চায়। বর অতি উদার চিত্তে বধুকে বিদায় দেয়। তারপর বধু জঙ্গল দিয়ে যেতে যেতে ডাকাতের হাতে পড়ে অলঙ্কার হারায়, পরে এক ধর্ষকের হাতে ধর্ষিতা হয় এবং সেখান থেকে পালিয়ে একটা কুটির দেখতে পেয়ে সেখানে ঢুকে দেখে এক সাধুবাবা ধ্যানে মগ্ন, আওয়াজ পেয়ে নববধুকে একবার দেখেই সাধুবাবা আবার ধ্যানে মগ্ন হয়ে পড়েন। মেয়েটা বোঝে এখানে সে কোনই সাহায্য পাবেনা তাই সেখাান থেকেই ছুটে বেরিয়ে আসে। শেষকালে নিজের প্রেমিকের কাছে গিয়ে সবটা খুলে বললে প্রেমিক জানায় এতোকিছুর পর সে আর মেয়েটিকে গ্রহণ করতে চায়না। এখন খেলাটা হচ্ছে গল্প শোনার পর বলতে হবে কে সবচেয়ে বেশি খারাপ। এটা একধরণের সাইকোলজিক্যাল টেস্টের মত খেলা ছিলো। গল্প শোনার পর উত্তর থেকেই উত্তরদাতার চরিত্র সম্পর্কে এ্টা হদিস পাওয়ার মত ব্যাপার ছিলো। কি সূত্রে ব্যাপারটা নির্ধারণ করা হতো এখন আর মনে নেই।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

কৃসা এর ছবি

উফস! বুড়া হয়ে যাচ্ছি হাসি

নজমুল আলবাব এর ছবি

ত্বকের রং সংক্রান্ত বর্ণবাদে বাংগালের অবস্থান বাকি দুনিয়ার থেকে এগিয়েই থাকবে সম্ভবত। রূপকথার বয়েস জানতে পারলে এই বর্ণবাদটা কতটা পুরনো সেটা জানা যেতো। সাথে বড় হুজুর মাত্রেই ধুয়া তুলশি পাতা (তীব্র নারী লোভী হবার পরও সন্ন্যাসীটা সন্ন্যাসীই থেকে গেলো।) এইসব ধারণাগুলো কবে থেকে এই জনপদে পাকাপোক্ত হয়েছে সেসবও বুঝা যেতো হয়তো।

লেখার বিষয়ে বলার কিছুই নাই নতুন করে। অনেকদিন পর সচলকে সচল মনে হচ্ছে আবার।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আমার একটা ধারণা হচ্ছে গাত্রবর্ণের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের ব্যাপারটি এদেশে বহিরাগতরা (যেমন, আর্যরা) নিয়ে এসেছে। সালমান খান অভিনীত একটা সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র 'বজরঙ্গী ভাইজান'-এ দেখা যাচ্ছে শাহিদা বা মুন্নী'র গাত্রবর্ণ ফর্সা বলে পবন চতুর্বেদী ওরফে বজরঙ্গী ভাইজান তাকে ব্রাহ্মণ বলে সাব্যস্ত করছে। মুন্নীর খাদ্যাভ্যাসে আমিষ আছে দেখে পবন বোঝে যে ব্রাহ্মণ নয়। তখন সে মনেপ্রাণে প্রার্থণা শুরু করে মুন্নী যেন ক্ষত্রিয় হয়। পরে যখন আবিষ্কৃত হয় মুন্নী মুসলিম তখন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ধর্মীয় বর্ণ যাদের আবিষ্কার, গাত্রবর্ণের শ্রেষ্ঠত্বও তাদের আবিষ্কার হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

সন্ন্যাসীরা চিরকালই ধোয়া তুলসীপাতা। রাজা যেমন রাজ্যপরিচালনার জন্য আইন তৈরীর অধিকারী বলে অভিশংসনের অযোগ্য, তেমন ধর্ম্মগুরু ধর্মীয় আইন তৈরীর অধিকারী বলে তার সকল কর্ম জাগতিক আইনের ঊর্ধ্বে। এই মাণিকজোড় হাজার হাজার বছর ধরে আইনী নিগ্রহ চালিয়ে যাচ্ছে, আরও অনির্ধারিত কাল ধরে আইনী নিগ্রহ চালিয়ে যাবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

ত্বকের রং সংক্রান্ত বর্ণবাদে বাংগালের অবস্থান বাকি দুনিয়ার থেকে এগিয়েই থাকবে সম্ভবত।

আপনার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই স্টেটমেন্টটা গ্রহণ করতে আমার আপত্তি নেই, নচেৎ আমি এর সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত প্রকাশ করছি। আপনার বেশি দূর বা ঐতিহাসিক কালে যাওয়া লাগবে না, আমাদের প্রতিবেশী দু'তিনটা দেশের দিকে যদি ভালোভাবে তাকান - সামাজিক / পারিবারিক প্র্যাকটিস ও মনোভাবগুলি যদি দেখার সুযোগ নাও হয় - অন্তত তাদের মিডিয়া, অনলাইন প্রকাশণার ও সেগুলির মন্তব্য সেকশন, সোশাল মিডিয়া ইত্যাদি যদি দেখেন - আমি বলবো আমরা তাদের সাথে তুলনামূলক বিচারে অন্তত এই বিষয়টিতে (অন্য বিষয়ে যদি নাও হই) এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুও না - দস্তুরমত ইশ্বরপ্রেরিত দেবদূত‍‍‍!!!

ভারতীয় রেডিও-টিভিতে (পাকিস্তানী দেখতে পাই না, তাই বলতে পারবো না) রীতিমতো জাতীয় ভাবে প্রচারিত প্রথমসারির বিভিন্ন-ধরণের অনুষ্ঠানাদিতে হাসতে-হাসতেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জ্ঞানে ও ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতেই গাত্রবর্ণের রেফারেন্স টেনে বা সরাসরি ত্বকের কালোত্বকে উঠতে-বসতে ইনিয়ে-বিনিয়ে যেভাবে হেয় করা হয়, অপমান বা তাচ্ছিল্য করা হয় অনবরত - আমাদের দেশের মিডিয়াতে মনে হয় এভাবে প্রকাশ্যে সে তুলনায় লক্ষ-কোটি ভাগের একভাগও করা হয় না!!!! কিম্বা অনলাইনে ভারতীয় ও পাকিস্তানী পত্র-পত্রিকাগুলি বা অন্যান্য প্রকাশণার মন্তব্যঘরগুলিতে বাঙ্গালী বা কালো গাত্রবর্ণের মানুষদের সম্পর্কে যে অকহতব্য, অকল্পনীয়, অচিন্তনীয়, বিষাক্ত এ্যাসিডিক আক্রমণ করা হয় প্রায়ই, সেসব শুনলে আপনার গায়ের চামড়া তো চামড়া - টিরানোসোরাস রেক্সের চামড়া-রক্ত-মেদ-মাংস-মগজ সব শরীর থেকে 'বলক' তুলতে তুলতে গলে বেরিয়ে যাবে। এমনকি হাড্ডিও অবশিষ্ট থাকবে কিনা সন্দেহ। এগুলি নিজে না দেখলে এর পূর্ণ মাজেজা আপনি বুঝতে পারবেন না।

পাকিস্তানীরাও নেহাত কম যায় না। এদের অন-এয়ার মিডিয়ার খবর তেমন একটা রাখি না, কিন্তু এদের সম্পর্কে অন্যভাবে আমাদের যথেষ্টই অভিজ্ঞতা আছে। সেগুলি মনে করুন। আর বার্মিজরা? আমজনতার কথা বাদই দিলাম যারা "কালিয়া" কাউয়াদের থেকে নিজেদের জন্মগতভাবেই কয়েক সহস্রকোটিগুন শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং কালিয়াদের নিকৃষ্টতম কীট, কিন্তু ওদের দেশের "সচেতন" বুদ্ধিজীবী বা মাথারা? ওদের প্রায় ব্যতিক্রমহীণবে সমস্ত সেলিব্রিটি, ধর্মগুরু, আমলা, রাজনীতিবিদ এরকম আচরণের সাথে প্রকাশ্যে যুক্ত। সর্বোচ্চ শিক্ষিত পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত টপ কূটনীতিবিদ পর্যন্ত "কূটনৈতিক" আচরণকে গুল্লি মেরে মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে প্রকাশ্যে গাত্রবর্ণবিদ্বেষী" আচরণের উৎসব করতে লজ্জা পায় না। আর সেই মহামহিম শান্তির দেবী? গল্পে পড়েছিলাম - এক শিয়াল পা পিছলে ধোপার নীলের চৌবাচ্চায় পড়ে সম্পূর্ণ নীল হয়ে গিয়েছিল। পরে এই অদ্ভূত জীব নিজের আসল পরিচয় গোপন করে নিজের পালে ফিরে এসে রাজা সেজে বসে। কিন্তু সন্ধ্যে নামতেই যখন সব শিয়াল মুখ খুলল তাদের হুক্কা হুয়ার ঐকতানে, তখন রাজা বেচারাও খেয়াল না করেই একই সাথে মুখ খুলতে গিয়ে সটান ধরা পড়ে গেল। শান্তির দেবীর সাম্প্রতিক কথাবার্তা শুনে তাই - সব শেয়ালের একই রা - এই কথাটাই কেবল মনে পড়ে!

গোটা দুনিয়া বা দূরের দেশগুলির কথা বাদই দিলাম, কাছেপিঠেই সীমাবদ্ধ থাকলাম। আমার মনে হয় না আমাদের মিডিয়া বা পাব্লিক লাইফে "গাত্রবর্ণ" নিয়ে এতটা বিদ্বেষবাষ্প বা বিশবাষ্প আছে!

****************************************

মন মাঝি এর ছবি

নিজেরই এই কমেন্টটা কয়েকদিন পরে ফিরে এসে পড়তে গিয়ে মনে হলো এতে কোন কোন জায়গায় হয়তো জেনোফোবিক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে বলে কারো কারো ভুল করে মনে হতে পারে। আসলে নিজেরই অস্বস্তি লাগছে। তাই এটা নিশ্চিত করে বলতে চাই যে ঐ ধরণের মনোভাব কোনক্রমেই আমার উদ্দিষ্ট ছিল না। আর ১ম প্যারার শেষ ৩টি শব্দ নিঃসন্দেহে একটা অতিরঞ্জিত আবেগিক বহিঃপ্রকাশ। তবে এক্সক্লুসিভলি এই প্রসঙ্গেই (অর্থাৎ অন্য প্রসঙ্গে অন্যরকম মত হতে পারে) মূল বক্তব্যের বস্তুগত অংশে আমি এখনো স্থির। হাসি

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

এতো স্পর্শকাতর হবার কী আছে! কথার কোন অংশটা আবেগী আর কোন কথাটা স্থির চিন্তার সেটা তো বোঝা যাবার কথা, তাই না!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আয়নামতি এর ছবি

চমৎকার লাগলো আলোচনা।

এক্ষেত্রে খাঁজাখুরি রূপকথার পাঠক, আর বাস্তব জগতে দুর্নীতিগ্রস্হ শাসন কাঠামোর হ্যাপায় পড়া আমজনতা তুলনামূলক মহৎ।

অ- নে-ক দিন পর আপনার লেখা পেয়ে দারুণ ভালো লাগলো পাণ্ডব'দা। হাসি

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

রূপকথা গাঁজাখুরী নয় মোটেও। কিছু রূপকথার জন্ম ঘটে যাওয়া ঘটনাতে রঙ চড়িয়ে, আসল লোকগুলোকে আড়াল করে। কিছু রূপকথার জন্ম অবদমিত আকাঙ্খার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। কিছু রূপকথার জন্ম প্রতিবাদের ভাষাকে অলৌকিকতার মোড়কে জড়িয়ে। একটু চোখকান খোলা রেখে পড়লে সেগুলো বোঝা যায়।

আমজনতা কি মহৎ? নাকি সুযোগের অভাবে বা সাহসের অভাবে মহত্ত্ব দেখাতে বাধ্য হয়?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মেঘলা মানুষ এর ছবি

এভাবে চিপা দিয়ে যে অনেক লক্ষণ প্রকাশিত হয়ে আছে আমাদের গল্পগুলোতে -সেটা খেয়াল করি নি কোন দিন।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

লোককথাগুলো নিছক গল্প হয় না। সেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম বর্ণনার মতো বিষয়ের আড়ালেও অন্য কিছুর বয়ান দিয়ে দেয়া থাকে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মাহবুব লীলেন এর ছবি

উত্তরাধিকার হিসাবে বাপের সম্পত্তি নিয়া যদি ঘি মাখন খাওয়া যায়; তবে বাপের অর্জন উত্তরাধিকার হিসাবে নিয়া সুবিধা বাগাইতে অসুবিধা কই?

বাপে তো রাজা মন্ত্রী কোটাল এইগুলা বহুত খাটনি দিয়াই হইছে; তো পুতেরা সেই খাটনির সুবিধা নিতে আপত্তি কই?

০২
বহুতদিন পরে আপনের লেখা

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

০১
আপনার বয়ানটি যৌক্তিক কিনা সেই বিচারে না গিয়েই বলা যায় বাস্তবে তাই হচ্ছে। নানা পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি বলুন, নানা সংগঠনের কর্ণধার বলুন, বিদ্যায়তনের শিক্ষক বলুন কোথায় এই বংশানুক্রমিক ভোগদখলের ব্যাপার নেই! একবার এক শহরের গণিকালয় উচ্ছেদ করা হয়েছিল; পরিণামে গণিকারা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে গোটা শহরটিকে গণিকালয় বানিয়ে ফেলে। রাষ্ট্রগুলোর কেন্দ্রে রাজতন্ত্র নামমাত্রে উচ্ছেদ হয়েছে বটে তবে রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে।

০২
বলাই বাহুল্য। দেখি টিকে থাকতে পারি কিনা।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সোহেল ইমাম এর ছবি

চমৎকার একটা লেখা। আপনার অন্য সিন্ড্রোম গুলো পড়া হয়নি। এক্ষুনি পড়ে ফেলবো। চলুক

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ধন্যবাদ। অন্যগুলো পড়া হলে দয়া করে প্রতিক্রিয়া জানাবেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সুমন চৌধুরী এর ছবি

সাদাদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকার মধ্যেই হয়তো "ফরসা" ফেটিশের বর্ণবাদ।

আলোচনা ভাল্লাগছে।
বাস্তবের সন্ন্যাসী এইভাবে সুযোগ হেলায় হারায় না। দেঁতো হাসি

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আমলের আগেও এশিয়াতে ফরসা ফেটিশের গাত্রবর্ণবাদ ছিল। এই ব্যাপারটা কেন সেটা নিয়ে মনে হয় একটু গভীরে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে। আফ্রিকার কথা ভিন্ন, সেখানে ব্ল্যাক সুপ্রিমেসি পুরনো ব্যাপার।

বাস্তবের সন্ন্যাসীরা জানে আপেল খাইলেও দোষ, না খাইলেও দোষ। তাই তারা কোন সুযোগ ছাড়ে না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

পুতুল এর ছবি

আজকাল আবার সুবিধাভোগী শোষকশ্রেণীর সততার পক্ষে জেনেটিক যুক্তি বা জিন আবিষ্কার হয়েছে। বংশ পরম্পরায় অযাচিক সুবিধা ভোগ করতে করতে কৌশলে বা চুরি করে সুবিধা নেয়ার বুদ্ধিমত্তা কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় এসেছে। হয়ত সে জন্যই রাজ বংশের স্প্রসকে বোকা বলা হয়। কিন্তু বাঘের চারিত্রিক সনদ পত্র যদি মহেশ, হাতি বা সিংহ দেয়, তার সাথে বাঘকে দেয়া হরিণের চারিত্রিক সনদ পত্রের ফারাক বিস্তর হবেই। আমাদের পরিবেশে এখনও হাতি, সিংহ মহেষরাই বাঘের চারিত্রিক সনদ পত্র দেয়।

বহুদিন পরে আপনার লেখা পড়লাম।

**********************
ছায়াবাজি পুতুলরূপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ!
!কাশ বনের বাঘ!

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

চারিত্রিক সনদের তোয়াক্কা তাদেরই করতে হয় যারা ক্ষমতাকাঠামো বা কর্তৃত্বকাঠামোর বাইরের জন। বাকিরা বাই ডিফল্ট সৎ, চরিত্রবান, মহৎ, দেশপ্রেমিক, জনদরদী, গরীবের বন্ধু, নির্ভীক, সমাজসেবক ইত্যাদি প্রভৃতি এটসেটরা


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

দময়ন্তী এর ছবি

বাঃ বাঃ বাঃ অন্নে-এ-একদিন বাদে নিজের নামে লিখেছেন। হাসি হাসি

লেখা যথারীতি যুক্তিনিষ্ঠ চমৎকার চলুক

-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

অনিচ্ছাকৃত বিলম্বের জন্য দুঃখিত। আমরা তো আসলে ব্লগিংটাই করতে চেয়েছিলাম, এবং করতে চাই। ফেসবুকে লম্বা লম্বা স্ট্যাটাস দেয়াতে আপত্তি নেই, তবে তার দু'দিন আগে সেই লেখাটা সচলে আসতে বাধা কোথায়! তাতে সব দিক ঠিক থাকে, তাই না!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নাশতারান এর ছবি

এই গল্পগুলো কিনা শিশুপাঠ্য! যে বৈষম্যবাদ আর নৃশংসতা রূপকথার গল্পগুলোর ভাঁজে ভাঁজে মিশে থাকে, তা পড়ে শৈশবেই আমাদের মাথা তৈরি হয়ে যায়। আট বছর বয়েসি শিশুকে আমি বলতে শুনেছি সে নাকি কালো মানুষের সাথে কথা বলে না। এই শিক্ষা পারিবারিক, সামাজিক। দীর্ঘদিনের চর্চায় কদর্য আচরণগুলোকেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নিই আমরা, ইংরেজিতে যেটাকে বলে নরমালাইজ করা। তাই শিশুদের গল্পের অন্ধকারগুলো বছরের পর বছর ধরে টিকে থাকে। রেসিজম, সেক্সিজম, কালারিজম, বডি শেমিং ইত্যাদির হাতেখড়ি ওই রূপকথার গল্প থেকেই হয়। এই গল্পগুলো নিয়ে শিশুদের সাথেই আলাপ করা যেতে পারে কিন্তু। বর্জনীয় উদাহরণ হিসেবে শিশুদেরকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবচ্ছেদ করে নতুন করে লেখা যেতে পারে গল্পগুলো।

_____________________

আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

তোমার মন্তব্যের সঙ্গে যোগ করি,
টোনা-টুনির পিঠা তৈরির গল্পটা মনে আছে? ওই গল্পটা সম্ভবত মূল বক্তব্য অক্ষত রেখে ডালপালা বাড়িয়ে বা ছেটে এলাকাভেদে ভিন্নভাবে প্রচলিত।

আমি যেটা শুনেছি, সেখানে টোনারা টুনিকে পিঠা করতে বলে। পিঠা করা সেখানে টুনির কাজ। পিঠার সরঞ্জাম জোগাড় করা টোনার কাজ। সেখানে 'ব্রেড-উইনার'/কর্তা হচ্ছে টোনা।

পিঠা তৈরির সরঞ্জাম আনতে টোনার কৌশল হচ্ছে রাস্তায় গর্ত খুঁড়ে উপরে চাটাই বিছিয়ে রাখা। সেখানে চাল-আটা-গুড় নিয়ে বাজার ফিরতি লোকেরা পড়ে যাবে এবং তাদের চাল-আটা-গুড় সংগ্রহ করবে টোনা। এই নৃশংস ডাকাতির কৌশল স্বাভাবিক (গ্রহনযোগ্য এবং সম্ভবত নায়োকচিত) হয়ে ঢোকে আমাদের শিশুদের মাথায়।
আহা আমাদের সংস্কৃতি!

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

শুধু টোনাটুনির গল্প না। কুমীরের সাথে চাষ করে শেয়ালের কুমীরকে ঠকানো, কুমীরকে ঠকিয়ে শেয়ালের কুমীরের বাচ্চা খেয়ে ফেলা, কাকের সাথে প্রতারণা করে শেয়ালের কাকের খাবার খেয়ে ফেলা, কচ্ছপকে আকাশ থেকে ফেলে হত্যা, শেয়ালকে মাঝ নদীতে ডুবিয়ে মারা এমন শত শত গল্পের ভাণ্ডার আমাদের আছে যেগুলোতে প্রতারণা, নৃশংসতা, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি বীভৎস বিষয়গুলোকে মহিমান্বিত করা হয়েছে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

পণ্ডিতদের লেখা ইতিহাসের বইগুলো যে সব জিনিস এড়িয়ে যায় বা অসত্য ভাষণ দিয়ে ঢেকে রাখে লোককাহিনীতে সেসব সত্য ফুটে ওঠে। মানুষ কী ভাবতো, কী পছন্দ-অপছন্দ করতো, কী বিশ্বাস করতো, আসলে কী ঘটতো ইত্যাদি। এখান থেকে নিম্নবর্গের মানুষের দৃষ্টিতে দেখা ইতিহাস আংশিকভাবে লেখা সম্ভব। এগুলোকে সম্পাদনা করে নতুন গল্প না লিখে বরং এখনকার ঘটনাগুলো দিয়ে আজ ও আগামীকালের শিশুদের জন্য নতুন গল্প লিখতে হবে। পুরনো গল্পগুলো প্রমাণ হিসেবে থেকে যাক।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

প্রথমে গল্পের প্রসঙ্গেই আসি। যে গল্পে আপনার বিশ্লেষণে মহৎ কেউ নেই, সেই একই গল্প আমাদের সমাজে বিভিন্ন মানুষকে শোনালে তারা কাউকে না কাউকে অবশ্যই মহৎ হিসেবে চিহ্নিত করবে। বস্তুতপক্ষে আমি নিজেও ভাবছিলাম কে বেশী মহৎ? এর কারন বোধ হয় এই যে বহু যুগ ধরে এই ধরনের মূল্যবোধ সম্বলিত সব গল্প গাঁথা উপকথা ব্রতকথা রচনা করা হয়েছে। পৌরাণিক ধর্মগ্রন্থগুলোতেও এই ধরনের এই ধরনের প্রশ্নোত্তর পর্বের দেখা বারংবার পাওয়া যায়, বেতালের কথা উপরে বলা হয়েছে, মহাভারতেও আছে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নপর্ব, আরও আছে।

চতুবর্ণ প্রথা আর্য্যদের সেই কতকাল আগের সৃষ্টি, সেখানে শূদ্রেরা কৃষ্ণবর্ণ এবং ঘৃণার্হ। কিন্তু এখনও ভারতে কৃষ্ণবর্ণ খুবই অনাকাঙ্খিত একটি ব্যাপার। আর আমরা যারা চতুবর্ণ প্রথার ধারক বাহক কিছুই নই, তদেরও ঘরে ঘরেই গৌরবর্ণের পরম সমাদর, কৃষ্ণবর্ণ চরমভাবে অবহেলিত।

শুধু আমাদের উদাহরণই বা কেন, এই যে পরম উৎকর্ষমণ্ডিত ইসলাম ধর্ম, তার নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে এক বেলাল ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কারো অস্তিত্ব পাওয়া যায় কি? দাসী ছাড়া তাঁদের কারো কি কৃষ্ণাঙ্গী স্ত্রী ছিল?

আমার কিন্তু মনে হয় এই যে মানবিক মূল্যবোধ, যার আকুতি আপনার লেখায় ফুটে উঠেছে, সেটা তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক বোধ বা উপলব্ধি।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আমার কিন্তু মনে হয় এই যে মানবিক মূল্যবোধ, যার আকুতি আপনার লেখায় ফুটে উঠেছে, সেটা তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক বোধ বা উপলব্ধি।

আপনার এই কথাটা অস্বীকার করা যায় না। বিদ্যমান শিক্ষা, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা আমাদের চিন্তা ও বিবেকের চশমাকে নির্মাণ করে। যারা সে চশমাকে খুলে রেখে বহু দূর পর্যন্ত দেখতে পান তারা মহামানব। আমজনতা ঐ বিদ্যমান ব্যবস্থার চিন্তাকাঠামোতে আবদ্ধ থাকে। আমাদেরকে যেহেতু বর্তমানে বাস করে ভবিষ্যতের দিকে আগাতে হয় তাই বিদ্যাশিক্ষাসাহিত্যসংস্কৃতিরীতিনীতি'র মধ্যে যা কিছু বস্তাপঁচা জিনিস আছে সেগুলোকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

দেবদ্যুতি এর ছবি

লেখা আর আলোচনা দুইই সেই মাপের। বাকি সিনড্রোমগুলো পড়ে ফেলব। আর যে বর্ণবাদগুলোর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলোতে জোর সমর্থন।

...............................................................
“আকাশে তো আমি রাখি নাই মোর উড়িবার ইতিহাস”

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

পড়া আর মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

রুশ গল্পগুলোতে (প্রগতি প্রকাশন হয়ে আসা) কি এই সব 'সিনড্রোম' একটু কম? নচেৎ, প্রায় সব রূপকথাই কড়াকড়ি চোখে দেখতে গেলে এমন অনৈতিক 'সিনড্রোম' চোখে পড়ে বৈকি। এ কি সেই সময়েরই গল্প, নাকি পুনর্লিখন?

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

রুশ না বলে যদি সোভিয়েত বলি তাহলে মনে হয় ঠিক হয়। সোভিয়েত আমলে তাদের নানা দেশের লোককথা/উপকথা/রূপকথা যেগুলো বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়/প্রগতি প্রকাশন/রাদুগা/মীর হয়ে আমাদের হাতে এসেছে সেগুলো আসলে মূল গল্প নয়। সেখানে অনেক কিছু যেমন কাটছাঁট করা হয়েছে, আবার কিছু জিনিস ঢোকানোও হয়েছে। বিশেষত ভাষা/টোনগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বইগুলো প্রকাশের পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল, তাই ওগুলো আসলে সুন্দর, গোল গোল গল্প।

এই সব গল্পের মূল ক্যারিয়ার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তাদের মুখে মুখে গল্পগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, অথবা এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যায়। ফলে সময়ের সাথে সাথে গল্পে নতুন কিছু ঢোকে, পুরনো কিছু বাদ পড়ে, টোন পালটে যায়। গল্পটা যখন কোন লেখক লেখেন তখন সেখানে তার নিজস্ব কিছুও ঢুকে পড়ে। গল্পকে শিশুতোষ বা কিশোর উপযোগী করতে গিয়ে গল্প অনেক ক্ষেত্রে মূল থেকে অনেক সরে গিয়ে নতুন গল্প হয়ে যায়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA